কী হল, যাবেন না?
না।
না কি! কোথায় থাকবেন সারারাত। তুষার বিপদে পড়ল।
যে কোনও জায়গায়।
পাগলামি করবেন না। তুষার যেন ভর্ৎসনা করল মৃদু গলায়। সারারাত রাস্তায় রাস্তায় কেউ ঘোরে নাকি?
আমি ঘুরি। …আমি অনেক ঘুরেছি এ-ভাবে। আদিত্য উপেক্ষার গলায় বলল, একদিন না ঘুমোল মানুষ মরে না।
বাড়ির গেটের কাছে এসে পড়েছে তুষার। দাঁড়াল। আদিত্যকে চোখ ভরে দেখল। কী রকম মানুষ
যে আপনি। তুষার ভেবে পাচ্ছিল না কী বলবে। সামান্য চুপ করে থেকে বলল, আমায় কেন দুর্ভাবনায় ফেলছেন?
আদিত্যের মাথায় বোধহয় কোনও বুদ্ধি এসেছিল। বলল, কিছু না। আপনি যান। আমি স্টেশনে চললাম।
স্টেশন? তুষার আকাশ থেকে পড়ল।
স্টেশনের ওয়েটিং রুমে খাবারের দোকান আছে, লম্বা লম্বা বেঞ্চি আছে…
এই…। তুষার প্রায় আঁতকে উঠে বলল, স্টেশনের ওয়েটিং রুমে…, না, ছি, সে কি…।
আদিত্য তুষারের গেট খুলে দিয়ে যাবার জন্যে ঘুরে দাঁড়াল। তুষার বিমূঢ়। আপনি বরং এখানে খাওয়া-দাওয়া
স্টেশনে রাত কাটাতে আমার ভাল লাগে। আদিত্য পা বাড়াল।
প্ল্যাটফর্মে বসে থাকব, ঘুমন্ত স্টেশন, একটা দুটো গাড়ি চলে যাবে…
আদিত্য দু-চার পা এগিয়ে মুখ ফেরাল হঠাৎ, আপনার কথা ভাবব। যদি ইচ্ছে হয় চলে আসব। আপনি তখন ঘুমোবেন।
না, না–তুষার শিউরে উঠে বাধা দিল। হাত নাড়ল। ছি ছি। না, ওসব করবেন না।
করা কি আমার হাতে। মন যদি করায়–আদিত্য কী এক আনন্দ যেন মুঠোয় পেয়েছে। হাসতে হাসতে পা বাড়াল।
তুষার গলা উঁচুতে তুলে শেষ বারের মতন বলল, না, আপনি দয়া করে আসবেন না।
আদিত্য তাকাল না। মনেই হল না, তুষারের কথায় সে কর্ণপাত করেছে। তুষার স্তব্ধ কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল।
তুষারের কী দুশ্চিন্তা সেদিন। ভীষণ ভয়। যদি আদিত্য আসে। ওকে বিশ্বাস নেই, ওর মতিগতি তুষার বুঝতে পারে না। হয়তো আসবে সত্যিই, হয়তো চাঁদের আলোয় বাগানের পাশ দিয়ে তার ঘরের জানলার সামনে এসে ডাকবে–তুষার, তুষার।
তুষারের মনে হচ্ছিল আদিত্য যেন সব চেনে, তার ঘর–তার জানলা, তার বিছানার শিয়রের বাতায়ন–সবই যেন আদিত্যের পরিচিত। এমনকী তুষারের ভয়ও।
আদিত্য আসবে এই ভয়ে তুষার ঘুমোতে পারল না, শিশিরের ঘরের দিকে দরজাটা আস্তে করে ভেজিয়ে দিল পুরোপুরি, বাতি নিভিয়ে দিল, আর উৎকণ্ঠা সম্বল করে বসে থাকল বিছানায়।
বাগানে চাঁদের আলো ফুট ফুট করছে, বাতাস বয়ে যাচ্ছে, পাতার শব্দ উঠছিল মাঝে মাঝে, তুষার চমকে উঠছিল। সব নিস্তব্ধ, চরাচর নিদ্রিত, তুষার বিছানায় শুয়ে থাকল আড়ষ্ট হয়ে।
এক সময় বাগানে ছায়া দীর্ঘ হয়ে এল, বাতাস শিশিরার্জ হল, নিশীথের নিদ্রা আরও যেন গম্ভীর হয়ে সমস্ত অসাড় নিশ্চেতন করে ফেলল। তুষার জেগে থাকল।
আদিত্য এল না?
এল। তুষার তখন বুঝি ঘুমে অচেতন। আদিত্য জানলার কাছে এসে মৃদু সুরে ডাকল, তুষার তুষার।
তুষার চোখ মেলতে পারল না। ঘুম তার সর্ব ইন্দ্রিয় প্রাণহীন করে ফেলেছে।
তুষার। আমি এসেছি।
তুষার স্বপ্নের ঘোরে যেন অস্ফুট শব্দ করল।
তুষার এই যে আমি। তোমার জানলায়।
তুষার উঠল। আদিত্য জানলার কাছে। ঘুমে আলস্যে তন্দ্রাজড়িমায় তুষার যেন আদিত্যকে ভাল করে চিনতে পারল না। জ্যোতিবাবুর মুখের মতন মনে হল। তুষার চমকে উঠল। পরে চিনতে পারল আদিত্য।
আপনি?
আমি। বাইরে এসো তুষার।
না।
একটিবার। লক্ষ্মীটি এসো।
না।
এখানে কত আলো, তোমায় এই আলো ধুইয়ে দেবে। এখানের বাতাস শিশিরে ভিজেছে, তোমার কী ভাল যে লাগবে।
না আমি যাব না। তুমি যাও। তুষার জানালা বন্ধ করে দিল শব্দ করে।
ঘুম বেঙে তুষার নুটুর গাড়ির শব্দ পেল। মাথার দিকের জানলা সত্যিই বন্ধ। তুষার জানলা খুলে তাকাল। নুটু গাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখে নীচে নেমেছে।
আজ তুষার স্নিগ্ধ হাসতে পারল না। তার প্রতিদিনের হাসি দিয়ে অভ্যর্থনা করতে ভুলে গেল। রোদ উঠছে। বাগানে সকালের ফরসা। পাখিদের কাকলি। তুষার লক্ষ করে দেখল। আদিত্য কি এসেছিল? তুষার বুঝতে পারল না।
এই প্রথম তুষার বড় ক্লান্ত অনুভব করল নিজেকে। তার ইচ্ছে হল ছুটি নেয়। নুটুকে বলে, আজ আমি যাব না নুটু, তুমি যাও।
বলতে পারল না তুষার। তাকে যেতে হবে। শিশুতীর্থ তার পথ চেয়ে বসে আছে।
জানলার কাছ থেকে সরে আসার সময় তুষারের চোখে জল এল।
এই প্রথম, চোখের জল দিয়ে তুষারের ভোর শুরু হল।
.
০৮.
নুটুর গাড়ি নিত্যকার মতন তুষারকে শিশুতীর্থে এনে পৌঁছে দিল। তুষার নেমে দাঁড়াল; ছেলেমেয়েগুলো হুড়োহুড়ি করে নামল, ঠেলাঠেলি, কলরোল, দেখতে দেখতে কয়েকজন মিলে দৌড় দিল। তুষার দাঁড়িয়ে।
সোনার জল দিয়ে যেন রং করা এই রোদ, কী উজ্জ্বল শরতের নীল আকাশের তলায় শান্ত নদীর মতন পড়ে আছে, তুষার রোদ দেখল না। বাচ্চাগুলো ছুটতে ছুটতে ঘাস মাটি গাছতলা দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে, তুষার সেদিকেও তাকিয়ে নেই। একটা বেগুনি রঙের বড় প্রজাপতি তুষারের পায়ের তলায় ঘাসের ডগায় বসে পাখা গুটোচ্ছে, আবার মেলছে, তুষার তা লক্ষ করল না।
শিশুতীর্থ যেন ফাঁকা, নিস্তব্ধ। যেন তুষার হঠাৎ আজ সকালে কোনও অপরিচিত জায়গায় চলে এসেছে তার পরিচিত কেউ কোথাও নেই। অন্যমনস্ক, স্থির ভাবে দাঁড়িয়ে থাকল তুষার।
নুটু প্রত্যহের অভ্যেস মতন তুষারের বেতের টুকরি সিট থেকে নামিয়ে নিয়েছে। তুষারদিদিমণিকে আজ কেমন যেন লাগছে নুটুর। সারাটা পথ দিদিমণি আজ চুপচাপ এসেছে। বরাবর রাস্তার দিকে তাকিয়ে, কথা বলেনি একরকম, বাচ্চাদের সঙ্গেও না কথা না আর কিছু। নুটুর মনে হল, তুষারদিদিমণির শরীর খারাপ।
