অনেকটা সময় চুপচাপ বসে তুষার নিজের বিরক্তি রাগ সামলে নেবার চেষ্টা করল। সে যে কেন রাগল, কেন অসন্তুষ্ট হল–তার যথার্থ কারণ খোঁজা কঠিন নয়। আদিত্যর ওপর মনে মনে যতটা রেগেছে তুষার, যেরকম অসন্তুষ্ট হয়েছে, তারই খানিকটা অযথা বাচ্চাগুলোর ওপর যেন ফলিয়ে এসেছে।
খারাপ লাগছিল তুষারের, অনুতাপ হচ্ছিল। নিজের এই অকারণ মানসিক চাঞ্চল্যের জন্যে গ্লানি বোধ করছিল।
পরে অশোক শানু যমুনার জন্যে তুষারের কেমন কষ্টও হল। ওদের দোষ নেই, ওরা কি জানত রোজ ওরা যা করে যেভাবে সময় কাটায়, আজ তুষারদিদি তাতে হঠাৎ রাগ করে বসবে!
তুষার উঠল। মনে মনে ঠিক করল আজ অশোক শানু যমুনাকে দিয়ে অন্য রকম ভাবে ইতিহাসের একটা গল্প পড়াবে।
.
দুপুরের খাওয়ার ছুটিতে আদিত্যকে দেখা গেল। তুষার ছেলেমেয়েদের নিয়ে খাবার ঘরের দিকে যাচ্ছে, আদিত্য গাছতলায় দাঁড়িয়েছিল।
ছেলেমেয়েরা চলে গেছে অনেক, তুষার যাচ্ছে, আদিত্য গাছতলা থেকে ডাকল।
তুষার দাঁড়াল। দাঁড়িয়েই ভাবল, তার চলে যাওয়া উচিত ছিল।
আদিত্য কয়েক পা এগিয়ে এসে সামনে দাঁড়াল। মুখে চোখে প্রবল হাসি মাখানো। কী খবর?
তুষার মুখ তুলল না। মানুষটার গলার স্বর থেকেই সে আদিত্যর উৎফুল্লভাব অনুমান করতে পারছিল। এত আনন্দের কী আছে! তুষার বিরক্ত হয়ে ভাবল, এত খুশি হবার মতন কী পেয়েছে ও?
কাল আপনার জন্যে যা ভুগলাম। আদিত্য দুর্ভোগের মাত্রা জানাবার জন্যে তার কথার স্বর ও শব্দে ঝোঁক দিল।
তুষার কথা বলল না। কে ভুগেছে কাল? যে-লোক শাসায়, না, যে-লোক সর্বক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকে? আদিত্যর এই নির্লজ্জ উক্তিতে যেন তুষারের আরও রাগ হচ্ছিল।
কাল দেখলাম, মানুষ কত অভদ্র হয়। আদিত্য বলল।
তুষার মুখ তুলল, দেখল আদিত্যকে। লোকটা তাকে অভদ্র বলছে! তুষারের কপালের কাছটায় জ্বালা করে উঠল। কী দুঃসাহস, কতখানি ঔদ্ধত্য তার! কে অভদ্র?
আপনাদের স্টেশন-স্টাফ।
তুষার রুক্ষ চোখে দেখছিল আদিত্যকে। কথা পালটে নিয়েছে আদিত্য, তুষার সন্দেহ করল, বে-ফসকা কথাটা বলে এখন সামলাবার চেষ্টা করছে।
আমি মাঝরাতে স্টেশনের ওয়েটিং রুমে একটু শোব ভেবে ছিলাম। তালা বন্ধ ঘর, বললাম– মশাই একটু খুলে দিন। দিল না; বলল, আপনি তো প্যাসেঞ্জার নন। আদিত্য নিজের মনেই বলে চলল, লোকগুলো একেবারে অ্যানিমাল…।
যে-সে এসে থাকতে চাইলেই ঘর খুলে দেবে–তুষারের মুখ থেকে কথাটা বেরিয়ে গেল। সে স্টেশনের প্রসঙ্গে কথাটা বললেও আসলে এই কথার অর্থ ছিল, ভিন্ন ইঙ্গিত। আদিত্য তাকে ইঙ্গিত করেছে আগে, কাজেই তুষার সেই ইঙ্গিতের প্রত্যুত্তর দিল। আর কিছু বেশি হয়তো দিল, আদিত্যকে ভদ্রতা এবং ভদ্র বোধ সম্পর্কে কিছু জ্ঞান।
যে সে–! যে সে মানে কী! …ওয়েটিং রুম কারও ভাড়া করা বাড়ি নয়।
আপনিও প্যাসেঞ্জার নন।
আদিত্য হাসল। বলল, আঃ-হা, তা একটা লোক যখন বিপদে পড়েছে তখন অত নিয়ম কী। নেসেসেটি…।
সবাই নিয়ম ভাঙতে চায় না। তুষার অন্য অর্থে বলল।
সে যারা ভিতু, বা…নিতান্ত প্রেজুডিস…
আপনি তা মনে করতে পারেন। তুষার বলল, বলে হাঁটতে শুরু করল।
পাশে পাশে হাঁটছিল আদিত্য। হাঁটতে হাঁটতে বলল, আপনি কাল যদি কিছু খাইয়ে দিতেন তা হলেও বাঁচতাম। রাত্রে খিদে পেয়ে গেল খুব। পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেখি মাত্র পাঁচ আনা পয়সা। খেয়াল ছিল না, টাকা পয়সা নেই।
অনাহার এবং অনিদ্রা, তুষার ভাবল, কাল এই মানুষটার অনাহারে এবং অনিদ্রায় রাত কেটেছে, কাটুক, তুষার তার কী করতে পারে!
তারপর ওই খালি পেটে ভোর হতে না হতেই হাঁটতে শুরু করেছি। হেঁটে হেঁটে এতটা পথ। আদিত্য হাসল কেমন করে যেন, হাসি থামলে বলল, খুব শিক্ষা দিলেন।
তুষার ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল। শিক্ষা পেয়েছে না কি লোকটা? পেয়েছে যদি তবে হাসছে কেন?
পাওয়া উচিত। তুষার বলল, জোর দিয়েই বলল।
উচিত?
নয় তো কি ভাবছেন আপনার কোনও জ্ঞান হত।
আমার জ্ঞান কি আপনার চেয়ে কম?
আপনার কোনও জ্ঞানই নেই।
আদিত্য উচ্চস্বরে হেসে উঠল। তুষারের কথা বলার গাম্ভীর্য এবং রাগের ভাবে যেন সে অসাধারণ কোনও মজা পাচ্ছিল।
অপ্রত্যাশিত এই হাসি তুষারকে কেমন বিব্রত করল। মনে হল, তার সমস্ত কাঠিন্য, বিরক্তি যেন অর্থহীন হয়ে গেছে; আদিত্যকে কিছু স্পর্শ করতে পারছে না। কিছুই সে গ্রাহ্য করছে না।
তাড়িয়ে দিয়েও অত বড় বড় কথা শোনাচ্ছেন কেন? আদিত্য হাসি মুখে বলল।
তুষার নীরব। খাবার ঘরের কাছাকাছি তারা পৌঁছে গেছে।
কাল আপনি আমায় যেভাবে তাড়ালেন, মনে হল যেন কোনও ডাকাত কিংবা চোর-ফোরকে বাড়ির ত্রিসীমানা থেকে সরালেন!
মনে মনে তুষার স্বীকার করল, হ্যাঁ। হ্যাঁ সে এই মানুষটাকে ভয় পেয়েছিল। লোকটা তার বাড়িতে অবাঞ্ছিত ছিল। এমন মানুষকে কেউ আশ্রয় দেয় না। দেওয়া উচিত না।
খিদের মুখে আমার যা রাগ হচ্ছিল আপনার ওপর…! দুটো খেতে দিয়েই না হয় বাড়ি থেকে। তাড়াতেন!
তুষার বলব কি বলব না করে শেষ পর্যন্ত বলল, আপনিই কি আমায় খুব স্বস্তি দিয়েছেন?
আই ডিড নাথিং।
না, কিছুই করেননি। …খালি শাসিয়ে গেলেন, যখন খুশি চলে আসতে পারেন।
কিন্তু আমি আসিনি।
কী যেন বলতে যাচ্ছিল তুষার, অকস্মাৎ অনুভব করল, আদিত্য আসেনি বলেই কি তুষার এত বিরক্ত অপ্রসন্ন শূন্য বোধ করছে। আজকের এই ক্ষোভ দুঃখ রাগ মনমরা ভাব কি আদিত্যর না আসার জন্যে?
