.
যমুনা আর বেবি বি কুইক খেলছে। দুজনে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, দুজনেরই দুটো করে হাত বুকের কাছে তালি দেবার মতন করে ধরা, তিনবার করে তুড়ি দিচ্ছে, বার দুই করে তালি মারছে নিজেদের হাতে, তারপর পরস্পরের হাতে তালি দিয়ে যমুনা বলছে ব্ল্যাক বোর্ড…বি কুইক…বেবি পালটা তুড়ি দিয়ে, তালি মেরে যমুনার হাতে হাত ঠুকে বলছে, দিদিমণি…বি কুইক…।
ওরা দুজনেই একেবারে তুষারের বসার জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে। তুষারকে দেখেও হৃক্ষেপ করল না। কারণ যমুনা একটা শক্ত কথা বলে ফেলেছে, বেবি কিছুতেই আর শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না–তার পুঁজি ফুরিয়ে গেছে, সে হেরে যাচ্ছে।
তুষার তার বসার জায়গায় মেয়েদের দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেলা করতে দেখে হঠাৎ কেমন রেগে গেল। আর কখনও যা করে না, করেনি এ-যাবৎ, যমুনার কাঁধে হাত দিয়ে ঠেলে দেবার মতন করে মৃদু ধাক্কা দিল। নিজের জায়গায় যাও। নিজের জায়গায়। অসভ্য মেয়ে।
যমুনা এবং বেবি দুজনেই হাত নামাল। দুজনেই অবাক। ছোট ছোট দুটি মেয়ে নির্বোধ বিস্মিত চোখ তুলে তাদের তুষারদিদিকে দেখছিল।
কথা শুনতে পেলে না? তুষার গম্ভীর গলায় বলল, তার চোখে মুখে বিরক্তি।
যমুনা মাথা নাড়ল, কথা শুনতে পেয়েছে।
তবে এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন?
বেবি আগে, পরে যমুনা চলে গেল।
ঘরে তখনও হট্টরোল চলছে।
তুষার ব্ল্যাকবোর্ডের কাছ থেকে ডাস্টার তুলে নিয়ে টেবিলে ঠুকল, ঠুকে আওয়াজ করল; দু এক জন সেই শব্দে তুষারের দিকে চোখ ফেরালেও অন্যেরা খেলা এবং মজা ছাড়ল না। তুষার গলা তুলে বলল, চুপ করো। তোমরা চুপ করো সবাই। …এই শানু নিজের জায়গায় যাও। অশোক–এই অশোক, তোমায় আমি থামতে বলছি না, কানে কথা ঢুকছে না? বলতে বলতে তুষার ঘরের মধ্যে গিয়ে একে ছাড়াল ওকে বসাল, তাকে ঠেলে সরিয়ে দিল।
ছেলেমেয়েগুলো থতমত থেকে শান্ত হয়ে আসছিল। তুষার তাদের তিরস্কার করছে: সারাক্ষণ খেলা…! অবাধ্য অশান্ত সব ছেলেমেয়ে। তোমাদের কানে কথা যায় না, না? আমি চেঁচিয়ে যাচ্ছি, তোমরা নিজের মনে খেলা করে যাচ্ছ। এই অশোক, তুমি জানলার কাছে গিয়ে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকো। শানু, বোর্ডে গিয়ে তেরোর ঘরের নাম লেখো। …ছি ছি ছি। এই ঘরটা কী? মেলা নাকি? কেউ ঘরে ঢুকলে কী বলবে তোমাদের? ছি ছি…?
ঘর শান্ত স্তব্ধ। যে-ঘর সামান্য আগে শিশুকোলাহলে মুখর ও জীবন্ত হয়ে ছিল, সেই ঘর চুপ হয়ে গেল। এত চুপ যে মনে হবে, এ-ঘরের সমস্ত ছেলে ছুটির পর চলে গেলে ঘর যেমন নিঃসাড় নীরব হয়ে থাকে, তেমনি। কেউ আর কথা বলছিল না, ঠোঁট পর্যন্ত খুলছিল না। সকলেই বুঝতে পারছিল তুষারদিদিমণি খুব রেগেছে। ওরা কখনও, বা এত কম–এক আধবার তুষারদিদিকে গম্ভীর হতে, রাগ করতে দেখেছে যে, আজকের রাগ সবাই অবাক হয়ে দেখছিল। তুষারদিদি অনেকদিন আগে একবার মন্টুকে কান ধরার শাস্তি দিয়েছিল, আজ অশোককে। অশোক জানলার কাছে গিয়ে কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
শানু বোর্ডে তেরোর ঘরের নাম লিখছিল। সাত তেরোং একানব্বই পর্যন্ত লিখে আট তেরোংয়ের হিসেবটা মনে মনে ভাবছিল।
এই যমুনা, এদিকে এসো। তুষার ডাকল।
যমুনা জায়গা ছেড়ে গুটি গুটি পায়ে তুষারের কাছে এল।
গ্লোবের কাছে যাও।
যমুনা গ্লোবের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। গ্লোবের দক্ষিণ দিক কোনটা?
যমুনা যেন ঝপ করে পুকুরে পড়ে গেল। গ্লোবের দক্ষিণ দিক। সেটা কী? যমুনা গ্লোব থেকে মাত্র দুটো জিনিস বার করতে পারে ভারতবর্ষ আর উত্তরমেরু। তবু, শুকনো মুখে, বড় মানুষের মতন জিব দিয়ে ঠোঁট চাটতে চাটতে যমুনা গ্লোবে হাত রাখল। হাত দিলেই গ্লোব ঘুরে যায়। উত্তর মেরু উত্তরে এটা মনে মনে ঠাওর করলেও যে-গ্লোব ক্রমাগত হাত দিলেই ঘুরে যাচ্ছে, তার দিকনির্ণয় তার অসাধ্য। সে কি ছাই উত্তর দক্ষিণ জানে!
তুষার তার বেতের টুকরিটা এতক্ষণ মোড়ার ওপর নামিয়ে রেখেছিল। এবার তুলে নিল। বলল, হই হই, হট্টগোল করতে তো কষ্ট হয় না, নামতা লিখতে বললেই আর পারো না; দক্ষিণ দিক কোনটা তাও জান না। …আমি আর আসব না তোমাদের ঘরে। অন্য ঘরে চলে যাব। বলতে বলতে তুষার শানুর হাত থেকে খড়ি নিয়ে তেরোর নামতা পুরো লিখে দিল। যমুনাকে দক্ষিণ দিক দেখিয়ে চোখের দৃষ্টিতে ভর্ৎসনা করল, করে ছোট দরজা দিয়ে তার কুঠরি-ঘরে চলে গেল।
ঘরটা শান্ত স্তব্ধ, কেমন যেন আকস্মিক ঝড়ে নিয়মিত আবহাওয়া থেকে বিচ্যুত হয়ে অন্য রকম হয়ে থাকল। ছেলেমেয়েগুলো নীরব। সবাই মুখ শুকনো করে বসে। তুষারের ভর্ৎসনায় যেন আহত, ক্ষুব্ধ।
কুঠরি-ঘরে তুষার অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকল। এ-ঘরে এক চিলতে জানলা। জানলার দিকে মুখ করে ক্যাম্বিসের চেয়ারটা পাতা থাকে, আরও পাশে ছেলেমেয়েদের খেলাধুলোর আর পড়াশোনার কিছু জিনিসপত্র। ওরই মধ্যে তুলো আর কাপড় দিয়ে তৈরি মস্ত একটা হাঁস। ধুলোয় তার গা ময়লা হয়ে আছে।
জানলা দিয়ে তাকালেই দুরে জ্যোতিবাবুকে চোখে পড়ছিল। জ্যোতিবাবু তাঁর ছেলেমেয়েদের পড়াচ্ছেন। ঘরে চোখ ফিরিয়ে নিলে হাঁসটা চোখে পড়ছিল। এই হাঁসটাও জ্যোতিবাবুর তৈরি।
তুষার কখনও বাইরে তাকাচ্ছিল কখনও ঘরে চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল। বাইরে শরতের বেলা বেড়ে উঠছে। কাঁচের গায়ে রোদ পড়লে যেমন আলো ঠিকরে ওঠে, এখন রোদ তেমনি ঠিকরে আসছে; সবুজ ঘাসে যেন পালিশ তুলে দিয়েছে কেউ, বাতাসে গাছগুলোর ডাল পাতা মাঝে মাঝে কাঁপাচ্ছিল, আর পাখিরা ডাকছিল।
