স্বপ্নের কথা মনে পড়ল তুষারের। আর সহসা সে নিজেকে ধিক্কার দিয়ে উঠল, ছি ছি, এই সব বিশ্রী চিন্তা তার মনে আসছে কেন? কে আদিত্য, তার সঙ্গে তুষারের কীসের সম্পর্ক? কেন তার আসা না আসার ওপর তুষারের মন বিরক্ত বা অপ্রসন্ন হবে, কেন তার স্বপ্ন দেখে তুষার চোখের জল দিয়ে ভোর শুরু করবে।
তুষার কোনও কথা বলল না, দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল।
.
০৯.
দিদি?
কী?
তুই কোথায় গিয়েছিলি? বাইরে?
না। বাগানে ছিলাম। বসে ছিলাম। তুষার অন্যমনস্ক গলায় বলল।
শিশির দিদিকে দেখছিল। লণ্ঠনের মেটে আলোয় তুষারকে নিষ্প্রভ দেখাচ্ছিল, আলোটাও জানলার দিকে, তুষার দেরাজের কাছে দাঁড়িয়ে। শিশির দিদিকে লক্ষ করছিল। আজ এখন পর্যন্ত দিদি তার সঙ্গে তেমন কোনও কথা বলেনি। স্কুল থেকে ফিরে, অবেলায় অনেকক্ষণ নিজের ঘরে শুয়েছিল, সন্ধের পর উঠে চা খেয়ে, কাপড় ছেড়ে একবার এ-ঘরে এসেছিল, দু একটা কথা বলে চলে গেছিল। তারপর অনেকক্ষণ পরে হয়তো ঘণ্টা খানেকেরও বেশি বাইরে থাকার পর, এই ফিরল।
দিদিকে ভাল দেখাচ্ছে না। অবেলায় শোয়ার জন্যেই হোক, কিংবা দিদির কোনও কারণে শরীর খারাপ হয়েছে হয়তো, তাই কেমন ম্লান মনমরা শুকনো দেখাচ্ছে দিদিকে।
বাগানে ছিলি এতক্ষণ? কী করছিলি একলা একলা? শিশির বলল।
বসে ছিলাম।
তুই আবার একা বসে থাকতে পারিস নাকি? শিশির যেন বিশ্বাস করল না, কিংবা দিদির স্বভাবকে নিন্দেই করল। সে আমি, একা থেকে থেকে অন্য অভ্যেসই হয়ে গেছে।
বাইরেটা ভাল লাগছিল। তুষার দেরাজ থেকে থেকে পুরনো ওষুধের শিশি সরিয়ে কী যেন খুঁজছিল।
আমায় ডাকলি না কেন? শিশির বলল।
তুষার কথার জবাব দিল না। সে একা ছিল। একা থাকার সময় ভাইকে ডাকা যায় না। ডাকতে ইচ্ছে করে না।
হ্যাঁরে, এখানে না একটা অ্যাসপিরিনের শিশি ছিল? তুষার ভাইয়ের দিকে তাকাল।
দেখ, আছে ওখানেই। …তুই অ্যাসপিরিন খাবি?
মাথা ধরেছে বড়।
অবেলায় ঘুমোলি যে।
না। ঘুমোইনি। শুয়েছিলাম। তুষার অ্যাসপিরিনের শিশি খুঁজে পেল। সকালের দিকে ঠাণ্ডা লেগেছে বোধ হয়। তুষার কথা বলতে বলতে দেওয়ালের দিকে গেল। কুঁজো থেকে জল গড়িয়ে নিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকাল, বলল, কটা খাব রে? দুটো? চারটে?
না না, চারটে নয়, বুক ধড়ফড় করে মরবি। দুটো খা।
তুষার অ্যাসপিরিন মুখে দিয়ে জল খেল। অনেকটা জল। তারপর শিশি জায়গা মতন রেখে ভাইয়ের বিছানায় এসে বসল।
ভাই বোন মুখোমুখি। তুষার বিছানায় পা গুটিয়ে বসল। তাস খেলবি?
না, মাথা নাড়ল শিশির। তোর তো এমনিতেই মাথা ধরে আছে।
তা হোক; তাস আনি। তুষার নেমে পড়ছিল।
না রে দিদি, তাস না। ভাল লাগছে না। বরং দুটো গল্প করি।
তুষার আবার পা গুটিয়ে নিল। ভাইয়ের মুখ দেখল কপলক। শিশিরের মুখ বেশ সুন্দর। নরম পাতলা টিকলো নাক, শান্ত চোখ, কপাল বেশ লম্বা। তুষারের মুখের সঙ্গে নীচের মুখের মিল আছে ওপর মুখের নেই। ভাইয়ের মুখ মাঝে মাঝে তুষারকে কেমন বেদনা দেয়। কারণ এমন সুন্দর নরম মুখের পুরুষ মানুষটি কোনওদিন জীবনের সব তৃপ্তি পাবে না। ভগবানের নিষ্ঠুর অভিশাপ তাকে কী ভীষণ অক্ষম করে রেখেছে।
হ্যাঁরে দিদি, আমাদের বাগানে শিউলি ফুটেছে?
ফুটেছে। এখন অল্প।
আমি কালও গন্ধ পেয়েছি যেন। শিশির জানলার দিকে তাকাল, গাছটাকে এবছরে এমন নষ্ট করে দিল।
তার জন্যেই তো! তুষার বলল।
শিশির চুপ করে থাকল। শিউলি গাছটাকে এক বন্ধুর কথা শুনে লোক ডেকে ডাল পালা ছাঁটিয়ে দিয়েছিল শিশির। নতুন ডালপালা, নতুন অজস্র পাতার স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু গাছটাকে আগামুড়ো অমন করে কুপিয়ে কেটে দিলে এক বর্ষার জল আর কত তার গা ভরতে পারে।
আমায় কাল কিছু ফুল এনে দিস তো৷ শিশির বলল।
তুষার মাথা নাড়ল। দেবে। তারপর কী ভেবে আচমকা একটু ঠাট্টা করল। ফুল দেখে কবিতা লিখবি?
লিখলেই বা৷ শিশির জবাব দিল। দিদির চোখে চোখে চেয়ে হঠাৎ তার মাথায় কোনও দুষ্টুবুদ্ধি এল, বলল, আমরা ফুল দেখলে কবিতা লিখি, তোরা হলে মালা গাঁথতিস।
গাঁথতাম, অন্যায়টা কী হত।
কিছু না। মেয়েদের সবটাই তো কাজে লাগে এমন কিছু করা, প্র্যাকটিক্যাল পারপাস ছাড়া…
থাম, তুই আবার ছেলে মেয়ে কী বুঝিস? এক ফোঁটা তো ছেলে।
বুঝি না?
ডিম বুঝিস।
আচ্ছা, তা হলে, তোকে..ধর তোকে নিয়েই একটা গল্প লিখি।
গল্প?
লিখি না একটা। …আগে দু তিনটে লিখেছি। …আজকাল গল্প লিখতেও ইচ্ছে করে, দিদি। শিশিরের গলায় কোনও এক রকম বিষাদ। যেন বলতে চাইছে, সারাদিন সারাটা দিন একা একা আর পারি না রে, বড় অসহ্য লাগে। এই অসহ্য একঘেয়ে সময় কাটানোর জন্যে আর কী করা যায়, এক বসে বসে গল্প লেখা ছাড়া! আমি পারি, এই অফুরন্ত সময় নিয়ে বসে বসে, খোলা জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আমি এক মনে একটা একটা করে গল্প লিখতে পারি।
তুষার নীরব থাকল। ভাইকে আর দেখছিল না। শিশির কি কিছু বলতে চায়, শিশির কি কোনও কিছু বুঝতে পারে! তুষারের মনে হল, এই গল্প লেখার কথাটা একেবারে অকারণে নয়; তার সন্দেহ হল, শিশির কিছু ভাবে, হয়তো ভেবেছে।
ভাই বোন দুজনেই অল্প সময় নীরব থাকল। বাইরে শরতকাশের চাঁদ স্নিগ্ধ পূর্ণ জ্যোৎস্না ঢেলেছে, জানলার গা দিয়ে সেই জ্যোৎস্না ঘরে আসার অপেক্ষা করছে। শীতল মৃদু বাতাস আসছিল। রাস্তা দিয়ে কখনও কখনও সাইকেল যাচ্ছে। সাইকেলের ঘন্টি শোনা যাচ্ছে অস্পষ্ট ভাবে। তুষার ঘন্টির সঙ্গে অন্যমনস্ক এবং ভীত হচ্ছিল।
