নীলের সঙ্গে দেশবন্ধু পার্কের দিকে একটা বাড়িতে এসে মহীতোষকে দেখল। সন্ধের মুখে স্নান সেরে আদুল গায়ে মহীতোষ বসে ছিল। বৈশাখ মাসের গরমে কলকাতা তেতে পুড়ে ঘেমে মরছে।
দেবযানীকে দেখে মহীতোষ যেন সামান্য অপ্রস্তুত বোধ করে গায়ে একটা গেঞ্জি চাপিয়ে নিল।
প্রথম পরিচয়। সাধারণ কিছু কথাবার্তা। মেটে রঙের কানাভাঙা কাপে তিন কাপ চা। সস্তা সিগারেটের বিশ্রী গন্ধ আর ধোঁয়া। দেবযানীর মোটেই ভাল লাগছিল না।
বাইরে এসে দেবযানী বলল, তোর ওই মহীদাদা কী করে রে?
নীলেন্দু বলল, তোমার মতন মাস্টারি করে।
কোথায়?
বাইরে করত। বর্ধমানের দিকে। ….এখন আর করে না।
কেন?
কী হবে করে? কীসের জন্যে মাস্টারি? কার জন্যে মাস্টারি? …তোমাদের এই বইয়ের বিদ্যে প্রেসার কুকারে গলিয়ে যাদের পেটে দিচ্ছ তারা ওই বিদ্যে নিয়ে কী করবে, দেবীদি? এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে গিয়ে লাইন মারবে আর দু বেলা মা বাপের চোখের কাঁকর হয়ে থাকবে। এই তো?
দেবযানী অবাক চোখে ঘাড় ঘুরিয়ে নীলেন্দুকে দেখতে লাগল। আজকাল নীলেন্দু যে তাড়াতাড়ি বদলে যাচ্ছে এটা দেবযানী লক্ষ করেছিল। অনেকবার জিজ্ঞেসও করেছে, তোর কী হয়েছে রে? নীলেন্দু স্পষ্ট করে কিছু বলত না, অস্পষ্ট করেও তার এই পরিবর্তনের আভাস দিতে চাইত না। শুধু বলত, আমার কিছু ভাল লাগে না, দেবীদি। চারদিকের ব্যাপার-স্যাপার অসহ্য লাগে। এভাবে বেঁচে থাকার কোনও মানে হয় না।
নীলেন্দু যে বেশ কিছু ছেলের মতন হতাশ, ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ হয়ে উঠছে দেবযানী বুঝতে পারছিল। বুঝতে পারছিল, কোনও টান তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে অনেকের মতন, কোনও আবেগ তাকে সাধারণ জীবনযাপনের একঘেয়েমি থেকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। যে ছেলের জীবনের উদ্দেশ্য কিংবা শখ ছিল কলকাতার ফুটবল মরসুমে বড় ক্লাবের হয়ে খেলতে নেমে হাততালি কুড়োবে–সেই ছেলে খেলাধুলোর কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে জীবন সম্পর্কে কেমন সচেতন হয়ে পড়তে লাগল ক্রমশ। দেবযানীর খারাপ লাগত না; বরং ভালই লাগত। অনেক সময় দেবযানী নীলেন্দুকে আদর করে বলত তুই যে একেবারে দাউ দাউ করে জ্বলছিস আজকাল। বিপ্লববহ্নি নাকি রে? নীলেন্দু হাসত।
বলতে নেই, এই নীলেন্দুর জন্যেই মহীতোষের সঙ্গে দেবযানীর পরিচয় এবং যোগাযোগ, নীলেন্দুর জন্যেই মহীতোষের সঙ্গে প্রথম প্রথম কিছু রুক্ষ বাক্যবিনিময়। অথচ, জীবনে এমন ঘটনা হামেশাই ঘটে–যেখানে আদি আর মধ্যর মধ্যে কোনও মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। দেবযানী মহীতোষকে প্রথম দিকে বিশেষ পছন্দ করেনি; প্রথম দর্শনে তার প্রেমোদ্রেকও হয়নি; মহীতোষের কোনও কিছুই তাকে বিস্মিত ও মুগ্ধ করেনি। কিন্তু ক্রমশ কেমন করে যেন দেবযানী মহীতোষের আকর্ষণে পড়ে গেল। তাকে ভালবেসে ফেলল। এই ভালবাসার দুটো পর্ব। প্রথম পর্বে দেবযানী ছিল মহীতোষের ব্যক্তিত্ব এবং চরিত্রের দ্বারা আচ্ছন্ন। দ্বিতীয় পর্বে সে মহীতোষকে, মনে হয়, অনেকটা নিজের মনোমতো পথে আনতে পেরেছে।
এসব অবশ্য সহজ সরল ব্যাপার নয়, রাতারাতি কিছু ঘটেনি। অনেক সময় গিয়েছে, অনেক ভয়-ভাবনা, উদ্বেগ, দুশ্চিন্তার দিন কাটিয়ে তবে মহীতোষকে দেবযানী এই অবস্থায় দেখতে পাচ্ছে।
বাড়িতে দেবযানী আর মহীতোষের ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত কারও অজানা ছিল না। দাদা বউদিরা এসব পছন্দও করেনি। কিন্তু দেবযানী কারও পছন্দের মুখ চেয়ে থাকত না, সে অভেস্য তার ছিল না। ছন্নছাড়া সংসারে কে কার অভিভাকত্ব করবে, কারই বা সে উৎসাহ আছে। যাই হোক, বাড়ির অবস্থাটা এমন ছিল না যে, দেবযানী দাদাদের দিয়ে বিয়ের মেরাপ বেঁধে ছাদনাতলায় দাঁড়িয়ে মহীতোষের গলায় বরমাল্য দেবে। দাদারা রাজি হত না, সে মনোভাব তাদের ছিল না। মহীতোষও বরবেশে এ বাড়িতে আসত না। কাজে কাজেই দেবযানী একদিন বাড়ি ছেড়ে চলে এল। আসার আগে সে তার নিজের গয়নাগাটি নিয়ে এসেছে। একে ঠিক পালানো বলে না। বাড়ি ছেড়ে চলে আসা বলে। দেবযানী সেই ভাবেই এসেছে। দাদারা যে খুশি হবে না–এটা তার জানা ছিল। সে গ্রাহ্যও করেনি। এখনও করে না।
.
বারান্দায় শব্দ হল। দেবযানী অন্যমনস্ক থাকায় একটু বোধ হয় চমকে উঠেছিল শব্দে। তাকাল। বারান্দায় আলো নেই। রান্নাঘরের খুব ম্লান আলোয় মনে হল মহীতোষ বারান্দা দিয়ে কোথাও যাচ্ছে। পায়ের কাছে কিছু ছিল, ধাক্কা লেগে পড়ে গেছে।
দেবযানী চায়ের কাপ গুছিয়ে নিল। কড়াইশুটির রান্নাটা শেষ হয়ে এসেছে। গন্ধ আসছিল। উনুনের তাতে হাত-পা বেশ গরম হয়ে এসেছে দেবযানীর। কপালের ওপর চুল এসে পড়েছে। চুল সরিয়ে নিয়ে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
সামান্য পরে দেবযানী নীলেন্দুর ঘরে এল। এসে দেখল, নীলেন্দু কোলের ওপর কম্বল চাপিয়ে বিছানায় বসে আছে, মহীতোষ তার মুখোমুখি, বিছানার ধার ঘেঁষে বসে। গল্প করছে দুজনে।
দেবযানী হাত বাড়াল। কড়াইশুটি সেদ্ধ; খাও। খুব গরম। সাবধানে ধরো, গায়ে ফেলো না। অ্যালুমিনিয়ামের বাটিটা এগিয়ে দিল দেবযানী, খুব গরম বলে বাটির তলায় কাচের প্লেট বসিয়ে এনেছে।
নীলেন্দু খাবার নিয়ে চামচ দিয়ে বাটির মধ্যে ঘাঁটতে লাগল। সত্যিই খুব গরম, ধোঁয়া দেখা না গেলেও গরম ভাপ অনুভব করা যাচ্ছিল। নাকের কাছাকাছি বাটিটা এনে টমাটো, কড়াইশুটি, কাঁচা লঙ্কার গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে নীলেন্দু মোহিত হবার ভঙ্গি করে বলল, বাঃ, এ যে খাসা ব্যাপার!
