তুষার কিছু বলল না। কথাটা কিন্তু খুব মিথ্যে নয়। সব বাঙালি ছেলের মতন আদিত্যও কয়েকটা জানে। হয়তো সুর কোথাও ভুল হয়ে যায়, শব্দ শুদ্ধ হয় না, কিন্তু এখানে সেটা বড় কথা নয়। তুষারও কিছু গান জানে। হয়তো তার সুরও কোনও জায়গায় ভুল, শব্দ অশুদ্ধ। আদিত্যর গলা সত্যিই গম্ভীর ভারী। মন্দ শোনায় না, তুষার যতই ঠাট্টা করুক শিশিরের কাছে।
সিগারেট ধরিয়ে আদিত্য বলল, কী করছিলেন?
ভাইয়ের সঙ্গে গল্প করছিলাম।
ও! আদিত্য ধোঁয়া ছেড়ে কী যেন ভাবল সামান্য। বলল, আমি আপনার ভাইয়ের কথা শুনেছি।
তুষার তাকাল। আদিত্য অন্য দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। বাগানের দিকে। চাঁদের আলো বাগানে।
তা হলে থাক। আমি চলি। আদিত্য চাপা গলায় বলল।
তুষার বুঝতে পারল। যে দুঃখ নিশ্বাসের মতন স্বাভাবিক ভাবে বয় বলে তুষার সচেতন থাকে না, সেই দুঃখকে আদিত্য চেতনায় আনল। মানুষ যদি প্রতিটি নিশ্বাস-প্রশ্বাস সম্পর্কে হঠাৎ সচেতন হতে চায়, দু মুহূর্ত পরেই কেমন অস্বস্তি বোধ করবে। তুষার সেই রকম অস্বস্তি বোধ করছিল। শিশিরের কথা সে কাউকে বলতে চায় না। পছন্দ করে না। শিশিরও নয়। ওরা ভাইবোনে তাদের দুঃখ হাটে টেনে এনে না অনুকম্পা না করুণা চায়।
নিজেকে সামলে নিতে নিতে তুষার বলল, যাবেন কেন, বসুন। কথাটা বলে তুষার সিঁড়ির দিকে তাকাল। খেয়াল হল, আদিত্য সাইকেল আনেনি, মনে পড়ল, ও হেঁটে আসার কথা বলছিল। আলোচনা অন্য দিকে নিয়ে যাবার মতন সুযোগ পেল তুষার। সাইকেল কোথায়?
সাইকেল নিইনি, হেঁটে বেরিয়েছি।
হেঁটে–তুষার অস্ফুট বিস্ময় জানাল।
ভাল লাগছিল হাঁটতে। আজ আমার খুব ভাল লাগছে। এক একটা দিন মাঝে মাঝে মানুষের অসম্ভব ভাল লেগে যায়। আপনার লাগে না?
তুষার সামান্য অন্যমনস্ক চোখে আদিত্যর দিকে তাকাল। মাথা নাড়ল, অথচ এই জবাব–এই হ্যাঁ জানানো সে বাস্তবিক ভেবে বলল না।
রাস্তায় আসতে আসতে আমি ভাবছিলাম আজ এখানে এসে আপনাকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে যাব। আদিত্য অকৃত্রিম আবেগে বলল।
বেড়াতে! তুষার যেন খুব অবাক।
চলুন। আমার যে কী ভাল লাগছে আজ! আদিত্য ছেলেমানুষের মতন তার বিহ্বলতা জানাল। তুষার অনুভব করতে পারছিল, ভদ্রলোক আজ খুশিতে টলমল করছে। ওর খুশির ভাগ গলার স্বরে উপচে উঠছিল।
এখন কি আমার বেড়ানোর সময়! তুষার নরম করে হেসে বলতে গেল।
এখন নয়তো কখন! সবে সন্ধে। মস্ত বড় একটা চাঁদ রয়েছে আকাশে, পুরো শরতের বাতাস। চলুন।
তুষার কী করে বলবে, শিশির একা বসে রয়েছে; কী করে বোঝাবে, এ-ভাবে বেড়াতে বেরোলে শিশির কী মনে করবে! তা ছাড়া তুষার কখনও কি একজন পরিচিত পুরুষের সঙ্গে এই শহরের কোথাও বেড়াতে বেরিয়েছে। আদিত্যকে সরাসরি না বলতে তার বাধছিল। অস্বস্তির মধ্যে পড়েছে তুষার। আদিত্যও তেমন, তার জোর জবরদস্তি অনুরোধ বিন্দুমাত্র শিথিল হচ্ছে না।
বিখ্যাত লেখকের এক বিখ্যাত কথা আছে জানেন না–আদিত্য বলল, দিনের মধ্যেই আমরা বাঁচি, কিন্তু কোনও কোনও দিনই আমাদের সত্যিকারের বাঁচায়।
তুষারকে বাধ্য হয়ে যেতে হল। আদিত্য কিছুতেই ছাড়বে না। আর আদিত্য যখন ঝোঁক ধরে সে-ঝোঁক ঠেকাবার সাধ্য মানুষের থাকে না। তুষার চেষ্টা করেও ওই অবুঝ জেদি মানুষটাকে ঠেকাতে পারল না।
রাস্তায় পা দিয়ে তুষার দক্ষিণ মুখে এগুতে লাগল। শহরের দিকে সে যাবে না। খানিকটা আড়ষ্ট, মনে কেমন অস্বস্তি, ভাল লাগছে না, অথচ খারাপ লাগার যথার্থ কোনও কারণও খুঁজে পাচ্ছে না তুষার। …পথে হাঁটতে হাঁটতে তুষার দক্ষিণের দিকে অন্যমনস্ক ভাবেই এগিয়ে গেল।
আদিত্য প্রায় সমানে কথা বলে যাচ্ছে। নানান কথা। তার উচ্ছ্বাস এবং আনন্দের প্রাবল্য অনুভব করা যাচ্ছিল সর্বসময়, সে সেই ভাবে হাঁটছে, কথা বলছে, হাসছে।
এক সময় তুষার অবাক হয়ে লক্ষ করল, পায়ে ধুলো মেখে মেখে তারা মেঠো পথ, ঘাস এবং তারপর রুক্ষ কাঁকর পেরিয়ে সেই টিলাটার কাছে চলে এসেছে। টিলার ওপাশে শহরটাকে দূরে দেখা যায়–অনেকটা ঢালুতে দাঁড়িয়ে আছে, ছায়ার মতন, আলোর বিন্দু কিছু। এ পাশে টিলার এদিকটা নির্জন নির্বাস প্রান্তর, মাঠ আর জংলা ভূমি, দূরে সেই ছোট নদীর সাঁকো।
টিলার ওপরে উঠে আসতেই তুষার অনুমানে ট্রেন লাইন দেখতে পেল। কিছুটা তফাত দিয়ে চলে গেছে, গাছের আড়াল দিয়ে দেখা যাচ্ছে না।
আজ পরিষ্কার জ্যোৎস্না। গত কাল পূর্ণিমা গেছে। মাথার ওপর নীলচে আলো লেপা আকাশ, চাঁদ প্রায় রুপোর থালার মতন গোল।
আদিত্য বসল। তুষারও এক টুকরো পাথরের ওপর আলগা হয়ে বসল। জায়গাটা ঝিম ঝিম করছে। কোনও সাড়াশব্দ নেই। বাতাসের চাঞ্চল্য এবং বেগ অনুভব করা যাচ্ছিল। এই ফাঁকায় তুষারের হঠাৎ কেমন মনে হল, সে অনর্থক যেন কীসের ভয় পাচ্ছে।
আপাতত আদিত্যও আচমকা নীরব হয়ে গেছে। জ্যোৎস্নধৌত ভূভাগের দিকে তাকিয়ে সে প্রায় সম্মোহিতের মতন বসে ছিল। তুষার নির্বাক। প্রত্যহের জীবন থেকে পরিবেশ থেকে কে যেন আলাদা করে এই সময়টুকু ওদের কাছে এনে দিয়েছে। তুষার ভাবছিল, আদিত্য ঠিক বলেছে, রোজই আমরা বেঁচে থাকি কিন্তু প্রত্যহের সেই বাঁচা আর একটা টুকরো সময়ের মধ্যে নিবিড় হয়ে, মগ্ন হয়ে বেঁচে থাকা আলাদা। তুষার অনুভব করতে পারছিল, তার মন এখানে এই স্তব্ধতা জ্যোৎস্না বাতাস এবং নির্জনতার মধ্যে এক ধরনের চাপা বিষাদ ও প্রশান্তি অনুভব করতে পারছে।
