দেবযানী আর দাঁড়াল না। চা আনতে হবে।
রান্নাঘরে এসে চা ঢালল দেবযানী, চিনি মেশাল। মহীতোষ নামমাত্র চিনি খায়। তার খাওয়া-দাওয়া যেন হিসেব করা। এসব আগে ছিল না, মহীতোষ কোনও দিনই এমন কিছু ভোজনরসিক মানুষ নয়, তবু সাধারণ ক্ষুধাতৃষ্ণায় তার অরুচি ছিল না। ইদানীং নানা ব্যাপারেই তার আপত্তি; বিকেলের দিকে সামান্য কিছুও মুখে দিতে চায় না, এক-আধ পেয়ালা চা যেন যথেষ্ট, সেই রাত্রে দু-চারখানা রুটি, সামান্য সবজি, একটু দুধ। এতে শরীরস্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে কি হচ্ছে না এ নিয়ে দেবযানী প্রথম দিকে রাগারাগি করেছে, কোনও লাভ হয়নি। এখন আর কিছু বলে না।
চা নিয়ে দেযবানী নীলেন্দুর ঘরে ফিরে এল। মহীতোষকে দিল। নীলেন্দু বেশ তৃপ্তির সঙ্গে কড়াইশুটি সেদ্ধ খাচ্ছে। বিছানার পাশে কাঠের চেয়ারে আগুনের মালসা রাখা, তলায় এক টুকরো কাঠ। নীলেন্দুর চায়ের কাপ চেয়ারের একপাশে নামিয়ে রাখল দেবযানী।
তোমার এই বস্তুটি সাংঘাতিক উপাদেয় হয়েছে দেবীদি, আমি তোমায় সার্টিফিকেট লিখে দিয়ে যাব। নীলেন্দু ছেলেমানুষের মতন হাসল। বোসো–!
দেবযানী বসল না। বলল, রান্নাঘরে আমার কাজ রয়েছে।
তুমি চা খাবে না?
খাব।
কই, নিয়ে এসো। …কাজ তো আছেই, থাকবে। একটু বোসো। অন্তত চা-টুকু খাও।
যেন বাধ্য হয়েই দেবযানী নিজের চা আনতে রান্নাঘরে গেল; ফিরে এল একটু পরেই। ফিরে এসে বিছানার একপাশে পায়ের কাছে বসল।
দু-চারটে কথার পর নীলেন্দু হঠাৎ বললে, দেবীদি, এখন মেজাজটা কী রকম তাস-খেলার মতন হয়েছে। এক জোড়া তাস পেলে ফার্স্ট ক্লাস হত। জমে যেত। বলে হাসতে হাসতে মহীতোষের দিকে তাকাল। তুমি জানো না মহীদা, দেবীদি আর আমি একসময়ে তাসের পার্টনার ছিলাম। দেবীদি দারুণ খেলে।
মহীতোষ হাসিমুখে দেবযানীকে দেখতে দেখতে বলল, দেবীর সঙ্গে আমি দাবা খেলেছি। ওকে হারানো মুশকিল।
তুমি আরও বড় খেলোয়াড় মহীদা, খেলাও বড় খেলেছ। আমি ছোট খেলোয়াড়–! বলে নীলেন্দু হোহো করে হেসে উঠল।
দেবযানী নীলেন্দুর মুখ দেখতে লাগল, হাসি দেখল। তার আচমকা মনে হল, নীলেন্দু ইচ্ছে করে, তার মনের জ্বালা মেটাবার জন্যে মহীতোষকে এই খোঁচাটা দিল। এর কি কোনও দরকার ছিল? মহীতোষ কি একলাই বড় খেলোয়াড়? তুমি কি কিছু কম নীলেন্দু?
যেন কিছুই নয়, সহজ গলায় দেবযানী নীলেন্দুকে বলল, তুমি এখনও সেই তোমাদের কী যেন নাম ছিল ক্লাবটার–সেই ছোট ক্লাবের খেলোয়াড়ই থেকে গেলে? তাই না?
নীলেন্দু প্রথমটায় বুঝতে পারেনি। পরে বুঝল। বুঝে কেমন অপ্রস্তুতভাবে হাসল।
.
০৫.
জানলা খোলার শব্দে নীলেন্দু সাড়া দিয়ে বলল, দেবীদি?
দেবযানী জানলা খুলে দিল। বাইরে রোদ। আলো ছড়িয়ে গেল ঘরে। বেলা হয়েছে বোঝা যায়।
আর না, এবার ওঠো– দেবযানী বলল। শান্ত, মিষ্টি গলা; সকালের সঙ্গে যেন চমৎকার মানানসই শোনাল।
নীলেন্দু আলস্যের গলায় বলল, কটা বাজল?
দেবযানী বিছানার মশারি খুলতে খুলতে বলল, অনেক বেলা হয়েছে। এত ঘুম তুমি ঘুমোও কী করে?
নীলেন্দু জবাব দিল না। শুয়ে শুয়ে দেখতে লাগল, দেবীদি পায়ের দিকের মশারি খুলে মাথার দিকে চলে গেল। মশারির আড়াল থেকেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে দেবীদিকে। সাধারণ শাড়ি, কাঁধের ওপর ভেঙে পড়া খোঁপা, লম্বা লম্বা ফরসা হাত, দুগাছা করে সোনার চুড়ি। দেবীদির পিঠের সেই সামান্য বাঁকানো ভঙ্গি, কোমরের ভাঁজ–কিছুই নষ্ট হয়নি।
মশারি খুলে ফেলে দেবাযানী বলল, তুমি আজকাল খুব কুঁড়ে হয়ে পড়েছ। বলতে বলতে নীলের গায়ের ওপর থেকে মশারি টেনে নিল দেবযানী।
গলা পর্যন্ত মোটা কম্বলে ঢাকা নীলেন্দুর; বাসি মুখে দেবযানীর দিকে তাকিয়ে হাসল যেন। বলল, দেবীদি, কতকাল পরে আজ আবার এই শুভ ঘটনাটি ঘটল বলতে পারো?
দেবযানী বুঝতে পারল না। বলল, কোন শুভ ঘটনা?
হাসিমুখে নীলেন্দু দেবযানীকে দেখতে দেখতে হালকা অথচ আন্তরিক গলায় বলল, সকাল বেলায় তোমার মুখ দেখলাম, প্রথম মুখ। তুমি আমার ঘুম ভাঙিয়ে বিছানা তুলে দিচ্ছ। …আহা, এমন মধুর স্বপ্ন সেই কবে যেন দেখেছিলুম, তারপর ভুলেই গিয়েছিলাম।
দেবযানী হেসে ফেলল। এমন করে কথা বলে নীলেন্দু, না হেসে পারা যায় না। বলল, থাকো না এখানে, রোজই নিজের হাতে বিছানা তুলে দেব।
লোভ দেখিয়ো না, তুমি লোভ দেখালে এখনও আমার কী বলে যেন রক্তের মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়।
দেবযানী আর দাঁড়াল না, চলে গেল।
নীলেন্দু উঠল। সমস্ত মন প্রফুল্ল। শরীরও বেশ ঝরঝরে লাগছিল। কালকের ক্লান্তি যেন কোথাও আর নেই। জানলার বাইরে রোদ ঝকঝক করছে। বেলা হয়েছে মন্দ নয়। হাই তুলে, মাথার ওপরকার সিলিংটা একবার দেখল নীলেন্দু। এখনও সামান্য ঝাপসা হয়ে রয়েছে। হাতকাটা সোয়েটারটা গায়ে পরে চাদর জড়িয়ে নীলেন্দু মুখ ধুতে চলে গেল।
কুয়াতলায় মুখ ধোয়ার সময় নীলেন্দু মহীতোষকে দেখতে পেল। বাগানে লাটুর সঙ্গে কথা বলছে।
নীলেন্দু শব্দ করে মুখ ধুতে লাগল। মহীতোষ দেখল।
কী রে, ঘুম ভাঙল? মহীতোষ সামান্য তফাত থেকেই বলল।
খুব ঘুমিয়েছি। …তোমার মর্নিং ওয়াক হয়ে গেছে?
কেন, তুই সঙ্গে যাবি নাকি? মহীতোষ হেসে জবাব দিল।
আজ আর হল না। কাল–। নীলেন্দুও পরিহাস করে বলল।
মুখ-টুখ ধুয়ে মুছে এসে নীলেন্দু রান্নাঘরের কাছে ঢাকা বারান্দায় রোদে বসল। চা এনে দিল দেবযানী।
