এই বাড়ি, সামান্য কিছু জমিজমা–সবই বাবা ছেলের মুখ চেয়ে করেছিলেন। তুষারের জন্যে তাঁর ভাবনা ছিল না। তিনি জানতেন, মেয়ে তাঁর জীবনের ঢেউয়ের তলায় ডুবে যাবে না, প্রয়োজন হলে একটা ব্যবস্থা সে করে নিতে পারবে। কিন্তু শিশির…?
শিশিরের কথা ভেবেই যা কিছু ব্যবস্থা, কিন্তু তুষার সেই ব্যবস্থার শরিক তো নিশ্চয়, এমনকী এর দায়-দায়িত্বও তুষারের ঘাড়ে চাপানো। তুষার না থাকলে বাবা বোধ হয় পাগল হয়ে যেতেন।
ভাইয়ের ঘরে ঢুকে তুষার অন্ধকারে বিছানার দিকে তাকাল। জানলার কাছে বিছানা। বালিশ সাজিয়ে শিশির নিত্য দিনের মতন বসে আছে।
শিশির
উঁ—
সন্ধে হয়ে গেল রে! দাঁড়া বাতি জ্বালি। তুষার অন্ধকারে ঘরের মধ্যে দেশলাই খুঁজতে লাগল।
কে এল রে দিদি, তখন?
সেই ভদ্রলোক। তুষার কেন যেন বিব্রত বোধ করল সামান্য।
শিশির সাইকেলের শব্দ শুনতে পেয়েছিল। এখান থেকে তাকালে বাইরের বাগান রাস্তা দেখা যায় বটে, কিন্তু গেটের দিকটা ঠিক মতন চোখে পড়ে না। সাইকেলের শব্দে শিশির গেটের দিকে তাকিয়ে আগন্তুককে দেখতে পায়নি। গঙ্গা বাতি দুলিয়ে আসতেই তুষারের খেয়াল হল, সে বোকার মতন দেশলাই খুঁজছিল। এ-ঘরের বাতিটা পরিষ্কার করার জন্যে গঙ্গা বিকেলেই বাইরে নিয়ে গিয়েছিল।
তুষার বাতি নিল গঙ্গার হাত থেকে। সব ঘরে বাতি দিয়েছিস?
মাথা নাড়ল গঙ্গা, দিয়েছে।
একটু জল ছিটিয়ে দে লক্ষ্মী, চৌকাটে। তুষার বলল, বলেই আবার যোগ করল, তোর উনুন ধরিয়েছিস?
চুলায় অনেক আগ৷ গঙ্গা জবাব জিল। গঙ্গা হিন্দুস্থানি ঝি–এদেশের লোক, অনেক কাল এ বাড়িতে কাজ করছে, বাংলা বলে হিন্দি মিশিয়ে মিশিয়ে।
মুহূর্তের জন্যে ভাবল তুষার। আদিত্যকে চা দিতে হয়। আতিথ্য। চায়ের সঙ্গে আর কী দেবে? কুচো নিমকি না পাঁপড় ভাজা? ডিম ভেজে দিলে কেমন হয়? ঘরে অন্য কিছু আছে বলে মনে হল না।
ডিম আছে রে? তুষার শুধোল গঙ্গাকে।
আছে। গঙ্গা মাথা দুলিয়ে জানাল, আছে। তুষার চায়ের জল চড়াতে বলল। তুই বাইরে একটা বাতি দিয়ে চায়ের জল চাপিয়ে দে, আমি আসছি।
গঙ্গা চলে গেল। তুষার ভাইয়ের দিকে তাকাল।
সদ্য আলো পেয়ে অন্ধকার ঝাপসা ঘরটা অনেকখানি দৃশ্যময় হয়ে উঠেছে। শিশিরের বিছানার পায়ের দিকটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। শিশিরকেও দেখা যাচ্ছিল। তুষার ভাইয়ের বিছানার কাছে সরে এল। শিশিরের মুখ চোখ বিশেষ করে চোখ দুটি বড় সুন্দর দেখতে। ভাই-বোনের মুখের আদলে মিল আছে। তবে তুষার আরও ফরসা, আরও লাবণ্যময়। শিশিরের চোখ তুষারের চেয়ে সুন্দর। কেন সুন্দর বলা মুশকিল। হয়তো ঘন কালির মতন কালো পুরু জোড়া ভুরুর জন্যে চোখ দুটি অমন সুন্দর দেখায়, হয়তো শিশিরের চোখের দৃষ্টিতে যে অসহায় বেদনা মেঘলার মতন মাখানো–তার জন্যেই করুণাবশত ওর চোখ অনেক সুন্দর মনে হয়।
আজ একটুও বাইরে বসলি না রে? তুষার ভাইয়ের বিছানার পাশ ঘেঁষে এসে বসল।
শিশির কোনও জবাব দিল না কথার। বালিশের পাশে একটা বই উপুড় করা ছিল। শিশির বইটা । মুড়ে রাখল। আমাকেও আর এক পেয়ালা চা দিস, দিদি।
দেব। আর কী খাবি?
কিছু করবি তুই?
যা খেতে চাস বল, করব।
কর যা হয় একটা। শিশির হাই তুলল। ভদ্রলোককে বাইরে বসিয়ে রেখে তুই দিব্যি ঘরে ঢুকে পড়লি। শিশির কৌতুকের মুখে হাসল।
তুষার গলার হারের আংটটা নখ দিয়ে টিপছিল। চোখ তুলে তাকাল। বলল, কী বিপদে পড়লাম দেখ তো। এখনও আমার চুলটা পর্যন্ত বাঁধা হয়নি, সন্ধে উতরে গেল। বাইরে লোক এসে বসে।
তুই রাত বারোটায় যদি চুল বাঁধিস, লোকের কী দোষ!
তুষার পিঠের পাশ থেকে এলো চুল মুঠো করে সামনে টেনে নিল। আজ একটা নাগাদ মাথা ঘষেছি, চুলই শুকোয় না।
নিয়ে আয় তোর ফিতে চিরুনি–আমি বেঁধে দিচ্ছি। শিশির হাসিমুখে বলল।
থাক। তুষার ডান হাত তুলে ক্ষান্ত করার ভঙ্গি করল।
থাক কেন, দে, আমি বেঁধে দি।
মাথা নাড়ল তুষার। না। তুই এখনও গোড়া বাঁধতে পারিস না। এমন শক্ত করে দিস যে মাথা ধরে যায়।
তুষার কথা বলতে বলতে ঘরের ডান দিকের পরদা সরিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। পাশের ঘরে পায়ের শব্দ শোনা যেতে লাগল।
শিশির দিদির চলাফেরার শব্দ শুনছিল। সে মাঝে মাঝে দিদির চুল বেঁধে দেয়। এই তাদের ভাই-বোনের এক অদ্ভুত প্রীতি-সান্নিধ্য। কেমন করে যেন ছেলেবেলা থেকেই শিশিরের দিদির চুলের ওপর ঝোঁক। ছেলেবেলায় এই চুল সে দু হাতে মুঠো করে ধরে ছিড়ত, বয়স বাড়লে পছন্দটা কেমন পালটে গেল। এক সময় যা রাগ করে ছিড়ত, পরে তা ভালবেসে বেঁধে দেয়। তুষারের কাছ থেকে কত কষ্ট করে তবে এই চুল বাঁধা শিখতে হয়েছে।
তুষার নিজের ঘর থেকে চিরুনি আর কাঁটা নিয়ে এসেছে। ভাইয়ের বিছানায় বসল। বলল, আজ আর চুল বাঁধব না, এলোখোঁপা করে জড়িয়ে নি। বলে দ্রুত হাতে চুল আঁচড়াতে লাগল।
শিশির দিদিকে দেখছিল। কেরাসিনের আলোয় দিদিকে কেমন যেন অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে। কী ভাবছে দিদি? বাইরে লোক বসিয়ে রেখে এসেছে বলে অস্বস্তি বোধ করছে?
দিদি, ভদ্রলোককে তুই ঘরে এনে বসাতে পারতিস।
ঘরে এনে?
বাইরে একা বসে থেকে চলে না যায়।
তাই বলে ঘরে এনে বসাব। যাঃ।
শিশির বুঝল না যাঃ কেন। তার বন্ধুরা সকাল বিকেল কি তার ঘরে এসে বসে না? অন্য লোকজন এলেও তো কত সময় ঘরে এসে বসে। বাইরে চুপচাপ একটা লোককে বসিয়ে রাখার চেয়ে ঘরে এনে বসালে ভাল দেখায় বইকি।
