আদিত্য কাঠি জ্বালাল। সিগারেট ধরিয়ে নিল। আলোর একটি পিপীলিকা যেন পাখা পেয়ে হঠাৎ উড়ে এসেছিল আবার হারিয়ে গেল।
আমার একটা কথা মনে পড়ছে।
তুষার ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল।
বিদেশে থাকার সময় আমার একটি মেয়ের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল, সুইডিস মেয়ে, গ্রামার স্কুলে চাকরি করত, একদিন আমায় একটা গল্প বলেছিল, তাদের দেশের রূপকথার গল্প। সুন্দর গল্প। চাঁদের বিয়ে, দুই রাজকন্যাই তাকে বিয়ে করতে চায়, একজন প্রচুর উপঢৌকন নিয়ে এলবাজনা বাজিয়ে দাস দাসী নিয়ে; চাঁদ কিছু বলল না। পরের দিন আর এক রাজকন্যা এল, একা–তার সঙ্গে কেউ নেই, না আলো বাজনানা দাস দাসী। চাঁদ বলল, তুমি একা? আমার জন্যে কিছু আনননি? রাজকন্যা জবাব দিল, এনেছি। দি সাইলেন্স… চাঁদ তৃপ্ত হয়ে হাসল। বলল, তুমিই জিতলে। আদিত্য গল্প শেষ করল। করে অভিভূত গলায় বলল, গল্পটা ভাল নয়?
তুষার মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। মাথা হেলিয়ে সায় দিল।
আদিত্য অনেকক্ষণ পরে বলল, মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, যারা অন্ধ, যারা বোবা–এই সংসারে তারাই সুখী।
কেন? তুষার অস্ফুট গলায় প্রশ্ন করল।
কিছু দেখতে হয় না, কোনও কথা বলা যায় না। …আমরা দেখি বলে পুড়ি, কথা বলতে পারি বলে না বলার দুঃখে বুক জ্বলে যায়।
আদিত্যের কথার মর্ম তুষার বুঝতে পারল না।
সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে খানিক বসে থাকল আদিত্য, মাথা ওঠাল, ছটফট করল, তারপর বলল, আমার যা বলতে ইচ্ছে করছে তা বলতে পারছি না।
তুষার তার অন্তরের ভয় এবার স্পষ্ট করে অনুভব করতে পারল। কিন্তু প্রকাশ করল না। উঠে দাঁড়াল হঠাৎ। বলল, চলুন, ফিরি এবার।
আদিত্য বোধহয় প্রত্যাশা করেনি, তুষার সমস্ত মোহ মায়া তুচ্ছ করে এমন করে উঠে পড়বে। অবাক হয়ে ঘাড় তুলে তাকিয়ে থাকল আদিত্য। তারপর ক্ষুণ্ণ হল। এভাবে উঠে পড়লেন যে!
বা, বাড়ি ফিরতে হবে না। রাত হয়ে যাচ্ছে। তুষার সহজ সরল গলা করে বলল, যেন যা করা উচিত তুষার তা করেছে। কথাটা বলে তুষার টিলার ঢালুর দিকে এগিয়ে গেল।
আদিত্য উঠল না। তুষারকে দেখছিল। তুষার দশ বিশ পা এগিয়ে গেলে আদিত্য উঠে পড়ল। আহত ক্ষুব্ধ মানুষ যে ভাবে দ্রুত পায়ে ছুটে আসে আদিত্য সেই ভাবে যেন হেঁটে এল। এভাবে আপনি পালিয়ে যাচ্ছেন কেন? ভয়?
ভয়! তুষার হাসিমুখে চোখ তুলল। ভয়ের কী আছে। তুষারের গলা এবং হাসি দেখলে মনে হবে যেন কীসের ভয় কেন ভয় সে কিছুই বুঝতে পারছে না।
আদিত্য পাশে পাশে হাঁটতে লাগল। তুষারকে লক্ষ করছিল।
আমি বাঘ সিংহনই। আদিত্য অশান্ত।
কে বলেছে।
আপনার ব্যবহার দেখে তাই মনে হয়।
নাকি?
আমাকে কি আপনি ছেলেমানুষ মনে করেন।
ছেলেমানুষ! তুষার টিলার ঢালু দিয়ে খানিকটা নেমে এসে সমতল পেয়ে হাঁটতে লাগল, আদিত্যের দিকে তাকাল, মুখভরা শান্ত হাসি, বলল, সত্যিই আপনি ছেলেমানুষ।
আদিত্য আচমকা তুষারের হাত ধরে ফেলল। তার ভাব ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল যেন পাগলামি করছে। আমার বয়েস আটাশ। আমায় বোকা ভাববেন না।
তুষার হাত ছাড়াবার জন্যে ব্যগ্রতা দেখাল না। বলল, এমন কি বয়েস আপনার, আমার বয়েস বাইশ। …মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে সব সময় বেশি বুদ্ধিমান হয়। তুষার জোর করল না, ছটফট করল না, কেমন অক্লেশে স্নিগ্ধ স্বরে কথা বলতে বলতে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল। জানেন না, মেয়েদের বয়স এক বছরে যা, ছেলেদের তাতেই দুবছর। …ওই দেখুন–তুষার হাত বাড়িয়ে দিল সামনের দিকে। শুনতে পাচ্ছেন?
গাড়ির শব্দ?
হ্যাঁ। সাড়ে আটটার মেল ট্রেন। কতটা রাত হয়ে গেছে দেখেছেন।
তাই তো।
শিশির একা বসে আছে। আপনারও না অতটা রাস্তা যাবার আছে, তাও আবার সাইকেল আনেননি। কী করে যাবেন?
যাব না আজ।
যাবেন না?
আদিত্য মাথা নাড়ল। ট্রেনের শব্দ ফাঁকায় প্রতিধ্বনিত।
কী সর্বনাশ! যাবেন না তো কী করবেন? মাঠে মাঠে ঘুরবেন? তুষার হালকা কৌতুকের গলায় বলল।
আদিত্য জবাব দিল না। খানিকটা পথ চুপচাপ। তারপর আদিত্য বলল, আপনি এমন সুন্দর রাতটা নষ্ট করে দিলেন।
আমি?
কী ভাল লেগেছিল আজ, এখন মনে হচ্ছে আপনাকে জোর করে টেনে এনেছি। কেন তখন বললেন না, আপনার আসতে ইচ্ছে নেই। আদিত্যর গলায় বিষাদ, মনস্তাপ।
তুষার শাড়ির আঁচল টেনে নিতে গিয়ে আদিত্যর হাতে স্পর্শ দিল। মধুর প্রশান্ত হাসি তার মুখে। বলল, ইচ্ছে না থাকলে কেউ কি আসে। …কিন্তু চাঁদের আলোই তো সব নয়; আমার ঘর বাড়ি ভাই আছে–আপনারও…
আমার কিছুই নেই। আদিত্য তুষারের কথা টেনে নিয়ে বলল। সে যেন ভীষণ অধৈর্য, আহত, বিক্ষুব্ধ।
তুষার চোখের দৃষ্টি বাঁকা করে দেখে নিল আদিত্যকে। কিছু নেই বলবেন না।
কেন বলব না?
বলতে নেই। …শুনতেও ভাল লাগে না।
রাস্তায় এসে পড়েছিল তুষার। বাড়ি দেখা যাচ্ছে। তুষারের কোনও উদ্বেগ নেই; এই উদ্বেগ টিলার আসন ছেড়ে উঠে পড়ার পর থেকেই ক্রমে কেমন মিলিয়ে গেছে। এতটুকু আড়ষ্টও আর বোধ হচ্ছে না। আদিত্যকে তার সত্যিই ছেলেমানুষ মনে হচ্ছে। বোধ বুদ্ধি-সাংসারিক বোধ বুদ্ধি ওর নেই। তুষার মায়া এবং মমতা বোধ করছিল আদিত্যের জন্যে।
আমাকে আরও পৌঁছে দিয়ে কী লাভ? এতটুকু যেতে আমার অসুবিধে হবে না। আপনি বরং ফিরুন, অনেকটা রাত হয়েছে।
আদিত্য কথার জবাব দিল না। হাঁটতে লাগল।
