নুটুর সাড়া পেয়ে তুষার সচেতন হল।
অন্যদিন তুষার নিজেই গাড়িতে ওঠে, কোন ছেলেমেয়ে কী ফেলে গেছে কুড়িয়ে নেয় যত্ন করে। আজ তুষার আর গাড়িতে উঠল না। নুটুর কাছ থেকে নিজের টুকরিটা হাতে নিয়ে মৃদু গলায় বলল, ভেতরটা একবার দেখে এসো, নুটু।
নুটু গাড়িতে উঠল।
তুষার চারপাশে তাকাল। সব ফাঁকা। মাঠ সবুজ, রোদে নরম। গাছের পাতা বাতাসে কাঁপছে মৃদু। জঙ্গলের দিকে বুঝি একটা গরুর গাড়ি চলেছে, ঘণ্টা বাজছে, গরুর গলায় বাঁধা ঘণ্টা।
নুটু একটা ব্যাগ, একটা চকোলেটের বাক্স, কার যেন পেনসিল কুড়িয়ে এনে তুষারের হাতে দিল।
আর ঠিক এ-সময় তুষার অবাক হয়ে দেখল, অনেকটা দূরে ফাঁকা মাঠে একটা ঘোড়া। ঘোড়াটা চরছিল, চরতে চরতে ডেকে উঠল।
নুটু–তুষার ঘোড়র দিকে চোখ রাখল, ঘোড়া কোথা থেকে এল?
নুটু মাঠের দিকে তাকিয়ে কেমন করে যেন হাসল একটু। বলল, ধনীরামের ঘোড়া, দিদি।
কার?
ধনীরাম। জঙ্গলের গাছ কাটায় ধনীরাম।
তুষার চলে যাচ্ছিল। নুটু বলল আবার, নতুন যে বাবু এসেছেন, সেই বাবু একটা ঘোড়ার কথা বলছিলেন। সাহেবদাদুর টমটমে জুতে চড়বেন। ধনীরামবাবুকে বলেছিলাম। কাল বিকেলে এনেছি। বড় বদমাশ ঘোড়া ওটা।
তুষার থমকে দাঁড়াল। আদিত্য ঘোড়া আনিয়েছে! সাহেবদাদুর সেই পুরনো গাড়িটায় ঘোড়া জুতে চড়বে! তুষার গভীর বিস্ময় বোধ করছিল।
নুটু নিজের গাড়ির মুখ খুলতে এগিয়ে গেল। কেমন একটা গন্ধ বেরোচ্ছে, তেল না কোনও কিছু পোড়ার কে জানে।
তুষার ফটকের দিকে এগিয়ে গেল।
মালতী লতার টোপর পরানো ফটকের তলায় এসে তুষারের পা কেমন অবশ হয়ে এল একটু। পাশে ঝাউয়ের কুঞ্জ থেকে একটা পাখি ডাকছে। জবা আর অপরাজিতার ঝোঁপ রোদ গায়ে দাঁড়িয়ে, অনেকগুলো ঘাস ফড়িং ঝোঁপের চারপাশে উড়ে উড়ে নাচছে। তুষার এসব চোখ চেয়ে ভাল করে দেখল না, চোখে পড়ল। চোখে পড়ল, সামনের মাঠে ক্ষুদে কুকুরটা চড়ুইয়ের সঙ্গে যেন কুমির কুমির খেলা খেলতে গিয়ে তুষারকে দেখেছে, ছুটে আসছে।
আরও দূরে জ্যোতিবাবু। আমতলায় বেতের মোড়া পেতে বসে জ্যোতিবাবু। তাঁর ছেলেমেয়েরা সবাই তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে।
তুষার হাঁটছিল। কুকুরটা গায়ের কাছে এসে লাফিয়ে উঠল। শাড়ির পাড় মুখে করে টানতে টানতে ক পা গেল, তারপর একটা পাখির বাচ্চা দেখে ছুটে আবার অন্য দিকে পালাল।
আশাদির ঘর থেকে গানের সুর ভেসে আসছে না। আজ কি তবে অনেকটা দেরি হয়ে গেল তুষারের!
আদিত্যকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। তুষার পথ চলতে চলতে চারপাশে তাকাল, গাছগাছালির আড়ালে কোথাও যদি লুকিয়ে থাকে আদিত্য তবে সেকথা আলাদা, কিন্তু কোথাও তাকে দেখা যাচ্ছে না।
তুষার বিরক্ত বোধ করল। আদিত্যের ব্যবহার আজ তার কাছে বিরক্তিকর মনে হল। এতক্ষণ, সেই সকাল থেকে এ-পর্যন্ত, গাড়িতে আসতে আসতে তুষার এই বিরক্তি অনুভব করেনি। কালকের সেই মাঠ টিলা চাঁদের আলো, আদিত্যের অবুঝ ছেলেমানুষি, তার আসব বলে ভয় দেখানো, এবং স্বপ্ন সব যেন মিলেমিশে কেমন সম্মোহিত করে রেখেছিল তাকে। তুষার কী ভাবছিল ভাল করে মনে করতে পারল না।
হয়তো তুষার কখনও ভেবেছে পুরোটাই স্বপ্ন, কখনও মনে করেছে আদিত্য বাস্তবিকই অবুঝ ছেলেমানুষ, আবার কখনও কিছু ভাবেনি, শুধু কালকের নির্জন দৃশ্যগুলি টুকরো টুকরো ভাবে ছবির মতো দেখেছে।
সারাটা পথই–তুষার যাই ভাবুক, মনে মনে নিজেকে আজ খুব শুন্য মনে করছিল। তার মন ভার হয়ে ছিল। এ অনেকটা সেই রকম, সকালে ঘুম থেকে চোখ মেলেই মেঘলা দেখা, যে-মেঘলা সর্বত্র যার শেষ নেই, মনকে যা অকারণে বিষণ্ণ অপ্রসন্ন করে তোলে।
শিশুতীর্থে পা দিয়ে অকস্মাৎ তুষার এই বিশ্রী সম্মোহন থেকে যেন মুক্তি পেয়ে প্রথমেই বিরক্ত ও অপ্রসন্ন বোধ করল। তার উচিত অনুচিত বোধ, তার ভালমন্দ জ্ঞান, এবং অভ্যস্ত জীবনের নীতি তাকে ধিক্কার দিল। ছি ছি, তুমি কী বলে ওই ভদ্রলোকের সঙ্গে একা ফাঁকায় বেড়াতে গেলে? তুমি কী করে ওর হাত ধরা হয়ে থাকলে কোন দুঃসাহসে ও তোমার কাছে ওই সব আবদার জানায়-আপনার কথা ভাবব। যদি ইচ্ছে হয় চলে আসব। আপনি তখন ঘুমোবেন। …
আদিত্য কাল কী করে এসব কথা বলতে পারল, তার সাহস জোগাল কেমন করে, তুষার ভাবছিল। ক্রমশ মাঠ ধরে গাছতলা দিয়ে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে আসছিল তুষার। জ্যোতিবাবুর দিকে তার চোখ পড়ল। জ্যোতিবাবু আকাশের দিকে হাত তুলে তাঁর ছেলেমেয়েদের কিছু বোঝাচ্ছেন।
আদিত্যের অত সাহসের জন্যে তুষার হঠাৎ নিজেকেই দায়ি করল। ভাবল, তার প্রশ্রয় না পেলে আদিত্য কখনওই অত কথা বলতে পারত না। তুষার লোকটাকে বেশি প্রশ্রয় দিয়ে ফেলেছে। আর প্রশ্রয় পেয়েই লোকটা মাথায় উঠেছে; কী বলা উচিত, কী বলা উচিত না সে-জ্ঞান লোপ হয়েছে ওর। আশ্চর্য, কোনও ভদ্রলোক কোনও মেয়েকে কী করে বলে, রাত্রে ঘুমের বেলায় সে তার বাড়ি আসবে।
তুষার এখন যত ভাবছিল, যত ঘুরে ঘুরে কালকের সেই বিদায় মনে করছিল ততই অসন্তুষ্ট হচ্ছিল। আদিত্যের ওপর তার রাগ হচ্ছিল। নিজের অক্ষমতার কোনও সঙ্গত কারণ খুঁজে না পেয়ে নিজের ওপরই ক্রুদ্ধ হচ্ছিল।
তুষারের ঘরে নিত্যকার মতন কোলাহল। ছেলেমেয়েরা খেলা করছে, ছড়া পড়ছে সমস্বরে, গান গাইছে, ডিগবাজি খাচ্ছে। তুষার ঘরে ঢুকল। সবাই দেখল, মনে হল না তাতে তাদের কোনও ব্যাঘাত ঘটেছে।
