তুষার চোখে চোখে তাকাল আদিত্যর। কেন?
অল স্টুপিড।
তুষার বিরক্ত বোধ করল, প্রকাশ করল না। এখানের কোনও নিয়ম নেই।
তা তো দেখতেই পাচ্ছি, যার যা মরজি চালিয়ে যাচ্ছে।
দায়িত্ব আছে।
কী? …কী বললেন কথাটা? আদিত্য সমস্ত মুখ বিরূপ করে যেন ধমকে উঠল।
বললাম দায়িত্ব আছে। তুষার শান্ত গলায় জবাব দিল।
খবরদার–আদিত্য মাথা নেড়ে নেড়ে ব্যঙ্গ এবং রঙ্গের ভঙ্গিতে বলল, কাউকে যেন ভুল করেও কথাটা বলবেন না। বলে আদিত্য হেসে উঠল, নিয়ম নেই, দায়িত্ব আছে। হাউ স্টুপিড।
তুষার ভেবেছিল জবাব দেবে না। সে শান্ত থাকতে চেয়েছিল, পারল না। বলল, নিয়ম মানুষ তৈরি করে, দায়িত্ব অনুভব করতে হয়।
আদিত্য কৃত্রিম বিস্ময় প্রকাশের মতন চোখ বড় এবং স্থির করল। মানে কী কথাটার?
তুষার মানে বলল না। ঠোঁটের আগায় হাসল একটু। বলল, আপনার জন্যে এখানকার নিয়ম দায়িত্ব কোনওটাই নেই, ওকথা তুলে কী লাভ।
লাভ। আদিত্য অপ্রসন্ন উত্তেজিত স্বরে বলল, মুখে তো বললেন দিব্যি আমার জন্যে কিছু নেই, কিন্তু কাল কী হয়েছিল জানেন?
তুষার তাকাল।
কাল সন্ধেবেলায় আমি ওই কুয়াতলার দিকে–আদিত্য হাত বাড়িয়ে দূরে একটা জায়গা দেখাল, একটা বুনো বক মারার চেষ্টা করছিলাম।
বুনো বক?
খোঁড়া বক। কী ভাবে চলে এসেছিল যেন। ভাল মাংস হত। ওই মেয়েটা কী যেন নাম ইতি না কি, আপনাদের খোদ কর্তার বাড়ির মেয়েটা, সে এসে আমাকে ধমকে দিল।
তুষার ভেতরে ভেতরে অশান্তি বোধ করছিল, ওপরে কিছু প্রকাশ করল না, বরং কত যেন অন্যায় কাজ করা হয়ে গেছে এমন গলা করে বলল, না কি? আমাদের ইতি–
আকাশ থেকে পড়বেন না। আপনাদের ইতি-ফিতি আমি বুঝি না, বুঝতে চাই না। গাছের পাখি, বনের বক মারব তার আবার এখান-ওখান কী আছে! মেয়েটা এসে আমার মুখের ওপর শাসিয়ে বলে গেল, মারবেন না, দাদুর বারণ, রাগ করবেন।
আদিত্য যেন কালকের অপমান এবং আক্রোশ নতুন করে অনুভব করছিল, আমি একটা বক মারব তাতে তার দাদু রাগ করবে কেন? কী আমার এল গেল তার দাদুর রাগে। আরও একদিন ও আমায় দাদুর কথা বলে শাসিয়েছিল, আমি এখানে বেড়াতে বেড়াতে সিগারেট খাচ্ছিলাম।
তুষার বিব্রত বোধ করছিল। চলে যেতে পারলে সে বাঁচে। বলল, এখানে এই চৌহদ্দির মধ্যে কতক জিনিস আছে যা করা অনুচিত।
যেমন–?
নিষ্ঠুর কিছু কাজ, অভব্য কোনও আচরণ।
মাংস খাওয়াটা নিষ্ঠুরতা, সিগারেট খাওয়া অভব্যতা–এসব আমায় শিখতে হবে?
সব জায়গায় সবকিছু করা যায় না।
না করার জন্যে আপনাদের নিয়ম আছে দেখছি। আদিত্য উপহাস করে বলল, ফন্দি-ফিকিরগুলো ভাল। সোজাসুজি বললেই পারেন, পয়সা নেই মাছ-মাংস খাওয়াবার তাই কাঁচকলার ঝাল খাওয়াই, ওসব বাজে কথা বলার কী দরকার।
তুষার কোনও জবাব দিল না। নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল। আদিত্য পিছন থেকে জোরে জোরে বলল, মানুষ ছাগল নয়। আপনারা একটা খোঁয়াড় তৈরি করে রেখেছেন। অল স্টুপিড।
তুষার পিছন ফিরে তাকাল না, সিঁড়ির অল্প কয়েকটি ধাপ ভেঙে বারান্দায় উঠল।
আদিত্য তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল। তুষারের হাঁটা দেখতে তার ভাল লাগে। স্কুল, মাংস, সিগারেট–কোনও কিছু আর মনে পড়ছিল না আদিত্যর। তুষারের শরীর তার ইন্দ্রিয়কে কেমন কাতর করছে। তুষার সুন্দর। তুষার…
তুষারের নীরব ঘর থেকে আচমকা একটা কলরব ভেসে এল, যেন জানলা খোলা পেয়ে একঝাঁক পায়রা বদ্ধ ঘর থেকে একসঙ্গে ডানা ঝাঁপটে বাইরে বেরিয়ে এল। আদিত্যের অন্যমনস্কতা নষ্ট হল শব্দে, ঘরটার দিকে ঘৃণা এবং বিরক্তির চোখে তাকিয়ে আদিত্য দাঁতে দাঁত ঘষে অস্পষ্ট গলায় কী যেন বলল একটা। তারপর মাঠ দিয়ে অন্য দিকে চলে গেল।
.
নিজের ঘরে ঢুকে তুষার একটা হাস্যকর অবস্থা দেখল। তার ঘরের ছেলেমেয়েরা আসন হয়ে বসে, মুখের কাছে খোলা বই নিয়ে চুপ করে বসে আছে। বীরুর চোখ বন্ধ, সে সমানে বই হাতে করে দুলছে, কানু দু-হাতে দুকান ধরে বসে আছে। মালা বইয়ের আড়াল দিয়ে আমসত্ত্বের টুকরো চুষছে।
তুষার নিজের জায়গায় গিয়ে জিনিসপত্র নামিয়ে রাখল। রোদের তাতে তার কপালে গলায় সামান্য ঘাম হয়েছে। শাড়ির আঁচলে মুখ মুছে তুষার আবার একবার ওদের দেখল।
ততক্ষণে ছেলেমেয়েরা সব যেন জ্যান্ত হয়ে উঠেছে। পিছু ফিরে একবার দেখে নিল নতুন লোকটা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে কি না! নেই, কেউ নেই। সঙ্গে সঙ্গে বীরুর দুলুনি থেমে গেল, চোখের পাতা স্প্রিঙের মতন খুলে গেল, এক লাফে বীরু দাঁড়িয়ে উঠল। কানু কান ছেড়ে মালার হাত থেকে আমসত্ত্ব কেড়ে মুখে পুরে দিল টপ করে। মালা কানুর জামা খামচে ধরল।
তোরা সকলে এত লক্ষ্মী হয়ে বসে! তুষার বলল, বলে এক পা এগিয়ে এল।
লক্ষ্মীরা নিমেষে যে কতবড় লক্ষ্মীছাড়া হতে পারে তার প্রমাণ দিতেই একজন কোথা থেকে একটা এয়ারগান বের করে ফট করে শব্দ করল, একটা ছেলে প্যান্টের পকেট থেকে বেলুন বাঁশি বের করে ফুঁ দিয়ে ছেড়ে দিল, বাঁশি বাজতে লাগল, অন্যগুলো কোলাহল করে উঠল, কেউ তুষারের কাছে ছুটে গেল, কেউ বা বসে বসেই অন্যের সঙ্গে খুনসুটি শুরু করল।
যে-ঘর এতক্ষণ ফাঁকা নির্জীব নিষ্প্রাণ মনে হচ্ছিল–তুষার আসার পর সেই ঘর যেন জীবন্ত মুখর হয়ে উঠল। এই ঘরের এটাই রীতি, এ-রকমই স্বাভাবিক।
