সংসারটা একটা হোটেলখানা হয়ে উঠল, যে যার মতন থাকে। যার যা খুশি করে, এজমালি রান্নাঘর থেকে দু বেলার খাবার আসে মোটামুটি, বাকিটা যে যার নিজের ঘরে কিংবা বাইরে সেরে আসে। অসুখ-বিসুখে নিজের পছন্দমতন ডাক্তার আসে ঘরে। ওষুধ চলে। কেউ কারও খবর নেয় না, বা নিলেও সেটা মুখের খবর।
দাদাদের মধ্যে দেবযানীর সবচেয়ে কাছের লোক ছিল ছোড়দা। ছোড়দার স্বভাবটা ছিল অস্থির গোছের, কোনও দিকেই মন বসাতে পারত না; লেখাপড়ায় তার মাথা ছিল মোটামুটি কিন্তু গোড়ার কটা বছর শুধু চেখে চেখে বেড়াল, একবার পড়ল সায়েন্স, তারপর গেল ডাক্তারি পড়তে, ছেড়ে দিয়ে আবার এল কমার্স পড়তে। কোনও রকমে সেটা শেষ করলেও চাকরি বাকরিতে গা করল না। কিছুদিন ব্যবসা ব্যবসা করে মেতে থাকল, হরেক রকম কোম্পানির নাম ছাপানো লেটার প্যাড তৈরি করে ঘুরে বেড়াল; তারপর.ব্যবসা ছেড়ে কোথাকার কোন বিস্কুট কারখানায় কাজ নিল। সেটাও ছেড়ে দিল মাস দুয়েকের মধ্যে। ছোড়দা যে বছরে কতবার একটা ছেড়ে অন্য একটা ধরেছে তা দেবযানীরও জানা নেই। শেষে তার বিয়ে করার শখ চাপল।
ছোড়দার বিয়েটা পুরোপুরি তার পছন্দের এমন কথা বলা চলে। বহরমপুরে কোনও বন্ধুর বাড়িতে গিয়েছিল বেড়াতে, সেখানে একটি মেয়েকে দেখে খুব মনে ধরে যায়। কলকাতায় ফিরে এসে বাড়িতে বউদিদের কাছে সরাসরি তার বিয়ের ইচ্ছেটা জানিয়ে দেয়।
ছোটবউদি সাধারণ পরিবার থেকে এসেছে তার কোনও অহঙ্কার নেই, গালভরা কথা নেই। বরং তার মধ্যে সাধারণ মানুষের ছোট ছোট দোষগুণ আছে। দেখতে যে প্রতিমা তা নয়, পুতুলও নয়, তবে ছিপছিপে চেহারার মধ্যে ভীষণ টান আছে, চোখে ধরে যায়। ছোড়দারও বোধ হয় সেজন্যে চোখে ধরেছিল।
বিয়ের পর ছোড়দা কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষ হয়ে গেল। তার খেয়াল-খুশির পালা চুকিয়ে সে কাজের লোক হয়ে পড়ল। এখন আর সে-ছোড়দা নেই, বন্ধুর সঙ্গে মিলেমিশে কাশীপুরে কারখানা খুলেছে ছোট ছোট যন্ত্রপাতির, লোহার টুকটাক জিনিস তৈরি করে। ভালই আছে ছোড়দা।
সংসারের এই অবস্থার মধ্যে–মানে মা মারা যাবার পর থেকে যে ঘোলা জলের স্রোত বয়ে যাচ্ছিল–সেই স্রোতের মধ্যে দেবযানীর দিকে কেউ নজর দেয়নি। হঠাৎ হঠাৎ কিংবা মুখে দু-চার বার দাদাদের টনক নড়ে ওঠার ভাব দেখা দিলেও সত্যি সত্যি কেউ তার জন্যে ব্যস্ত বা উদ্বিগ্ন হয়নি। মেজদা চাইত বড়দা বোনের দায়িত্ব নিক, বড়দা চাইত মেজদা নিক, আর ছোড়দা, যে নিজের দায়িত্বই নিতে জানত না সে আর বোনের দায়িত্ব কী নেবে? তবে সব দোষ দাদাদের ঘাড়ে চাপানো উচিত নয়। দেবযানী নিজেই এমন একটা জীবন কাটাত যাতে তার ওপর খবরদারি করার সাহস দাদাদের হত না। কোনও দিনই সেটা হয়নি। বাবার আমলে নয়, মার আমলেও নয়। পরে আর কেমন করে হবে! দেবযানী নিজের মতন থাকত, সংসারের কোনও ব্যাপারেই তার ঔৎসুক্য ছিল না, গরজও ছিল না, সম্পর্কও ছিল ছাড়া ছাড়া। দাদাদের ব্যাপার স্যাপার সে পছন্দ করত না, তার ব্যাপারেও কারও কৌতূহল সে বরদাস্ত করতে রাজি ছিল না।
দেবযানীর যখন পড়াশোনা শেষ হয়ে আসছে তারও কিছু আগে থেকে নীলের সঙ্গে তার পরিচয়। নীলেন্দু ছোছাড়দার উদয়ন ক্লাবের খেলোয়াড় ছিল; খুব পেটোয়া ছিল ছোড়দার। কলেজে পড়ত নীলেন্দু, থাকত উল্টোডিঙির দিকে; ছোড়দা তাকে কোথায় ফুটবল খেলতে দেখে নিজের দলে টেনে এনেছিল। নীলেন্দু ভাবত, ছোড়দা তাকে কলকাতার কোনও বড় ক্লাবে নিশ্চয় ঢুকিয়ে দেবে। ছেলেমানুষ, খেলার নেশায় পেয়ে বসেছে, তার এসব ভাবনা কোনওটাই অযৌক্তিক নয়। ছোড়দাও নীলেন্দুকে খুব ভালবাসত।
বাড়িতে হরদম নীলেন্দুর আসা-যাওয়া থেকে দেবযানীর সঙ্গে আলাপ। সেই আলাপ জমেও উঠল বেশ। বয়েসের দিক থেকে দুজনের মধ্যে এমন একটা তফাতও ছিল না, বছর দুই-তিন বড় জোর। দুজনে বন্ধুর মতন হয়ে উঠেছিল। একসঙ্গে কত যে ঘোরাঘুরি, হুড়োহুড়ি করেছে। নীলেন্দুর ছেলেমানুষি স্বভাব, তার সজীবতা, উদাত্ত স্বর, অফুরন্ত জীবনীশক্তি দেবযানীকে মুগ্ধ করে রাখত। অথচ, সমস্ত চাপল্যের মধ্যে নীলেন্দুর একটা জায়গায় সীমানা বাঁধা ছিল, সে দেবযানীকে বন্ধুত্ব ও প্রীতির বাইরে অন্য কোথাও বসাতে চায়নি। দেবযানীও নয়।
ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়ে দেবযানী তার হাত ফাঁকা দেখে কী করব কী করব ভাবতে গিয়ে মেয়ে-স্কুলে একটা চাকরি নিয়ে নিল। মাস আষ্টেক পরে তার ফিলজফির মাঝারি ফলাফল দেখিয়ে কলকাতা শহরের গায়ে মেয়ে কলেজে একটা চাকরি পেয়ে গেল। সকালের কলেজ। বাড়ি থেকে ভোের ভোর ছুটত, ফিরত বেলায়; দুপুরটা বাড়িতে কাটিয়ে বিকেলে নীলের সঙ্গে এখান-ওখান করে বেড়াত।
নীলেন্দু চেয়েছিল খেলোয়াড় হতে; যত দিন যেতে লাগল–সে খেলাটাকে আর আমলে আনতে চাইল না! দেবযানী দেখল, নীলেন্দু বড় তাড়াতাড়ি বদলে যাচ্ছে। এম. এ. পড়তে ঢুকে ইউনিভার্সিটি ছেড়ে দিল, তার বিকেলের ঘোরাফেরা কমে যেতে যেতে বন্ধ হয়ে এল, দেবযানীদের বাড়িতেও আর আসত না।
দেবযানীর বড় ফাঁক ফাঁকা লাগল, মন উশখুশ করত, রাগও হত কখনও কখনও।
একদিন নীলেন্দু বলল, চলো, তোমায় এক জায়গায় নিয়ে যাই।
কোথায়?
চলো না; দেখতেই পাবে।
