রান্নাঘর থেকে বাচ্চাদের খাওয়া-দাওয়ার শব্দ প্রায় নিরবচ্ছিন্ন ভাবে ভেসে আসছে। ওরা এই রকম, খেতে বসেও শান্ত নয়। জ্যোতিবাবু দরজার কাছে দাঁড়িয়ে তদারক করেন, আশাদি ভেতরে পাতের কাছে ঘুরে ঘুরে দেখছেন, তবু যেন মনে হবে একটা ছোট হাট বসে গেছে।
চুল ছাড়িয়ে শাড়ি জামা হাতে নিয়ে তুষার উঠে পড়ল। পিছনের দরজার ছিটকিনি খুললেই উঠোন, উঠোনের একপাশে কলঘর। উঠোনের দুধারে দুই খুঁটি, তার বাঁধা। আশাদি আর মলিনার সকালের শাড়ি জামা শুকোচ্ছে। রোদ উঠোন মাড়িয়ে ডালিম গাছটার দিকে সরে গেছে অল্প। কয়েকটা চড়ুই ফর ফর করে উড়ছিল।
তুষার তাড়াতাড়ি স্নান করতে কলঘরে ঢুকে গেল। ড্রামে আজ জল কম। আশাদি বোধহয় সকালে স্নান সেরে রেখেছে। জল সাবান গোলা। তুষার তার গা-মোছা গামছাটা খুঁজে পেল না। কলঘরের একপাশে দড়িতে তার গামছা থাকে। কোথায় গেল গামছাটা? আবার কলঘর থেকে বাইরে আসতে হল তুষারকে। বাইরে কোথাও তার গামছা নেই। তুষার মনে মনে ঈষৎ বিরক্ত হল।
সাবান গোলা জলে স্নান করতে করতে তুষার মলিনার কথা ভাবল। মলিনা এই রকম। তার সব কাজই অপরিষ্কার। এই জলে সে সাবান দিয়ে ঘোলা করেছে, ওই যে কয়েকটা নোংরা পড়ে আছে এক পাশে–ভেতর-জামা, সায়া, ওগুলোও মলিনার। নিজের হাতে তোলার অবসর পায়নি, ফেলে রেখেছে, ঝিকে দিয়ে কাচিয়ে নেবে। তুষারের মনে হল, গামছাটাও বোধহয় মলিনা ব্যবহার করে ঘরে নিয়ে গিয়ে কোথাও ফেলে রেখেছে।
স্নান সেরে ধোওয়া কাপড় জামা গায়ে জড়িয়ে তুষার বেরিয়ে এল। তার ধোওয়া শাড়ি জামা নিংড়ে রোদে মেলে দিতে দিতে আকাশের তলায় দুটো চিলকে সাঁতার কাটতে দেখে কয়েক পলক তাকিয়ে থাকল তুষার। তার ভাল লাগছিল।
রোদে মেলা ভিজে শাড়িতে একবার করে মাথা মোছে তুষার আবার একবার করে চুল ঝাড়ে। খাবার ঘর শান্ত। কতক কাক কা কা করছে।
আশাদির পায়ের শব্দ শুনতে পেল তুষার। আশাদি ঘরে এসেছে।
অগোছালো শাড়ি পরে তুষার ঘরে এল।
আশাদি বিছানায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছে।
চান হল?
হল। …আমার গামছাটা পেলাম না। তুষার তার চিরুনি তুলে আগে চুল আঁচড়ে নিতে লাগল।
পেলি না?
না।
সে কী? আশাদি অবাক। কোথায় গেল?
আমি কী করে জানব। তুষার বলল, বলেই ছেলেমানুষের মতন গলা করে বলল, মাথা মুছতে পেলাম না ভাল করে, দেখো তো কি জল থেকে গেল। সারাদিন ভিজে থাকলে এমন গন্ধ হয় মাথায়।
আমার গামছাটা নিলে পারতিস।
না, তুমি যা ফিটফাট, তোমার গামছায় মাথা মুছে রাখলে গালাগাল খাবে কে!
আশাদি নিজেই উঠল। বাইরে রোদ থেকে গামছা এনে তুষারের মাথা মুছিয়ে দিল। বলল, তোর চুল যেন আরও বাড়ছে, তুষার।
আরও খুকি হচ্ছি যে। তুষার শব্দ করে হেসে উঠল। হেসে মুখ ফিরিয়ে আশাদিকে দুহাতে জড়িয়ে ধরল।
ছাড়। আশাদি নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। নিজের তো সব হয়ে গেল, আমার আজ চান হয়নি।
তুষার আশাদির মাথার দিকে লক্ষ করল। তুমি চান করোনি?
না। সময় করে উঠতে পারলাম না।
কিন্তু জল কই, যেটুকু ছিল আমি শেষ করে এলাম। তাও আবার সাবান গোলা জল।
আশাদি গায়ের আঁচল আলগা করল। মুখে কপালে ঘাম। গালে কীসের একটা আঁচড় লেগে লাল হয়ে আছে। তুষার দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে গায়ে জড়ানো শাড়িটা ভাল করে পরতে লাগল।
আশাদি বলল, সকালে ওঁর কাছে গিয়েছিলাম। শরীর খারাপ। দেরি হয়ে গেল।
কী হয়েছে ওঁর? তুষার বাড়তি আঁচল হাতে গুটিয়ে নিয়ে নিমেষে আশাদির দিকে ঘুরে দাঁড়াল। তার মুখে উৎকণ্ঠা।
একটু জ্বর জ্বর মতন হয়েছে।
সাহেবদাদুর শরীর ইদানীং আর ভাল যাচ্ছে না। প্রায় কোনও না কোনও উপসর্গ লেগে থাকে। ওঁর জ্বর হয়েছে শুনে তুষার উদ্বিগ্ন হল।
বলল, ঠাণ্ডা–?
হতে পারে। জানি না ঠিক।
ডাক্তারবাবুকে খবর দিয়েছ?
উনি দিতে বারণ করলেন। গাড়িটাও তখন তোদের আনতে বেরিয়ে গেছে।
তুষার আঁচল গায়ে তুলল। জ্যোতিবাবুকে বললে না কেন, সাইকেল নিয়ে চলে যেতেন?
আশাদি কোনও জবাব দিল না। মনে হল ভাবছে যেন কিছু।
তুষার বলল, আমি বিকেলে দেখা করে যাব।
আশাদি স্নানের জন্যে ঘর ছেড়ে চলে যেতে যেতে বলল, যাস। …ও শোনদরজার কাছেই আশাদি ঘুরে দাঁড়াল, আমায় উনি ওই আদিত্যবাবুর কথা জিজ্ঞেস করছিলেন। আমি কিছু বলতে পারলাম না। ওই ভদ্রলোকও কেমন। আমার ভাল লাগে না।
আশাদি চলে গেল, তুষার দাঁড়িয়ে থাকল।
.
০৫.
এখন দুপুর। বাইরে রোদ প্রখর। ভাদ্রের শেষ বলে রোদে হলকা আছে। গাছ এবং গাছের পাতায় অনেকটা তাপ শুষে যাচ্ছিল বলে গরমের আঁচ গায়ে জ্বালা ধরাচ্ছিল না। তা ছাড়া বর্ষা হয়ে গেছে, কালও দু-চার পশলা ছিল, কাজেই বাতাস তেমন গরম নয়। তবু ঘাম হচ্ছিল। তুষার তার বেতের মোড়ায় চুপ করে বসে। তার ঘরের ছেলেমেয়েগুলো এখন খুব শান্ত। ওরা হাতের লেখা করছে। হাতের লেখা শেষ হলে, তুষার ভেবে রেখেছে আজ স্বাস্থ্য পড়াবে। স্বাস্থ্য পড়ানোর একটা মোটামুটি ছক সে ঠিক করে রেখেছে।
হাতের লেখা লেখবার সময় বাচ্চারা যেমন এক শব্দ বা কথা উচ্চারণ করে টেনে টেনে-সেই রকম শব্দ হচ্ছিল। বিভিন্ন ছেলে মেয়ের গলায় বিভিন্ন শব্দে সেই ধ্বনি অদ্ভুত শোনাচ্ছিল।
বাইরে ঘুঘু ডাকছে। গাছের ছায়ায় বসে রোজ দুপুরবেলা এমনি করে ঘুঘু ডাকে এখানে। মাঝে মাঝে কোকিলও। আজ কোকিলটা আশে পাশে কোথাও নেই, কোন ঘরের সামনে গিয়ে বসেছে জানে।
