তুষার সচেতন হল। আদিত্য সিঁড়ি দিয়ে দুধাপ নেমেছে। সাইকেলটা উঠিয়ে নেবে। তুষার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
আপনার আলো আছে তো? তুষার শুধোল।
না। আদিত্য তাচ্ছিল্যের গলায় বলল।
সে কী! এতটা রাস্তা অন্ধকারে যাবেন কী করে? তুষার উদ্বিগ্ন। দাঁড়ান, আমাদের টর্চটা এনে দি।
তুষার টর্চ আনতে ঘরে গেল তাড়াতাড়ি।
টর্চ খুঁজে ফিরে আসার সময়ই তুষার আদিত্যের গলা পেল। বেল বাজিয়ে গেট খুলে রাস্তায় সাইকেলে উঠতে উঠতে আদিত্য তার মোটা গলায় কী বলল। তুষার বারান্দায়। প্রায় পলকেই অন্ধকারে আদিত্য উধাও। খানিক দূর থেকে তার ভারী গলার ক্ষিপ্ত গান শোনা গেল।
তুষার স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল।
সেদিন আরও ঘণ্টাখানেক পরে পাতলা একটু চাঁদ উঠেছিল।
.
০৭.
আদিত্যের চরিত্র তুষার ক্রমে ক্রমে বুঝে ফেলেছিল। যাদের একগুঁয়েমি, জেদ, নির্লজ্জতা দেখলে ভাবনা হবার কথা, আদিত্য তেমন নয়। তুষার যত তার সংস্পর্শে আসতে লাগল, ততই বুঝতে পারছিল আদিত্যের চরিত্রে দুটি জিনিস প্রবল, উচ্ছ্বাস আর উম্মা। নিজেকে সংযত শালীন করতে আদিত্য শেখেনি; আদিত্যের উচ্ছ্বাস বালকের মতন, সহজে সে উত্তেজিত হয়, অকারণে ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে। বুদ্ধি আছে আদিত্যের, কিন্তু সেই বুদ্ধি নিজের জন্যে খরচা করা তার স্বভাব নয়। ভীষণ আবেগ তার, আবেগই তাকে যেন চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
শিশুতীর্থের কয়েকটা ঘটনা পর পর এমন ঘটতে লাগল যার ফলে আদিত্যের চরিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। বাড়িতেও মাঝে মাঝে হানা দিচ্ছিল আদিত্য। এর মধ্যে শিশুতীর্থের গুটি দুয়েক এবং বাড়ির একটা ঘটনা তুষার কিছুতেই ভুলতে পারবে না।
শিশুতীর্থে একদিন ছুটির বেলায় এক কাণ্ড হয়ে গেল। বাবলু আর কমল কাঠচাঁপার গাছ বেয়ে উঠে নীচের ডালে বসে বসে পা দোলাচ্ছিল। কমল একটু দুষ্টু গোছের ছেলে, নানান ফন্দি তার মাথায়। বাবলুর সঙ্গে খুনসুটি করে ঝগড়া বাঁধিয়ে তাকে ঠেলে ফেলে দিল ডাল থেকে। বাবলু পড়ে গেল নীচেমুখ থুবড়ে, কমল নির্বিকার বসে থাকল। …তখন ছুটির বেলা, ছেলেমেয়েরা চারপাশে ছুটোছুটি করছে, তুষাররা যে যার নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে পরস্পরের সঙ্গে কথাবার্তা বলছে। হঠাৎ দেখা গেল কোনও আড়াল থেকে আদিত্য বেরিয়ে এসে দ্রুত পায়ে বাবলুর কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাবলু উঠে বসেছে ততক্ষণে কিন্তু কাঁদছে। তুষার আর আশাদি এগিয়ে যাচ্ছিল, জ্যোতিবাবুও আসছিলেন তার আগেই আদিত্য পকেট থেকে রুমাল বের করে বাবলুর ডান হাতের কবজির ওপরটা জোর করে বেঁধে ফেলেছে।
জ্যোতিবাবু পাশে, তুষাররা কয়েক পা দূরে। আদিত্য জ্যোতিবাবুকে বলল, একে আস্তে করে তুলে নিয়ে যান, হাতটা সামলে ধরবেন। হাত ভেঙেছে।
হাত ভেঙেছে! জ্যোতিবাবু তাড়াতাড়ি হাঁটু গেড়ে বসে বাবলুকে ধরলেন।
আদিত্য চোখ তুলে গাছের ডালের দিকে তাকাল। কমল বসে আছে। ছেলেটা বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। কী যেন হল আদিত্যের কাঠচাঁপার একটা পলকা ডাল পট করে ভেঙে ফেলল, তারপর প্রায় এক হেঁচকা টানে কমলকে নীচের ডাল থেকে মাটিতে টেনে নামিয়ে পাগলের মতন কয়েক ঘা পিটিয়ে দিল। আরও মারত, তুষাররা হতচকিত হয়ে গিয়েছিল, জ্যোতিবাবুই চিৎকার করে কী যেন বললেন। ততক্ষণে আশাদির সংবিত ফিরেছে। তুষারও যেন বোধ ফিরে পেয়েছে। ওরা বাধা দিল ছুটে এসে। আদিত্যের হাতের পলকা ডাল ভেঙে গিয়েছিল। তার চোখ নিষ্ঠুর পশুর মতন, মুখ কেমন রাগে নীলচে হয়ে গেছে, যেন শরীরের সমস্ত রক্ত মুখে এসে জমে গেছে।
তখনকার মতন সব শান্ত হয়ে গেলেও ব্যাপারটা পরের দিন অন্য দিকে গড়াল। বিকেলে ছুটির পর সাহেবদাদুর কাছে তুষারের ডাক পড়ল। সাহেবদাদুর ঘরে তখন আশাদি, আদিত্য জানলার দিকে বিরক্তিকর ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে, জ্যোতিবাবু বসে ছিলেন একপাশে, হাতে একটা চিঠি।
তুষার ঘরে ঢুকে দাঁড়াল। সাহেবদাদুর শান্তভাবে তাঁর ইজিচেয়ারে গা এলিয়ে বসে।
গতকালের কথাটা উঠল। কমলের বাবা চিঠি দিয়েছে সাহেবদাদুকে। জ্যোতিবাবুর হাতে সেই চিঠি।
সাহেবদাদু বললেন, কাজটা কি অন্যায় হয়নি?
না। আদিত্য মাথা নাড়ল।
আশাদি জ্যোতিবাবু এবং তুষার তিনজনেই আদিত্যের দিকে তাকাল।
সাহেবদাদু বললেন শান্ত গলায়, এখানে কারও গায়ে হাত তোলা হয় না। মারধোর খেয়ে যদি ছোট ছেলেরা ভালমন্দ শিখতে পারত তবে আমরা এখানে হাজত তৈরি করতাম, মাস্টারের বদলে কনস্টেবল রাখতাম।
আদিত্য শুনল কথাগুলো। সকলকে এক পলক দেখে নিল তাকিয়ে। বলল, উত্তর চান, না কৈফিয়ত শুনতে চান? আদিত্য ইংরেজিতেই বলেছিল কথাটা।
না, উত্তর। সাহেবদাদু সৌজন্য এবং ভদ্রতা রেখে বললেন, বাংলাতেই।
আদিত্য সাহেবদাদুর দিকে চেয়ে থাকল সামান্য, তারপর জবাব দিল। কিছু কিছু ছেলেমেয়ে আছে তারা অন্যদের নিরীহদের ওপর অত্যাচার করে আনন্দ পায়। যে ছেলেটা কাল গাছ থেকে আর একটাকে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল সে ওই রকম। আমি নিজে দেখেছি, সে ধাক্কা মেরে বাচ্চাটাকে ফেলে দিচ্ছে।
কমল একটু দুষ্টু স্বভাবের। আশাদি বললেন।
দুষ্টু নয়, বদমাশ স্বভাবের। আদিত্য কঠিন গলায় বলল। আমি লক্ষ করে দেখেছি ও রোজ একে মারে, ওর চোখ খামচায়, অন্যের বইয়ের পাতা ছিঁড়ে দেয়–এমনকী আরও দু একটা কাজ যা করে তা শুনলে আপনাদের গা কাঁটা দেবে।
