সকলে চুপ। আবহাওয়া কেমন থমথমে। ..সাহেবদাদুই কথা বললেন মৃদু গলায়, আপনি কি ভাবেন রাগ করে মেরে ধরে ওকে শোধরানো যাবে?
আদিত্য অদ্ভুত কাণ্ড করে বসল। হঠাৎ সে জানলা থেকে সরে এসে সাহেবদাদুর পায়ের তলায় বসে পড়ল। বলল, শিশুতীর্থের যে সব পদ্ধতি তাতেও ওই ছেলে বিন্দুমাত্র শোধরায়নি। শুধরেছে কি? এমনকী ছেলেটা দুষ্টু এই বাজে কথা বলে আপনার এখানে ওকে আরও বদমাইশি করার প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। বলেই আদিত্য হাত বাড়িয়ে সাহেবদাদুর হাঁটু স্পর্শ করল। একটা কথা আমায় আপনি বলুন, আপনি নিশ্চয় সত্যি কথাই বলবেন। ছেলেবেলায় আপনি কি বাবা মা কারও শাসন পাননি, কেউ কি আপনার গায়ে হাত তোলেনি কখনও?
সাহেবদাদু ভীষণ অবাক হয়েছিলেন। কেমন হতভম্ব হয়ে সোজা হয়ে বসতে গেলেন। খানিক পরে বললেন, তা দু-চার দিন কি আর মার খাইনি। খেয়েছি।
বোধহয় সেই মার খেয়ে আপনি অমানুষ হয়ে যাননি। যদি দু-চার ঘা মার দিলে মনে হয় শিশুহত্যা করা হচ্ছে তবে আমার কিছু বলার নেই। কিন্তু এসব জিনিসকে কায়দা করে শিক্ষা পদ্ধতির উন্নতি বলা বাজে কথা। শাসনের হাত তো একটা নয়, অনেক। যে ছেলেমেয়েকে আপনারা মারেন না–সে যে বাড়ি গিয়ে বা খেলা করতে গিয়ে অন্য কোথাও মারধোর খায় না–কে বলল। …তা ছাড়া
কী?
জীবনভোর অনেক বড় মার খেতে হবে এদের। এই হাতের দু-চার ঘা কিছু নয়। নাথিং।
আবার নীরবতা। কেউ কোনও কথা খুঁজে পাচ্ছিল না। সাহেবদাদু অবশেষে বললেন, আপনি যা বলছেন তার হয়তো অনেক কিছুই সত্য। কিন্তু আমাদের এখানে শাস্তি দেওয়া বারণ।
আমি শাস্তি দিইনি।
শাস্তি দেননি? আশাদি অস্ফুট গলায় বলল।
না। আমি আমার শান্তি পাবার চেষ্টা করছিলাম। আই হেট। একটা শয়তান বদমাশ স্বাস্থ্যঅলা ছেলে নিরীহ গোবেচারি একটা ছেলেকে ঠেলে ফেলে দেবে গাছের ডাল থেকে, আই হেট ইট। কোনও বড় মানুষ এরকম কোনও কাজ করলে আমি তাকে মারতাম। আই অ্যাম নট গোয়িং টু টলারেট এনি ব্লুটালিটি।
সাহেবদাদু নির্বাক। তুষাররাও। তুষারের হঠাৎ চোখ পড়ে গেল, দেখল আদিত্যর চোখে যেন জলের ঝাপসা আড়াল।
আদিত্য উঠে পড়ল। আপনাদের অপছন্দ হয়ে থাকলে আমার করার কিছু নেই। আমি চলে যেতে পারি। কাল কি পরশু চলে যাব।
আদিত্য চলে গেল ঘর ছেড়ে।
তুষাররা নীরবে বসে থাকল। ঘরের আবহাওয়া কেমন ভারী এবং বিষাদে ভরে উঠেছিল। সাহেবদাদু অনেকক্ষণ পরে বললেন, ছেলেটি অদ্ভুত।
.
আর একদিনের ঘটনা তুষার ভুলবে না। এই ঘটনা ঘটেছিল বাড়িতে।
সেদিন সন্ধের মুখে আদিত্য হাঁটতে হাঁটতে এসে হাজির। তুষার শিশিরের সঙ্গে বসে বসে তাস খেলছিল। সময় কাটানো আর কি। তাস খেলতে খেলতে গল্প হচ্ছিল দুই ভাই বোনে।
আদিত্য এসে ডাকল। ডাকার ভঙ্গি বড় অদ্ভুত। মানুষ মানুষকে নাম ধরে ডাকে, কিংবা দরজায় ধাক্কা দেয়, কড়া নাড়ে–আদিত্য ও-সবের ধার দিয়ে গেল না।
বারান্দায় উঠতে উঠতে তার সেই মোটা গলায় গান ধরল: পথভোলা এক পথিক এসেছি।
হাতের তাস নিয়ে তুষার প্রায় চমকে উঠল। বুঝতে পারেনি প্রথমে, চেনা গলার স্বর কানে একটু থিতিয়ে আসতেই জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। শিশিরও অবাক। হঠাৎ কেমন আড়ষ্ট সঙ্কুচিত হয়ে হাতের তাস ফেলে দিয়ে তুষার ভাইয়ের মুখের দিকে তাকাল।
কী রে দিদি?
সেই ভদ্রলোক। আদিত্যবাবু। কী যে বিরক্ত করে…। বলতে বলতে তুষার উঠে দাঁড়াল, ভাইয়ের মুখের দিকে তাকাতে পারছিল না, বলল, দাঁড়া, বিদায় করে দিয়ে আসি। নয়তো ও যা লোক চেঁচিয়েই যাবে।
শিশির ঠোঁট উঁচু করে ঠাট্টার হাসি হাসল। বেশ তো গাইছে, গাইতে দে। তুই বোস।
বেশ গাইছে! তুষার চোখ বড় করল।
পুরুষমানুষের মতন! কেমন গম্ভীর গলা।
বাজে বকিস নাতুষার ছটফট করে উঠল, গানের তুই কী বুঝিস?
বুঝি। সব তুই একা বুঝবি বুঝি। …জানিস, আমি কবিতা লিখি।
রাখ তোর বোঝা। লোকটাকে আমি থামাব।
অযথা গানটা বন্ধ করে দিবি? গাক না ও, তুই বোস।
তুষার বসবে না। শিশির বুঝবে কোথা থেকে এভাবে আদিত্য এসে ওকে কি বিশ্রী লজ্জার এবং অস্বস্তির মধ্যে ফেলেছে।
কিন্তু শিশির বোধহয় বুঝেছিল। তুষার চলে যাচ্ছে দেখে হেসে বলল, তাস গুটিয়ে রাখছি রে, দিদি।
তুষার বাইরে এল। আদিত্য বেপরোয়া গলায় গান গাইছে। যেন ও জানে এই পরিহাস আনন্দেরই, এতে কোনও গ্লানি নেই লজ্জা নেই। বারান্দায় দাঁড়িয়ে দরজার দিকে তাকিয়েই আদিত্য গান গাইছিল। তুষারকে দেখে থামল।
তুষার এক পলক দেখে নিল আদিত্যকে। হঠাৎ এদিকে?
এলাম। আজ খুব ভাল লাগছিল।
দেখছি তাই, নয়তো আর গান হবে কেন।
আমি রাস্তায় আসতে আসতে ভাবলাম কোন গানটা উপযুক্ত হবে, মানে স্যুটেবল। এইটেই মনে এল।
মনের খুব বাহাদুরি রয়েছে। তুষার গম্ভীর হয়ে বলতে চাইল।
গানটা কিন্তু খুব স্যুটেবল হয়েছে, বলুন ঠিক কি না। আদিত্য হাসল জোরে জোরে, রবীন্দ্রনাথ এই একটা কাজ করে গেছেন, অনেক সময় মানুষ যা বলতে চায় একটু হাতড়ালেই দেখতে পাবে বুড়ো একটা গান বেঁধে গেছেন।
তুষার কৌতুক বোধ করল। উনি কি জানতেন আপনার মতন লোক তাঁর গান গেয়ে গলা সাধবে।
মানে। হোয়াট ডু ইউ মিন? আমি বাজে গাই?
কে বলছে! চমৎকার গান।
আদিত্য আবার হাসল। সিগারেট বের করতে করতে বলল, আমি গোটা পঁচিশেক গান সত্যি সত্যি জানি। এ ভেরি পুয়োর স্টক ইনডিড। কিন্তু বেশ লাগে।
