তোর যে কী জ্ঞানবুদ্ধি বাড়ছে, দিদি-কে জানে। শিশির অভিভাবকের গলায় বলল।
থাম। তুষার হাসিমুখে ভাইকে ধমকে দিল, আমার বুদ্ধি বাড়ছে না, বাড়ছে তোর। তাও যদি না চার বছরের ছোট হতিস।
শিশির হাত তুলে হতাশার ভঙ্গি করল। এবং খুব গম্ভীর গলায় বলল, দিন দিন তোর হিসেব বেড়েই যাচ্ছে। আগে বলতিস আড়াই তিন বছরের বড়, তারপর সাড়ে তিন বলতে লাগলি, এখন চারে দাঁড়িয়েছে। …যেন তোর বয়সটা এগিয়ে যাচ্ছে, আমারটা পিছিয়ে যাচ্ছে।
তুষার প্রায় চঞ্চল হাঁসের মতন হঠাৎ হাসির দমকে ভাইয়ের কোলের কাছে বালিশে ঝাঁপিয়ে এসে লুটিয়ে পড়ল। খিল খিল হাসি তুষারের নরম চিকণ গলায় তরঙ্গ তুলে ঘরে আবহাওয়াকে কেমন অবিচ্ছিন্ন গাঢ় সুখী ও তৃপ্ত করে তুলল।
শিশিরও হাসছিল।
.
আদিত্য বাইরে ছটফট করছিল। ধৈর্য ধরে জগন্নাথের মতন এক জায়গায় বসে থাকা তার স্বভাবে নেই। গোটাকয়েক সিগারেট টানল, বাগানে পায়চারি করল খানিক, কয়েকবার সাইকেলের ঘন্টি বাজিয়ে যেন ভেতরে তার অধৈর্যের সংবাদ পাঠাল, শেষে প্রায় চিৎকার করে ডাকতেই যাচ্ছিল তুষারকে–এমন সময় তুষার এল।
শাড়ি পালটায়নি তুষার, তেমনি ভাবেই ঘরোয়া করে পরা, জামাও বদলায়নি; চুলই যা এলো খোঁপা। করে বেঁধে নিয়েছে। তুষারের হাতে ডিম ভাজা আর চা।
আদিত্য খুব রেগেছিল। বলল, চমৎকার ব্যবহার আপনার।
তুষার ডিমের প্লেট এগিয়ে দিল। ধরুন।
ফেলে দিন। আদিত্য বুকের কাছে দুহাত গুটিয়ে নিল।
ফেলে দেব–তুষার চোখের পাতা কৌতুকে বড় করল, আদিত্যের ছেলেমানুষি রাগ দেখে তার মজা লাগছিল। নিন।
আমি খেতে আসিনি। আদিত্যের আত্মসম্মান আহত হয়েছে, যেন সে তারই প্রতিশোধ নিচ্ছে এমন এক গলা করে জবাব দিল।
তুষার অনুভব করতে পারছিল, ভদ্রতা এবং সৌজন্যের দিক থেকে তার ব্যবহার কিছুটা দৃষ্টিকটু .. হয়েছে। এতটা দেরি তুষার না করলেও পারত। রান্নাঘরে বসে চা খাবার করার সময়ও তুষারের মনে হয়েছে সে যেন একটু বাড়াবাড়ি করছে। আদিত্যকে এভাবে অপেক্ষা করানো অনুচিত, ভদ্রতা বিরুদ্ধ। আদিত্য আহত হতে পারে। অথচ তুষার কেমন জোর করে এই অনুচিত বোধকে তরল করে দেখছিল। …আদিত্যর আহত স্বরে তুষার সামান্য অনুশোচনা বোধ করল। মানুষ যেমন সাধারণ ছোটখাটো কোনও অন্যায় করে ফেললে ব্যাপারটা মুছে ফেলতে চায়, তুষার সেইভাবে মালিন্য মুছে ফেলার চেষ্টা করল। সলজ্জ সঙ্কুচিত হাসি এবং ত্রুটি স্বীকারের মুখ করে বলল, বা, আমি রান্নাঘরে বসে বসে করে আনলাম…। চা না দিলে আপনিই কি খুব খুশি হতেন—
আদিত্য তাকিয়ে থাকল কয়েক পলক। হাত বাড়াল বলল, আমি বোধহয় টাটকা তোলা পাতার চা খাচ্ছি।
খোঁচাটা তুষার হাসিমুখেই সহ্য করল।
আদিত্য যে রাগ করেছিল বা অপমানিত বোধ করছিল কয়েক মুহূর্ত পরে আর তা বোঝার উপায় থাকল না। ও এমন করে খেতে লাগল যেন কত ক্ষুধার্ত, মুখের এমন ভঙ্গি করে খাচ্ছিল যেন কী উপাদেয় বস্তু খাচ্ছে। তুষার আড়চোখে লক্ষ করছিল। মজা লাগছিল, হাসি পাচ্ছিল, আবার ভালও লাগছিল।
আপনার চা?
আনি।
হ্যাঁ, আনুন। আদিত্য বলল, আসবার সময় এক গ্লাস জল নিয়ে আসবেন।
তুষার চলে যাচ্ছিল। আদিত্য মনে করিয়ে দিল, দেখবেন আবার যেন বাতাস হয়ে যাবেন না। আমি তা হলে ঘন্টি বাজাতে শুরু করব।
হেসে ফেলেছিল তুষার। চলে গেল।
.
ক্রমে রাত হয়েছে। বাইরের ঘেরা ছোট বারান্দায় একপাশে টিমটিমে লণ্ঠনটা জ্বলছে। এ আলোয় অন্ধকারকে চেনানো যায়। বাগানে শিউলি ফুলের গন্ধ এসেছে, বাতাসে আচমকা একবার সেই গন্ধ ভেসে আসছে। আদিত্য চেয়ারে বসে। তুষার বেতের মোড়ায়। চায়ের কাপ ডিমের প্লেট অন্ধকারে একপাশে পড়ে আছে কখন থেকে। ওরা কথা বলতে বলতে এক সময় হঠাৎ দুজনেই চুপ করে গেছে কখন। অনেকক্ষণ নীরবে কেটে যাবার পর আদিত্য পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরাল।
এই ভেড়ার পাল চরিয়ে আপনি কী সুখ পান আমি জানি না। তামাকের ধোঁয়া ছেড়ে আদিত্য বলল।
সকলের সুখ এক রকম নয়। তুষার জবাব দিল।
হ্যাঁ– আদিত্য সামনের দিকে তাকিয়ে যেন স্বগতোক্তির মতন বলল, তা ঠিক। তবে অনেকে নিজের সুখ কীসে তাও জানে না।
ওদের কথাবার্তার ধরন থেকে বোঝা যাচ্ছিল অনেকটা সময় কথা বলতে বলতে ওরা দুজনেই এক ধরনের আলাপী অন্তরঙ্গতা বোধ করছিল। তুষার এখন আড়ষ্ট বা সঙ্কুচিত নয়; স্বল্প পরিচয়ের বা তৃতীয় ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলার যে অস্বাচ্ছন্দ্য, আপাতত তুষারের মধ্যে সেই অস্বাচ্ছন্দ্য এত কমে গেছে। যে ওকে সহজ বলেই মনে হয়। আদিত্য যেন সহজ ভাসা ভাসা কথার জগৎ থেকে ক্রমশ কোনও আন্তরিক জগতে প্রবেশ করবার চেষ্টা করছে, পারছে না।
আমি অত বুঝি না। তুষার মন দিয়ে আদিত্যের কথা শুনছিল, মৃদু গলায় জবাব দিল, এই বাচ্চাকাচ্চা আর শিশুতীর্থ নিয়ে আমি তো বেশ সুখেই আছি।
দেখছি তা। আপনার সুখ অন্যের ফরমাসে গড়া।
মানে! তুষার বিস্মিত হল।
অন্যে বলে এতে সুখ আছে, আপনিও সে কথা বিশ্বাস করেন।
না, আমায় কেউ বলেনি। আমি নিজেই বেছে নিয়েছি।
আদর্শ?
জানি না।
ডেডিকেশান। ..য়ুরোপে অনেক ক্রিশ্চান মেয়ে এইভাবে নিজেদের সমর্পণ করে ধর্মের কাছে। নান। আপনি জানেন?
শুনেছি।
আমাদের দেশে রামকৃষ্ণ আশ্রমের সাধুরা আছে, সন্ন্যাসিনীরাও।
