ভালই তো।
কে বললে ভাল? অন্ধকারেও আদিত্যকে অসহিষ্ণু উগ্র দেখাল। এরা নিজেদের ঠকায়। বঞ্চনা করে।
তা কেন। আপনি আপনার দিক থেকে ভাবছেন বলেই ও-রকম মনে হচ্ছে। তুষার আস্তে আস্তে নরম গলায় বলল, ভাল না লাগলে, সুখ-শান্তি না পেলে মানুষ কেন নিজেকে সেখানে জড়িয়ে রাখবে।
আদিত্য সিগারেটের মুখের ফুলকি জোর করল, ধোঁয়া ছাড়ল, বলল, মানুষের স্বভাব নিজেকে ঠকানো৷
কেন? লাভ কী ঠকিয়ে?
বড় রকম লোকসানের দুঃখ থেকে সান্ত্বনা পাওয়া। আদিত্য যেন অন্তর থেকে নিজের বিশ্বাসের কথা বলছিল। আপনি বাচ্চাদের মন হাতড়াতে মশগুল, যাদের বাচ্চা সেই মা-বাপের–মানে মানুষের মন নিয়ে ভেবেছেন, কখনও। জানা উচিত, এলিমেন্টারি স্কুলের আগে এলিমেন্টাল ম্যানের কথা জানা দরকার।
পরে জানব। তুষার অন্যমনস্ক গলায় বলল।
কেন, পরে কেন? এখন জানতে দোষ কী? আদিত্য যেন তুষারকে তার তর্কের বা যুক্তির নাগালে পেয়ে গেছে এমন নিঃসন্দেহ গলায় বলল, খুব সোজা একটা কথা ভেবে দেখুন না, যারা কোনও না কোনও কারণে দুঃখী, অসুখী, অতৃপ্ত, তারাই আশ্রমে ঢোকে, মন্ত্র নেয়, বৈরাগ্য ধরে।
তুষার কথা বলল না। তার হঠাৎ প্রতিভাদির কথা মনে হল। প্রতিভাদি বিয়ের বছরখানেকের মধ্যে বিধবা হয়েছিল। পরে কোথায় যেন দীক্ষা নিয়ে সন্ন্যাসিনী হয়ে যায়। তুষার ছেলেবেলায় প্রতিভাদিকে দেখেছিল, তার কথা শুনেছিল। আজ আর তার মুখ মনে পড়ে না।
আমি যা বলছি এর মধ্যে কোনও ভেজাল নেই। আদিত্য বলল, বিছানা যাদের জোটে না, তারা মাদুরের ওপর শুয়ে ভাবে সাত্ত্বিক ধর্ম পালন করলাম।
ভাল লাগছিল না তুষারের। আদিত্যর কথায় সে চঞ্চলতা বা দুর্বলতা অনুভব করছিল এমন নয়, কিন্তু এই আলোচনা তার খুব পছন্দ হচ্ছিল না। আদিত্য কেন যে ভাবছে, তুষার সুখী নয়–তাও তুষার বুঝতে পারছিল না। আর সে সুখী কিনা সেটা তার নিজের ব্যাপার, অন্য লোক এসে সেটা বুঝিয়ে দেবে কেন! না, আদিত্যর এই মাথা গলানো কি জবরদস্তির জন্যে সে ঠিক রাগ করতেও পারে না। রাগের মতন কথা তো হচ্ছে না।
যার যা ভাল লাগে তাই করাই ভাল। তুষার ছোট করে তার সাধারণ মতামত বলল। যেন এসব কথা এখানেই শেষ করে দিতে চাইল।
আদিত্য থামল না। তাকে কথায় পেয়েছে, সে ভেতরে ভেতরে উত্তেজিত। বলল, যার যা ভাল লাগে সে যদি তাই করতে পারবে তবে জগৎটা স্বর্গ হয়ে যেত। আমার রাস্তা পুব দিকে, সংসার আমাকে পশ্চিমের পথে ঠেলে দিল। এই সংসারের এটাই মজা।
আপনার পক্ষে অবশ্য তাই। তুষার আলগা ভাবে বলল। বলার সময় তার ওই কথাটা মনে হচ্ছিল, এর পথ ছিল অন্য কোথাও, জোর করে শিশুশিক্ষার রাজ্যে ঢুকে পড়েছে।
আমার বেলায় কেন, সকলের বেলাতেই। আদিত্য বলল, আমি প্রকাশ করি–ঠকতে চাই না, সাত্বনাও পেতে চাই না। তবে সব লোক আমার মতন নয়। আমার বাবার মতন লোকও আছে।
বাবার কথায় তুষার তাকাল আদিত্যের দিকে। আদিত্যের রং ঠিক ময়লা নয়, আধ-ফরসা। বেশ লম্বা শক্ত চেহারা। মুখ পুরু। চোখ নাক শক্ত। মাথার চুল কোঁকড়ানো। সুপুরুষ চেহারা হলেও আদিত্যর চোখের দৃষ্টিতে গালের ভাঁজে কেমন একটা চাঞ্চল্য এবং অস্থিরতার ভাব আছে যাতে ওকে এখনও নাবালক মনে হয়। তুষার মৃদু আলো এবং অধিক অন্ধকারে আদিত্যের মুখের দিকে তাকিয়ে ওর অসহিষ্ণুতা অনুভব করতে পারল। আপনার বাবা
জোচ্চোর ছিল। আদিত্য অক্লেশে বলল। শুধু বলল না, মনে হল যেন রাগে ক্ষোভে ক্ষেপে গিয়ে চিৎকার করে উঠল।
চমকে উঠে তুষার অপলক চেয়ে থাকল।
আমার বাবা বড় রকমের জালিয়াত ছিল। ব্যাঙ্কে চাকরি করত। নানা জোচ্চুরি জালিয়াতি করে জেলে গেল হাজত খাটতে। মা আমায় নিয়ে মামার বাড়িতে এসে উঠল। একটা লোকবাবার কোনও বন্ধু–এ লোফার–আমাদের টাকাপত্র দিতে আসত মাঝে মাঝে, বলত বাবা গচ্ছিত রেখে গেছে। একদিন সেই লোফারকে মামা গালাগাল দিল, মাকে ধমকাল। কিছুদিন পরে মা আফিং খেয়ে মারা গেল। আমি তখন তেরো চৌদ্দ বছরের ছেলে। আন্দাজ করতে পেরেছিলাম কিছুটা। মা অযথা অকারণে আত্মহত্যা করেছিল। সত্যি সত্যিই বাবা চোরাই টাকা কিছু তার বন্ধুর কাছে গচ্ছিত রেখেছিল, লোকটা আমাদের সেই টাকা দিতে আসত, কিন্তু চেহারাটা ছিল লোফারদের মতন। মামার হাতে টাকা দিলে গণ্ডগোলটা হত না। আদিত্য যেন এক নিশ্বাসে এতগুলো কথা বলে হাঁফ ছাড়ল। কয়েক মুহূর্ত পরে আবার বলল, জেল থেকে ফিরে এসে আমার বাবা মার দুঃখে হাউ-মাউ করে কাঁদল। তারপর দেড় বিঘে বেনামি কলকাতার জমি বেচে টাকাটা আশ্রমে দিয়ে সাধু হয়ে গেল। সাধুরাও মরে, আমার বাবা বছরখানেকের মধ্যে পরপারে চলে গেল। আমি যেমন ভিখিরি তেমন ভিখিরি থেকে গেলাম। আমার বাবা স্বভাবে ছিল জোচ্চোর, হঠাৎ যে কেন সাধু হতে গেল বুঝলাম না। আমার মা ছিল অভিমানী অহংকারী, মা অভিমান করে মরল।
তুষার আড়ষ্ট। নিশ্বাসের শব্দ করতেও তার কুণ্ঠা হচ্ছিল। আদিত্যের বাবার চেহারা অন্ধকারে পশুর মতো ছায়া নিয়ে কল্পনায় দেখা দিল, মা-র মূর্তি পাথরের মতন শক্ত হয়ে বাবার পাশে দুলছিল। তুষার ঠোঁট খুলে মুখে নিশ্বাস নিচ্ছিল, বুক ধক ধক করছিল।
নীরব। সমস্ত নীরব। ঘরে শব্দ নেই, বাইরেও না। তুষার ঘামছে। আদিত্য হঠাৎ চেয়ারের হাতলে ঘুষি মেরে বিড় বিড় করে কী বলল, বলে উঠে দাঁড়াল।
