গল্প শুরু করার আগে তুষার তার বেতের টুকরিটা আনিয়ে নিল। তারপর গল্প শুরু করল।
গল্পের মধ্যে তুষার কোনও ছেলের জামায় সেফটিপিন আটকে দিল, কারও চুল আঁচড়ে দিল, মেয়েদের বিনুনি বেঁধে দিল। পরিবেশটা স্কুলের নয়, ঘরের; মনে হবে বাড়িতে দালানে বসে যেন কোনও দিদি মাসি পিসি তার স্নেহের পাত্রদের সাজিয়ে-গুছিয়ে কোথাও বেড়াতে নিয়ে যাবার জন্যে তৈরি হচ্ছে।
অর্জুনের গল্প শেষ হতে কতক্ষণ লাগবে কেউ জানে না। কিন্তু আর একটু বেলায় এদের সকলের খাওয়ার ছুটি। তুষার ওদের নিয়ে খাওয়ার ঘরে চলে যাবে। হাত-মুখ ধুইয়ে খাওয়াবে সকলকে। তারপর বিশ্রাম। ওরা এই ঘরে এসে শুয়ে পড়বে। অবশ্য কেউ বড় একটা শোয় না। খেলা করে, দুরন্তপনা করে।
তুষার গল্প বলতে বলতে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাল। রোদ গাঢ় হয়ে উঠেছে। পাখিদের কিচকিচ শব্দ ভেসে আসছে। হাত-ঘড়ি দেখল তুষার, দশটা বেজে গেছে।
গল্প মাঝপথে, শিশুতীর্থর পেটা ঘড়িতে ঘণ্টা বাজল। দূর থেকে শব্দটা কেঁপে-কেঁপে ভেসে এল। খাওয়ার ছুটি।
গল্পের আকর্ষণে কেউ উঠল না। তুষার হাসল। বলল, চল। বাকিটা পরে হবে।
দুপুরে? শানু শুধোল।
কাল।
না, না, আজ। তুষারকে কয়েকজনে মিলে জাপটে ধরল।
আজ দুপুরে ওই গানটা হবে যে, পুশি ক্যাট পুশি ক্যাট হোয়ার হ্যাড ইউ বিন..
ওটা গান নয়, ইংরেজি ছড়া। সবাই জানত কথাটা। এ-ঘরেও গান হয়, তুষারদির সঙ্গে তারা সবাই গায়। সেগুলো বাংলা গান। ইংরেজি ছড়ায় গানের মজা নেই, কিন্তু তুষারদি ছড়ার সঙ্গে সঙ্গে খেলা খেলান। খেলাটা খুব মজার।
আমি আজ ক্যাট হব। টুটুল বলল।
শানু টুটুলকে কাঁচকলা দেখাল। ফলে টুটুল শানুর ওপর লাফিয়ে পড়বে এটা স্বাভাবিক। শানু দু-হাত মুঠো করে পাকিয়ে শুন্যে ঘোরাতে ঘোরাতে মাথা ঝাঁকিয়ে বলছিল, আমি টাইগার। ক্যাটকে খেয়ে ফেলব।
তুষার উঠল। বেতের টুকরি হাতে করেই উঠে দাঁড়াল। ছেলেমেয়েরাও তৈরি। বলল, চল তোরা।
হুড়মুড় করে ছেলেমেয়েগুলো ঘর থেকে দৌড় দিল।
তুষার চলে যাচ্ছিল। যেতে গিয়ে তার জুতোর কথা মনে পড়ল, অন্যান্য জিনিসগুলোও নিল তুষার। জামাটা নিল না। জামাটা যার তাকে নিজের ঘরেই পাওয়া যাবে। অন্য বাচ্চাদের জিনিস এবার দিয়ে দেবে তুষার।
বাইরে এসে তুষার দেখল, তার ঘরের ছেলেমেয়েরা ছুটে অনেকটা দূরে চলে গেছে।
.
০৪.
শিশুতীর্থর সব ব্যবস্থাই একটু অন্য রকম। এখানে স্কুলের মতন করে ক্লাস হয় না, পড়াশোনা করানোর রীতি নেই। সাহেব দাদু যখন শিক্ষা নিয়ে রীতিমতো মাথা ঘামাতে বসলেন তখন তাঁর মনে হয়েছিল, কচি বয়সের এই ছেলেমেয়েগুলোকে ক্লাসরুমে পুরে খোঁয়াড়ের মতন আটকে রেখে কোনও লাভ নেই। পড়াশোনাকে জীবনের আর সমস্ত থেকে আলাদা করে দেখা আমাদের স্বভাব। এটা ভাল না।
সাহেবদাদু এমন একটা ব্যবস্থা খুঁজছিলেন যাতে এই কচি বয়সের ছেলেমেয়েগুলোর জীবনযাপন এবং শিক্ষাকে অঙ্গীভুত করা যায়, যেন, স্বতঃস্ফুর্ত ভাবেই এরা যেটুকু শেখবার শেখে, বাকিটুকু ফেলে দেয়।
কিছু কিছু বিদেশি বই আনিয়ে বিভিন্ন শিক্ষার ধারা বোঝবার চেষ্টা করেছিলেন তিনি, কোনও কোনওটা মনঃপূত হলেও তাঁর সামর্থ্য যা তাতে বড় কিছু একটা করার উপায় ছিল না। ফলে ইচ্ছে থাকলেও সে-সব বৃহত্তর ব্যাপারে তিনি যাননি। এমন সময় হল্যান্ড না কোন দেশের গ্রাম্য বিদ্যালয়ের একটা পদ্ধতির বিবরণ তাঁর চোখে পড়ে। ব্যবস্থাটা তাঁর ভাল লাগে, ভরসা হয় এখানে এই রীতি তিনি চালু করতে পারবেন।
অন্যের পরিকল্পনা নিজের মনের মতন করে, সম্ভব-অসম্ভব খতিয়ে দেখে তাঁকে সেই ব্যবস্থাটা এখানের মতন করে গড়ে নিতে হয়েছে। সেই নিয়মেই শিশুতীর্থ চালানো হয়।
এখানে গুটি পাঁচেক শিক্ষক শিক্ষয়িত্রী। ছাত্র সংখ্যা ষাট-পঁয়ষট্টি। ছাত্রদের ভাগ করা হয়েছে বয়স দেখে, কখনও কখনও তাদের স্বাভাবিক বুদ্ধিবৃত্তি দেখে। এদের এক একটি দলকে এক একজন শিক্ষকের হাতে সম্পূর্ণ ভাবে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। যেমন তুষারের হাতে যারা আছে তারা একান্ত ভাবেই তুষারের হাতে মানুষ হচ্ছে। তুষারের ঘর কথাটার অর্থ তুষারের ক্লাস। তুষারের ছাত্রদের যাবতীয় যা কিছু তুষারই শেখাবে। ঘণ্টায় ঘণ্টায় মাস্টার বদলাবে, একজন এসে ইংরেজি শেখাবে, অন্যজনে অঙ্ক–এসব ব্যবস্থা এখানে নেই। সাহেবদাদুর ধারণা ভাগের মা গঙ্গা পায় না যেমন, তেমনি পাঁচ হাতে শিক্ষা হয় না। শিক্ষা এক হাতে একের অধীনে হওয়া দরকার। তাতে মানুষের মনে যে পারিবারিক বোধ আছে তার বিকাশ হয়, যারা শেখে তারা শিক্ষকের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হয়ে ওঠে, আত্মীয়তা বোধ করে, আর যে শেখায় তার সুখ এই, সে নিজের মনের মতন করে, নিজের কল্পনা মতন ছাত্রদের শেখাতে পারে। এই স্বাধীনতা না থাকলে, সাহেবদাদু বলেন, টিচার আর কী শেখাতে পারে! আমরা মাস্টার ভাড়া করি, তাঁদের হাতে ভার তুলে দিই না। পিতা-মাতার যেমন সন্তান ছাত্র এবং শিক্ষকের সম্পর্কটা সেই রকম পারবারিক ও অন্তরঙ্গ করতে হবে, দায়-দায়িত্ব সব থাকবে তাঁরই ওপর, যেমন ছেলেমেয়ের দায় শিক্ষা সবই তার বাবা-মার।
সাহেবদাদুর এই নীতি যে কার্যক্ষেত্রে সফল হয়েছে, শিশুতীর্থ দেখলে সেটা বোঝা যায়। বোঝা যায়–তুষার, আশাদি, জ্যোতিবাবুকে দেখলে। আর দুজন আছে এখানে, প্রফুল্লবাবু আর মলিনা, এরা দুজনেই নতুন। প্রফুল্ল কেন যেন এখনও ঠিক তৈরি হয়ে উঠতে পারেনি। মলিনা তৈরি হয়ে উঠতে পারবে কি না সে বিষয়ে সন্দেহ আছে।
