আজ আবার আদিত্য এসেছে। নিজেই।
তুষার সিঁড়ির কাছে আসতে আসতে গায়ের আঁচল আরও সামান্য ঘন করে জড়িয়ে নিল।
বাজারে এসেছিলেন? তুষার মুখ তুলে ভদ্র আলাপে বলল।
না। আদিত্য মাথা নাড়ল। আঙুল দিয়ে সিগারেটের মুখের ছাই পরিষ্কার করল। এক বিন্দু রক্তের মতন আগুনের ঢিপ জ্বলতে লাগল।
সিঁড়িতে পা দিল তুষার। দুধাপ উঠে কী ভেবে একটু দাঁড়াল, সাইকেলটা দেখল। জ্যোতিবাবুর সাইকেল? কথাটা এমন স্বরে বলল তুষার যেন মনে হয়, পরের সাইকেল আরও একটু যত্ন করে রাখতে হয়।
আদিত্য বোধ হয় কথাটা শুনল না। শুনলেও কিছু বুঝল না। বলল, আপনি গাছে জল দেন?
প্রশ্নটা ঠিক বুঝতে না পেরে তুষার তাকাল চোখ তুলে। আদিত্যর মুখে হাসি, হাসিটা পরিহাসের না উপহাসের বোঝা মুশকিল।
তুষার ভাবল এক মুহূর্ত। বলল, ছুটির দিন ছাড়া বড় একটা সময় হয় না। এই দুদিন সামান্য যত্ন করি।
এবার একটা তপোবন করে ফেলুন। আদিত্য উপহাসের হাসি হাসল।
তুষার কিছু বুঝল না, অথচ আড়ষ্ট বোধ করল হাসির শব্দে।
বৃক্ষলতা, হরিণ শাবক…, আপনি তো প্রায় শকুন্তলা হয়ে উঠেছেন। আদিত্য হাসছিল, হাসতে হাসতে সিগারেটটা ছুঁড়ে দিল বাগানে।
তুষার বুঝল। বুঝে কেমন লজ্জা পেল। বলল, হরিণ কোথায় দেখলেন?
দেখিনি। কিন্তু চতুষ্পদ জন্তু ছাড়াও তো জন্তু আছে, তাদেরও শাবক থাকে। আপনার দ্বিপদ শাবক তো কয়েক গণ্ডা।
তুষার রাগ করল না। আদিত্যর কথা বলার ধরন সে জানে। এমন নয়, সব কথা আদিত্য বুঝে বলে, বিবেচনা করে বলে। ঠোঁটের গোড়ায় কথাকে ও-মানুষটা লাগাম পরাতে পারে না।
আপনি গাছপালাও পছন্দ করেন না? তুষার স্নিগ্ধ স্বরে বলল।
না।
ওরা তো জন্তু নয়। তুষার জন্তু শব্দটার ওপর জোর দিল। আদিত্য শিশুতীর্থের ছেলেমেয়েদের জন্তু বলে গণ্য করে।
জন্তুর সমান। আদিত্য জবাব দিল।
তুষার বারান্দায় উঠে এসেছিল। এক পাশে বেতের একটা চেয়ার সব সময় পড়ে থাকে বারান্দায়। আজ চেয়ারটা ছিল না। মেরামত করার জন্যে শিশির পাঠিয়ে দিয়েছে। ইতস্তত করে তুষার বলল, বসার কিছু এনে দি, আপনি বসুন।
আদিত্য বাধা দিল সঙ্গে সঙ্গে। বসার কিছু দরকার নেই আমার। আমি বেশ দাঁড়িয়ে আছি। দাঁড়াতে আমার কষ্ট হয় না।
তুষার কান দিল না কথায়। ভেতরে চলে গেল চেয়ার আনতে।
সামান্য পরেই ফিরে এল তুষার। কাঠের চেয়ার বয়ে এনে রাখল। আদিত্য পকেট থেকে রুমাল বের করে ঘাড় মুখ মুছছিল।
আমি সিঁড়ির ওপর বসতে পারতাম। আদিত্য বলল।
সিঁড়ির ওপর বসবেন কেন ময়লায়। চেয়ার দেখাল ইঙ্গিতে তুষার, বসুন।
আপনি?
আমি দাঁড়িয়ে আছি। আপনি বসুন।
উঁহু-আপনিই বসুন, আমি এই সিঁড়িতে বসছি।
না, না–সে কি! ছি! তুষার বিব্রত কণ্ঠে বলল।
আদিত্য হাসল। পদপ্রান্তে বসাই কি ভাল না?
তুষার কথাটা শুনতে না শুনতেই ফুরিয়ে গেল। যেন লহমার জন্যে একটি শিখা তাকে স্পর্শ করে অদৃশ্য হল। বিমূঢ় বোধ করল তুষার। অর্থটা বুঝল কি বুঝল না স্পষ্ট করে, কেমন শিহরিত ও সঙ্কুচিত হল। নতচোখে বারান্দার অন্ধকার দেখছিল।
আদিত্য কথা বলল। আমায় বসতে দিয়ে আপনি দাঁড়িয়ে থাকলে আতিথ্য পালন করা হয় বটে, কিন্তু উদ্দেশ্যটাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
উদ্দেশ্য?
হ্যাঁ। অর্থাৎ অতিথিকে বিদায় করতে চান বলেই একতরফা ব্যবস্থা।
কই না, আমি তেমন কিছু ভাবিনি। তুষার সবিস্ময় কুণ্ঠায় বলল।
সব কিছু বলতে হয় না। ব্যবহার অনেক কিছু প্রকাশ করে।
আপনি বসুন, আমি একটু কাজ সেরে আসছি।
অপেক্ষা করব?
তুষার জবাব দিল না। পাশের দরজা দিয়ে ঘরে চলে গেল।
ঘরে এসে তুষার হাঁপ ছাড়তে পারল। এ-রকম মানুষ সে আর দেখেনি। সন্দেহ হয়, লোকটা সভ্য সমাজে মিশেছে কি না। অভদ্র… তুষার কথাটা বলতে গিয়েও পারল না, আটকাল। কেন আটকাল? সৌজন্য জ্ঞানহীন ওই অদ্ভুত মানুষটাকে আর কী বলা যায়? অসভ্য, ইতর..?
না। তুষার বিরক্ত হয়েছে বলেই একজনকে অত সহজে অভদ্র বা ইতর বলতে পারে না। তুষারের স্বভাবই সে-রকম নয়। সে কখনও জোরে, রাগ করে কিংবা জ্ঞান হারিয়ে কিছু করে না, করতে পারে না। আদিত্যর কথাবার্তা আচরণে অস্বস্তি এবং সঙ্কোচ বোধ করেছিল তুষার, কিন্তু রাগ করেনি।
নিজের ঘরে দাঁড়িয়ে তুষার টেবিলের বাতিটা দেশলাই দিয়ে জ্বালিয়ে দিল। ঘরগুলো অন্ধকার হয়ে গেছে। বাইরে উঠোন ও দালানে সন্ধ্যা নেমে গেছে। গঙ্গাকে দেখতে পাচ্ছে না তুষার। গঙ্গা কি এখনও কুয়াতলায়?
শিশিরের ঘরে কোনও সাড়াশব্দ নেই। তুষার বাইরে বারান্দায় এসে নিচু গলায় গঙ্গাকে ডাকল– গঙ্গা, এই গঙ্গা। দালানের ওদিকে পিছন কুয়াতলায় গঙ্গা দাঁড়িয়ে আছে।
ডাক শুনে গঙ্গা তাকাল, হন হন করে এগিয়ে এল।
বাতি জ্বালবি না? তুষার বলল।
জ্বালব। গঙ্গা মাথা নাড়ল।
আর কখন জ্বালবি? রাত হয়ে গেলে?
গঙ্গা উঠোন বারান্দা ঘরের দিকে তাকিয়ে যেন অন্ধকার পরীক্ষা করে নিল। যেন দেখে নিল, এই অন্ধকার বাতি জ্বালার উপযুক্ত অন্ধকার কি না। তারপর বাতি জ্বালতে চলে গেল।
শিশির অন্ধকারে শুয়ে ছিল। সে এই ভাবে শুয়ে থাকে। সে বিকলাঙ্গ। পায়ের দিকটা আজও চেয়ারের পায়ার মতন সরু, বেঁকানো বেতের মতন বেঁকা। ছেলেবেলায় পোলিও হয়েছিল। চিকিৎসা করেছিলেন বাবা সাধ্য মতন, দুবার অপারেশন করা হয়েছিল, দেড় বছর ছিল হাসপাতালে কিছু হয়নি। ডাক্তারে বলেছিল আরও সাতবার অপারেশন করতে হবে। বাবা রাজি হননি। প্রাণটা তবু তো আছে ছেলেটার, সেটুকুই থাক।
