ছেলেমেয়েদের মধ্যে দেবযানী সবচেয়ে ছোট বলে এবং একটি মাত্র মেয়ে বলে বাবার প্রশ্রয় সবচেয়ে বেশি পেয়েছে। মার প্রশ্রয়ও কম নয়। কে জানে, মেয়েকে এতটা আদর-সোহাগ দেবার জন্যেই দেবযানী সংসারের অন্যদের চেয়ে খানিকটা আলাদা রকম হয়ে উঠল কি না!
চায়ের জল গরম হয়ে গিয়েছিল। কেটলি নামিয়ে রাখল দেবযানী। চায়ের জল আগে ফুটিয়ে নিয়ে ভুলই করল সে, আবার হয়তো জল গরম করতে হবে। হাতের কাছেই সসপ্যান ছিল–কী মনে করে দেবযানী চায়ের জল সসপ্যানে ঢেলে দিয়ে কড়াইশুটির দানাগুলো ঢেলে দিল; দিয়ে উনুনের ওপর সসপ্যান চাপিয়ে দিল। কটা আলুর টুকরো আর টমাটো দেবে গোটা দুই। পরে দিলেই চলবে।
মালসাগুলো ঘরে দিয়ে আসার জন্যে দেবযানী উঠে পড়ল।
.
রান্নাঘরে ফিরে এল দেবাযানী একটু পরেই।
নিজের কথা ভাবতে বসলে দেবযানী নিজেই অবাক হয়ে যায়, কোথা দিয়ে কী হয়ে গেল সে নিজেও ভাল বুঝল না। ছেলেবেলায় যে মেয়ে মার বুক না খুঁটে ঘুমোতে পারত না, বাবার হাতে জুতো মোজা পরত, দিদিমার চোখের মণি ছিল–সে কি এই দেবযানী? লোকে জীবনের সঙ্গে নদীর তুলনা দেয়। এটা সহজ তুলনা। কিন্তু একেবারে যে বেমানান তাও নয়। নদীর কোনও সোজাসুজি সরাসরি পথ থাকে না, তার কোনও ধরাবাঁধা নেই, কোন পথ দিয়ে কোন বাঁক খেয়ে, কোথায় বাধা পেয়ে কেমন করে সে তার প্রবাহ বয়ে নিয়ে চলে আসে–বোঝা যায় না।
দেবযানী যে সংসারে জন্মেছিল তাতে তার জীবনের মোটামুটি একটা ধরাবাঁধা পথ থাকা উচিত ছিল; কিন্তু তাই কি থাকল? মনে তো হয় না। যদি থাকত তবে এই বয়েসে দেবযানীর কলকাতার কোনও বড় পরিবারের বউ হয়ে গোটা দুই ছেলেমেয়ে মানুষ করার কিংবা, বরের পাশে শুয়ে শুয়ে ঘরসংসারের গল্প করারই কথা ছিল। সেটা মানাত। কিন্তু এখন যা করছে দেবযানী এটা তাকে মানাচ্ছে না।
বাবা যখন মারা গেল তখন দেবযানী কিশোরী, বছর তেরো-চোদ্দ বয়েস। তার শরীর তখন বয়েস হিসেবে অতটা বাড়ন্ত হয়নি, একটু রোগা রোগা ছিল, মাথায় লম্বা দেখাত। বাবা তাকে শাড়ি ধরাতে দেয়নি। মা বাড়িতে মাঝে মাঝে শাড়ি পরাত। সাদা স্কার্ট ফ্রকের ওপর নীল রঙের হাতকাটা জোব্বা চাপিয়ে স্কুলে যেত দেবযানী, তার হাঁটা-চলার মধ্যে নাকি অহমিকা থাকত। লোকে বলত, তার চোখ নাকি রাস্তার কোনও দিকে পড়ত নানাকের সিধে সে তাকিয়ে থাকত। কেন বলত দেবযানী জানে না।
বাবা মারা যাবার পর সংসারে একটা ধাক্কা লেগেছিল। তবে সে ধাক্কা সামলে নিতে অন্যদের তেমন দেরি হয়নি, শুধু মা আর দেবাযানীর অনেকটা সময় লাগল। বিশেষ করে দেবযানীর। বাবার বুকের তলায় তার যে আশ্রয় ছিল তেমন আর কোথায় পাবে। আসলে বাবা বেঁচে থাকতে দেবযানী যা যা করার স্বাধীনতা পেত বাবা মারা যাওয়ার পর সেই স্বাধীনতা যেন খর্ব হতে লাগল। মা মেয়েকে অতটা মাথায় চড়তে দিতে চাইত না।
বড়দার বিয়ের বছর দেবযানী স্কুলের পড়া শেষ করে। বড়বউদি মানুষ খারাপ ছিল না কিন্তু এমন এক বাড়ি থেকে এসেছিল যেখানে মেয়েরা স্বামী, সত্যনারায়ণ আর সন্তান ছাড়া আর কিছু বোঝে না। দেবযানীকে খুব কিছু ভাল চোখে দেখত না বড়বউদি। তার চালচলনকে অপছন্দ করত।
মেজদা আর বড়দার মধ্যে বয়সের তফাত বছর তিনেকের। মেজদার চেহারা রাজপুত্রের মতন প্রায়, যেমন লম্বাচওড়া তেমনই মুখ হাত-পার গড়ন। কথায়বার্তায় ঝকঝকে। চেহারা আর গুণের জন্যে তার অফিসে টপাটপ প্রমোশন পেয়ে অফিসার হয়ে গেল। মা মেজদার বিয়ের জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। মার মনে মনে ইচ্ছে ছিল, যদি সম্ভব হয় মেজ ছেলে আর মেয়ের বিয়ে একই সাথে মিটিয়ে দেবে। দেবাযানী তখন কলেজে পড়ছে। মেয়ের সম্বন্ধ যা আসত মার তা পছন্দ হত না। একটা ভাল সম্বন্ধ পেয়েছিল, কিন্তু ছেলেরা এলাহাবাদে থাকে, ছেলের বাবা নাকি জজ; মা সে সম্বন্ধ বাতিল করে দিল, কেননা দুরে মেয়ে পাঠাবে না মা। মেজদার পাত্রীই বরং আগেভাগে পছন্দ হয়ে গেল মার। কলকাতার বনেদি বাড়ির মেয়ে, লেখাপড়া জানা, দেখতে সুন্দর। মেজদার বিয়ে হয়ে গেল।
মেজবউদি শ্বশুরবাড়িতে এসে কিছুদিন সব নজর করল। ভীষণ চালাক। ওপর থেকে তার মতন মিষ্টি মানুষ আর হয় না, শাশুড়িকে গলিয়ে ফেলল। বড়বউদি বোকা, মায়ের সঙ্গে যে তার বনিবনা হচ্ছে না–এটা প্রকাশ করে ফেলতে লাগল প্রকাশ্যে। মা যেন তাতে অসন্তুষ্টই হল।
এই সময়ে মা মারা গেল। সংসারে যখন ওপর ওপর সব ঠিক থাকলেও ভেতরে ভাঙন শুরু হয়েছে–ঠিক তখন।
মা মারা যাবার পর সংসারের চেহারা দেখতে দেখতে পালটে গেল। বোধ হয় বড় বড় পরিবারের এই রকমই হয়; যতক্ষণ মাথার ওপর কেউ থাকে যে রাশ টেনে ধরে রাখার ক্ষমতা রাখে ততক্ষণ সকলেই কাছাকাছি পাশাপাশি যেন একই রথ টেনে নিয়ে যাচ্ছে; যে-মুহূর্তে সেই লোক সরে গেল ঘোড়ারা যে যার মতন ছিটকে চলে গেল। মা যে বাঁধন দিয়ে রেখেছিল তাতে সংসার ছিল বাঁধা, মা মারা যাবার পর ছড়িয়ে পড়ল, ছত্রাকার হয়ে গেল।
বড়দার হয়তো ধারণা ছিল, মা মারা যাবার পর সে হবে বাড়ির মাথা। বড়বউদি সংসারের একটা উঁচু আসনের আশা করত। সে সব আর হল না। বড়দা আর মেজদা, বড়বউদি আর মেজবউদিতে লেগে গেল। দুই ভাই আর তাদের বউয়ের রেষারেষি ইতরামি এমন জায়গায় নেমে গেল যে বাড়ির বাচ্চাকাচ্চারা পর্যন্ত কাকা জ্যেঠার ঘর মাড়াতে ভয় পেত। বড়দাকে কোনও ব্যাপারেই স্বাধীন ভাবে সংসারের কিছু করতে দেওয়া হত না। এমনকী কর্পোরেশনের চিঠির জবাব পর্যন্ত তার একার দেবার অধিকার ছিল না।
