খাবার ঘরে ছেলেমেয়েগুলোর খাওয়া-দাওয়া শেষ হল। তুষারের ঘর আর মলিনার ঘরের বাচ্চাগুলোর পর বাকি তিন ঘরের ছেলেমেয়েরা এসে খাবে। জ্যোতিবাবু আর খাবার ঘরে আসেন না, প্রফুল্লবাবুও নন। আশাদি একাই সব কজনকে সামলে খাইয়ে দেয়। ঠাকুর আছে, ঝি আছে। অসুবিধে বড় একটা হয় না।
খাওয়ার ব্যাপারটা এখানে খুবই সাধারণ। ভাত, ডাল, তরিতরকারি, মাছের টুকরো পাতে থাকে কোনওদিন, কোনওদিন থাকে না। বাচ্চাদের দুধ দেবার খুবই সাধ ছিল সাহেবদাদুর–সংগ্রহ করা মুশকিল বলে পেরে ওঠেন না। বেলা দুটো নাগাদ এদের জলখাবার দেওয়া হয়। কোনদিন রুটি-তরকারি, কোনওদিন ফলমূল, কোনওদিন বা আর কিছু।
তিনটেয় ছুটি। নুটুর বাস শহরের ছেলেমেয়ে নিয়ে ফিরে যায়। এখানে যারা থাকে তারা ছোটে সাহেবদাদুর বাড়িতে।
.
বাচ্চাদের খাওয়া শেষ হলে তুষার কারও কারও হাত-মুখ ধুয়ে দিল, মুছিয়ে দিল। ছেলেমেয়েগুলো ছুটতে ছুটতে খেলতে খেলতে চলে গেল মাঠের দিকে।
মলিনা বাইরে জলের ড্রামটার কাছে দাঁড়িয়েছিল। পাশে দুটো কলাগাছ, একটা পেঁপে গাছ; হাত পনেরো দুরে রান্নাঘর। এঁটো পাতায় ডাঁই এনে মতি-ঝি আঁস্তাকুড় রাখা চৌবাচ্চাটায় ফেলল।
এখানে শরৎ আর হেমন্তর তফাতটা যেন ভাল করে বোঝা যায় না। আজ বোঝা যাচ্ছিল আকাশের দিকে তাকিয়ে রোদ লক্ষ করে। সারা আকাশ খুব হালকা নীল, যেন সেই নীল থেকে কুলোয় করে কেউ ঝকঝকে রোদ ঝেড়ে ঝেড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে। ফড়িংয়ের মতন কয়েকটা সবুজ পোকা উড়ছিল। পেঁপেগাছের চিকরিকাটা পাতার ডগা দুলছে থেকে থেকে, কলাগাছের তলায় দুটো বেড়াল বাচ্চা খেলা করছে।
মলিনা রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলল, তুমি আমাদের পাড়ায় গিয়েছিলে তুষারদি?
তুষার হাত ধুয়ে ড্রামের কাছ থেকে সরে এল। না, যাইনি!
তুমি ওদিকে যাও না?
খুব কম। আমি বাড়ি থেকে বড় একটা বেরোতে পারি না।
মলিনা শাড়ির আঁচলের পাক গলায় জড়াল একবার, আবার খুলল। মুখচোখ খুব বিরস। তুষারের দিকে তাকাল না, অনেকটা আপন মনে কথা বলার মতন করে বলল, বাড়িতে থেকেও তুমি বেরুতে পার না, আর আমরা–? কথাটা মলিনা শেষ করল না।
তুষার লক্ষ করল মলিনাকে। মলিনা এই রকম। তার কথা কখনও পুরোপুরি বোঝা যায় না।
তোমাদের কী হয়েছে? তুষার শুধোল।
মলিনা জবাব দিল না। তার মুখের হতাশ বিরক্ত অসুখী ভাব থেকে যা বোঝার বুঝতে হবে। মলিনার মুখে কখনও হাসি থাকে না। ও কখনও খুশি নয়। মলিনার মনে যে সুখ নেই, সর্বক্ষণ যেন সে সেটা প্রকাশ করতে চায়!
তুষারের হাতে বেশি সময় নেই। আশাদির কোয়ার্টারে গিয়ে তাকে স্নান করে নিতে হবে। সকালে তুষার স্নান করে আসতে পারে না। এখানে এসে এই খাওয়ার ছুটিতে সে স্নান করে নেয়। স্নান করে, খাওয়া-দাওয়া সারে। ঘণ্টাখানেকের বেশি সময় সে নেয় না। কেই বা নেয় এখানে! আশাদি অবশ্য মাঝে মাঝে বলে, দেখ তুষার, আমার বড় আলসেমি বাড়ছে, খাওয়ার পর একটু শুয়ে আসতে ইচ্ছে করে। কেন বল তো?
সকাল থেকেই যে তোমার খাটুনি।
সে তো তোরও।
তোমার মতন নয়।
কথাটা অবশ্য ঠিক। এই এতগুলো ছেলেমেয়ে তারা পাঁচ-সাত জন–সকলের রান্না বান্না খাওয়া-দাওয়ার ভার আশাদির ঘাড়ে। জ্যোতিবাবু বাজার আর ভাঁড়ারের দায় মাথায় নিয়েছেন, বাকি সব দায় আশাদির। খুব সকালে উঠে আশাদি ঠাকুর-চাকরদের এদিকের ব্যবস্থা বুঝিয়ে এবং গুছিয়ে দিয়ে তবে অন্য কাজে হাত দিতে পারে।
তুষার সময় নষ্ট করতে পারছিল না। খাবার ঘর পরিষ্কার করে অন্য দলের পাতা পড়ছে। মলিনার কোনও তাড়া নেই। তুষার বলল, তোমার কোনও দরকার আছে? কাজ থাকে তো বলো, আমি বরং সময় করে একবার তোমাদের ওদিকে যাব।
দরকার। …মলিনা তুষারকে অন্যমনস্ক চোখে দেখল। না, দরকার নেই কিছু৷দু মুহূর্ত থেমে চাপা গলায়, যেন অনুচিত কোনও অনুরোধ করেছে এমন সুরে বলল, আমি পাঁচটা টাকা দেব তোমার হাতে। বাড়িতে যদি পৌঁছে দাও। বাবা একটা ধুতি কিনতে টাকা চেয়েছিল। মলিনার মুখ অপ্রসন্ন, তিক্ত।
তুষারের ভাল লাগছিল না। মলিনার বাড়ির কথা উঠলে তার অস্বস্তি হয়, ভাল লাগে না। তুষার বলল, বেশ তত দিয়ো। আমি পাঠিয়ে দেব।
তুষার আর অপেক্ষা করল না। আশাদির ছেলেমেয়েগুলো আসছে, তাদের গলার শব্দ শোনা যাচ্ছে। তুষার বারান্দার মতন ঢাকা জায়গায় উঠে দেওয়ালের পেরেকে ঝুলোনো বেতের টুকরিটা নিয়ে চলে গেল।
সামনেই আশাদির কোয়ার্টার, গা লাগানো। এই কোয়ার্টারে আশাদি আর মলিনা থাকে। দুজনের দুটো ছোট ছোট ঘর, এক ফালি বারান্দা। কাঠের জাফরি দিয়ে বারান্দাটাও অনেকখানি ঘেরা। কোয়ার্টারের পেছন দিকে উঠোন, কলঘর।
আশাদির ঘর খোলাই থাকে। তুষার ঘরে এসে বেতের টুকরিটা রাখল।
ঘরের জানলাগুলো খোলা। রোদ এসে বিছানায় পড়েছে আশাদির। ঘরটা ছোট, খুব সাধারণ ভাবে সাজানো, বিছানার তক্তপোশ ছাড়া আসবাবের মধ্যে একটা ছোট টেবিল-খান দুয়েক বেতের মোড়া; এক কোণে আশাদির সেলাই কল, বাক্স, স্যুটকেস। জানলায় পরদা নেই। দেওয়ালে আশাদির মার ফটো। এক ক্যালেন্ডার ঝুলছে পশ্চিমের দেওয়ালে। ঘরটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন।
একটা মোড়া টেনে তুষার একটু বসল। এলো খোঁপাটা খুলে নিল। কাল মাথায় জল দিতে পারেনি; আজ জল না দিলে বিকেলে আর মাথা তোলা যাবে না। বেতের টুকরি থেকে শাড়ি জামা বের করে পাশে রাখল তুষার–বিছানার ওপর, চিরুনি বের করে চুলের গোড়ার জট ছাড়িয়ে নিল। তুষার তেল আনতে ভুলে গেছে আজ। তাতে কোনও ক্ষতি নেই। কলঘরে আশাদির মাথায় মাখা তেল আছে– নারকেল তেল। তুষার কোনওদিনই মাথায় একরাশ তেল মাখতে পারে না, অথচ একটু তেল জল না পড়লে তার বড় মাথা ধরে।
