চা খেতে খেতে নীলেন্দু বলল, দেবীদি, আজ আমার ফাইন লাগছে। কেন লাগছে বলল তো?
দেবযানী পাশের দিকে চেয়ে চেয়ারে বসে ছিল। বলল, কী করে বলব। তোমার মন তুমিই জানো।
নীলেন্দু বিস্ময়ের ভান করল। আমার মন শুধু আমিই জানি। তুমি কিছু জানো না দেবীদি?
সহাস্য মুখে দেবযানী বলল, আমার কি জানার কথা!
নীলেন্দু অভিমানের মতন মুখ করল। তাকিয়ে থাকল কয়েক পলক। তারপর বলল, এই চমৎকার সকালে বড় দুঃখ দিলে। মেয়েরা এই রকমই হয়। এক হাতে সুধাপাত্র, অন্য হাতে বিষভাণ্ড। একটু আগে সকালে তুমি আমায় পরম সুখ দিয়েছিলে, আর এখন চরম দুঃখ দিলে।
দেবযানী জোরে হেসে উঠল। হাসির দমকে তার বুক কাঁপছিল, গলার নালি ফুলে ফুলে উঠছিল। হাসতে হাসতে টেবিলের ওপর যেন একটু নুয়ে পড়ল।
নীলেন্দু টেবিলের ওপর রাখা সিগারেটের প্যাকেট থেকে সিগারেট নিয়ে ধরাল। দেবীদির এই হাসি তার বড় বেশি চেনা, হাসির ওই মুক্ত ধ্বনি, ওই ভঙ্গি তার কানে লেগে আছে কতকাল ধরে। এই হাসি দেবীদির চরিত্রকে বোধ হয় খানিকটা প্রকাশ করে, তার চরিত্রের নিশ্চিন্ত, উচ্ছল দিকটাই সম্ভবত। নীলেন্দু আশঙ্কা করেছিল, দেবীদির পুরনো হাসি আর শোনা যাবে না। জীবনের যে অবস্থায় ওই হাসি স্বাভাবিক ছিল এখন সে অবস্থা নেই।
নীলেন্দু গম্ভীর মুখ করে বলল, মহীদা, আমার কত বড় ক্ষতি করেছে আমিই বুঝতে পারছি।
হাসিমুখে দেবাযানী বলল, যাক গে–তোমার মনের কথাটা শুনি।
শুনবে?
ওমা, শুনব না?
তা হলে বলি। ..কাল আমি একটা বিরাট স্বপ্ন দেখেছি।
স্বপ্ন! …খুব ভাল স্বপ্ন?
খুব ভাল। অন্তত আমার পক্ষে। যদি স্বপ্নটা না ভাঙত–আমি আরও দেখতে রাজি ছিলাম। বলতে বলতে নীলেন্দু চায়ের কাপটা বাড়িয়ে দিল। আর এক পেয়ালা দাওনা, দেবীদি। আছে? এই ঠাণ্ডায় তোমার ওই মিনি সাইজের কাপে আমার পোয় না।
দেবযানী আরও চা রেখেছিল। কাপটা তুলে নিয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
নীলেন্দু আরাম করে সিগারেট খেতে লাগল। সকালের প্রথম দু-এক কাপ চা, দু-চারটে সিগারেট তার ভালই লাগে, শরীর মন যেন চাঙ্গা করে দেয়। পরে আর তা হয় না। অথচ অভ্যেস। ভাল না লাগলেও খেয়ে যেতে হয়। সে মাঝে মাঝে বেশ গম্ভীর হয়ে ভেবেছে, জীবনের প্রথম দিকে কোনও কোনও ব্যাপার গোড়ায় যতটা ভাল লাগে পরে কি আর তা অত ভাল লাগে? বোধ হয় নয়। অভ্যেসই মানুষকে চালায়। ভাল লাগা হয়তো চালায় না।
চা এনে দিয়ে দেবযানী বলল, তোমার স্বপ্নটা শুনি।
চায়ে চুমুক দিল নীলেন্দু হাতের সিগারেটের টুকরোটার আগুনে নতুন একটা ধরিয়ে নিন। বলল, স্বপ্নের দোষ হল, দেখার সময় যত বড় মনে হয়, মনে করার সময় সেটা তত ছোট হয়ে যায়। এ যেন ইলাস্টিক, দেখার সময় টেনে বাড়িয়ে তোমায় দেখাল, তারপর আবার গুটিয়ে গেল। নীলেন্দু হাসল, তার ঝকঝকে চোখ কী যেন ইঙ্গিত করতে চাইল দেবযানীকে। শেষে বলল, স্বপ্ন দেখছিলাম, কলকাতায় একটা বাড়ির দোতলা কিংবা তেতলার ঘরে আমি শুয়ে আছি, মাথার দিকের জানলা খোলা, ট্রামের শব্দ ভেসে আসছে অনবরত, তখন বিকেল না সন্ধে মনে করতে পারছি না, হঠাৎ দেখি দরজা খুলে কে একজন এল। প্রথমে মনে হয়েছিল কঙ্কর, তারপর দেখলাম কঙ্কর নয়, সিদ্ধার্থ। সিধুর বেসামাল অবস্থা। প্রচুর মদ খেয়েছে। সমস্ত মুখে দরদর করে ঘাম ঝরছে। চোখ তুলে তাকাতে পারছে না। হাতে একটা রিভলভার। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। বিছানা ছেড়ে উঠতে যাব দেখি উঠতে পারছি না। কেন পারছিলাম না জানি না। সিধু তার হাতের রিভলবারটা আমার বালিশের পাশে রেখে দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে কাঁদতে লাগল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমার কোনও দোষ নেই, তোর কাছে পৌঁছে দিয়ে গেলাম। …তারপর দেখি, আমি অন্য জায়গায়। আমার সঙ্গে তুমি। সেই যে একবার আমরা ডায়মণ্ড হারবার গিয়েছিলাম দেবীদি, তোমার মনে আছে? কোন গ্রামে বেড়াতে গিয়ে ফেরার পথে আর বাস পেলাম না, এক চাষির বাড়িতে রাত কাটাতে হল। তারা ভেবেছিল, আমরা স্বামী-স্ত্রী। আমাদের একটা ঘরে রাত কাটাতে দিল। তোমায় আমার বউ ভেবে নেবার কারণ ছিল না, তোমার সিঁথিতে সিঁদুর ছিল না। তবু। ঠিক সেই রকম এক একচালা ঘরে তুমি আর আমি। তুমি আমার বুকে ওপর শুয়ে আদর করছ। মাথার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছ। দিতে দিতে হঠাৎ তুমি আমার চোখে তোমার মাথার কাঁটা ফুটিয়ে দিলে। আমি বিশ্বমঙ্গল হয়ে গেলাম। তুমি তখন কাঁদছ…। নীলেন্দু চুপ করল, দেখল দেবযানীকে, চোখে যেন কৌতুক, চায়ে চুমুক দিল আবার।
দেবাযানী কথা বলল না।
নীলেন্দু ঠাট্টার গলায় বলল, সত্যি বলছি দেবীদি, তোমার বুকের চাপ যেন আমি সারাক্ষণ অনুভব করেছি।
দেবযানী বলল, আর চোখের মধ্যে যখন মাথার কাঁটা ফুটিয়ে দিলাম–তার যন্ত্রণা?
সে-যন্ত্রণা তো নতুন নয়…। যাক গে, স্বপ্নটা তোমার কেমন লাগল?
খুব খারাপ।
কেন?
আমায় তুমি এখন থেকে বউদি বলবে।
নীলেন্দু হেসে উঠল। জোরে। দেবাযানীও হেসে ফেলল।
চা শেষ করে নীলেন্দু বলল, এই স্বপ্ন হয়তো কিছু না, দেবীদি; তবু তোমার কাছে মিথ্যে বলব না, সিধু আমি আমরা একটা স্বপ্ন দেখেছিলাম। কী স্বপ্ন তুমি জানো। মহীদা আমাদের মধ্যে ছিল। তুমি জানো আমরা সত্যি সত্যি সকলে রিভলবার পকেটে গুঁজে ঘুরে বেড়াইনি। ওই জিনিসটা কেউ কেউ হাতে নিয়েছিল। আমরা নয়। যারা নিয়েছিল তারা আলাদা হয়ে গেল। সিধু নেব কি নেব না করতে গিয়ে মারা গেল।
