তুষারের ঘরের একটু বর্ণনা দিতে হয়। ঘরটা খুব বড় নয়, লম্বা ছাঁদের দেখতে। মাথার ওপর খাপরার ছাউনি, চটের সিলিং দেওয়া। সিলিঙের ওপর ঘন চুনকাম। দেওয়ালগুলোতে প্লাস্টার নেই, ইটের গাঁথনির গায়েই চুনকাম পড়ে পড়ে সাদা হয়ে আছে। দুপাশেই বড় বড় জানলা গোটা চারেক।
ঘরের মেঝে সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। প্রায় সমস্ত ঘর জুড়ে পাতলা চট ছড়ানো, তার ওপর বড় বড় শতরঞ্জি পাতা। বাচ্চাগুলো মাটিতে বসে, ছোট ছোট ডেস্ক পড়ে আছে–একটা বেঞ্চিও। ঘরের দেওয়ালে কাগজের ফুল সাজানো, দুচারখানা ছবিও। তুষারের বসবার দিকটা বারো রকম জিনিসে ভরা, কিছু ছবির বই-পত্ৰ, গ্লোব, ব্ল্যাকবোর্ড, ন্যাকড়ার খেলনা, মাটির মূর্তি, আরও কিছু কিছু জিনিস এই রকমের।
তুষারের বসবার একটা চেয়ার আছে অবশ্য কিন্তু সেটা একপাশে সরিয়ে রাখা, টেবিলটাও। বেতের মোড়াটা টেনে নিয়েই বেশির ভাগ সময় বসে তুষার, কখনও কখনও সরাসরি শতরঞ্জির ওপর আসন হয়ে, কিংবা হাঁটু ভেঙে।
তুষারের বসবার দিকটার এক কোণে ছোট একটা দরজা খুললে কুঠরি মতন এক ফালি ঘর চোখে পড়বে। ঘরটা নানা কাজ অকাজের খুচরো জিনিসে ভরা, তবু, ওই ঘরেই নিচু ছোট জানলার পাশে একটা ক্যাম্বিসের হেলানো চেয়ার দেখলেই বোঝা যায় এটা তার বিশ্রামের নিভৃত স্থান।
তুষারের ঘরে এই রকম একটা কুঠরি থাকলেও সকলের ঘরে নেই। আশাদির ঘরে নেই, মলিনার ঘরেও নয়। জ্যোতিবাবুর ঘরে আছে, যদিও জ্যোতিবাবু সেটা ব্যবহার করেন বলে মনে হয় না।
তুষারকে যারা ঘিরে ধরেছিল তাদের একজনের গালে কালির দাগ। তুষার বুঝতে পারল না, এতখানি কালি কী করে ও মুখে মাখল।
ইস! তুষার ছেলেমানুষের মতন গলা করে বলল, বলে জিভ বের করল, যেন কত বড় একটা অঘটন ঘটিয়েছে ছেলেটা। মুখে কালি মাখালি কী করে রে, শানু?
কালি মেখে শানুর কোনও অনুশোচনা হয়েছে বলে মনে হল না। বরং সে গাল দুটো আরও ফোলাল, ফুলিয়ে চোখ বড় বড় করল।
ও বহুরূপী সাজছিল দিদি…অশোক বলল।
বহুরূপী? তুষার অবাক!
আমি কাল একটা বহুরূপী দেখেছি। শানু চোখ ঘুরিয়ে বলল। শানুর ওপর পাটির তিনটে দাঁতই পড়ে গেছে, নতুন দাঁত এখনও ওঠেনি। মাথার চুল খোঁচা খোঁচা।
ততক্ষণে যমুনা তুষারের বই খাতা কাগজপত্র এটা সেটা রাখার টেবিল থেকে কালির শিশিটা এনে দিয়েছে তুষারের হাতে। তুষার শিশি দেখেই বুঝতে পারল। কাল একটা লেখার কাজ করছিল তুষার, কালির শিশি বাইরে বের করেছিল, তুলে রাখতে ভুলে গেছে।
শানুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে তুষার কোলের কাছে টেনে নিল; হাসল, কেমন বহুরূপী দেখেছিস রে, শানু?
শানু সঙ্গে সঙ্গে তুষারের কোলের কাছ থেকে ছিটকে দুহাত সরে এল। সরে এসেই দু হাত তুলে চোখ জ্বলজ্বল করে বহুরূপীর বিবরণ দিতে লাগল। এত্ত বড়! …রাজা হয়েছিল। লাল জামা গায়ে, হাতে ধনুক ছিল। সেই বহুরূপীটাকে ছোট মামা একটা টাকা দিল।
রাজা বহুরূপী? তুষার ছেলেমানুষ হয়ে শানুর গল্প শুনতে লাগল।
হ্যাঁ-শানু মাথা নাড়ল। তারপরেই হেসে ফেলল কেমন, বলল, রাজাটার না দিদি, রাজাটার তরোয়ালই নেই। শানুর হাসি এবং কথা থেকে মনে হবে যে-রাজার তরোয়াল নেই সে আবার কেমন রাজা!
তুষার তার ছেলেমেয়েদের নিয়ে মাটিতে বসে পড়ল। ঘরের অন্যদিকে রুনু আর নন্তুতে ডিগবাজি খাওয়া, খেলা খেলছে; হাবুল মাটিতে মাথা আর দেওয়ালে পা তুলে দিয়ে ক্রমশ ঠেলে ওঠার চেষ্টার করছে কতদূর পা তুলতে পারে তারই পরীক্ষা, পড়ে যাচ্ছে পা, আবার চেষ্টা করছে। ঘরের মধ্যে অনর্গল কথা, চিৎকার, হাসি।
তুষার মাটিতে হাঁটু ভেঙে বসে বলল, রাজাটা বোধ হয় ভুল করে তরোয়াল বাড়িতে রেখে গিয়েছিল, শানু।
শানু তাকাল। কথাটা তার মনে লাগল। হতেও পারে, হয়তো সত্যি সত্যি তরোয়াল তার ছিল, বাড়িতে ফেলে গিয়েছে। শানুর চোখ-মুখ দেখে মনে হল, সে ভাবছে। তার দুঃখই হচ্ছে, আহা তরোয়ালটা থাকলে কেমন ভাল দেখাত রাজাকে।
যমুনা হাঁটু ভেঙে তুষারের পিঠের কাছে বসে। তুষারের খোঁপার ওপর একটা কুটো পড়েছিল কীসের। যমুনা কুটোটা তুলে নিয়ে ফেলে দিল। বলল, বহুরূপীরা আগের জন্মে গিরগিটি ছিল।
তুষার হাসল না। তাকে নিত্য এরকম অদ্ভুত মজার মজার কথা শুনতে হয়। যমুনার দিকে মুখ ফিরিয়ে তুষার বলল, কে বলল রে?
পিসিমা।
ও! …তুই বহুরূপী দেখেছিস?
হু, ক–ত দেখেছি।
কী কী সাজতে দেখেছিস?
অনেক, হনুমান, রাক্ষস..যমুনা ভেবে ভেবে বলল, ধোপা, শিব, দুর্গা, অর্জুন..
অর্জুন সাজতেও দেখেছিস?
যমুনা মাথা কাত করে হেলাল।
তুষার একটু কী যেন ভেবে নিল। অর্জুনের গল্প জানিস তোরা?
একটু আধটু জানত সবাই; কিন্তু কেউ আর কিছু বলল না। ওরা জানে, তুষারদিদি অর্জুনের গল্পটা নিজেই বলবে। সবাই একটু ঘেঁষে গুছিয়ে বসল।
তুষার হাতে তালি দিয়ে সকলকে চুপ করতে বলল। এত সহজে সবাই শান্ত হবে এমন কথা ভাবা ভুল। রুনু, নন্তু কিংবা হাবুলের কানে তুষারের তালির শব্দ পৌঁছেছে বলেও মনে হল না। জানলার কাছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দুটি মেয়ে হাতে তালি দিয়ে বিকুইক খেলছে।
তুষার এবার নাম ধরে ধরে ডাকল প্রত্যেককে। যমুনা ঘোষণা করে দিল, দিদি অর্জুনের গল্প বলবেন। দেখা গেল, গল্পের নামে সবাই কাছ ঘেঁষল পলকে। তুষারকে ঘিরে বসল ওরা।
