সংসারে কত রকমের অদ্ভুত মানুষই না থাকে, আদিত্য সেই রকম। সত্যিই মানুষটা বিচিত্র, তুষার এই রকম লোক দেখেনি। যার উচিত ছিল পুলিশের কোনও চাকরি নেওয়া সে এসেছে শিশুশিক্ষার তদারকি করতে। স্বভাবে চরিত্রে মনে এই মানুষ শিশুরাজ্যে, শিক্ষার রাজ্যে একেবারে বেমানান। দৈত্যকুলে প্রহ্লাদ বলে কথা আছে একটা–যদি প্রহ্লাদকুলে দৈত্য বলে কিছু থাকত তবে আদিত্যকে সেখানে বসানো চলত। ফুলের বনে মত্তহস্তী। ও কেন এল? সংসারে ওর কি অন্য জায়গা ছিল না?
আদিত্য নিজেই বলে, আমি মিসফিট। এসব শিশুশিক্ষা-টিক্ষায় আমার কোনও ইন্টারেস্ট নেই।
নেই?
একেবারেই না। আদিত্য বিতৃষ্ণার সঙ্গে মাথা নেড়েছিল।
আশ্চর্য! তুষার বলেছিল।
আশ্চর্যের কিছু না। এই রকমই হয়ে থাকে।
যে যা পছন্দ করে না তাকে তাই হতে হয়?
হ্যাঁ। আজকাল জগৎ অন্য রকম হয়ে গেছে। যার পাকা চোর হওয়া উচিত সে সাধু হয়।
কথা শুনে তুষার হেসে ফেলেছিল। এই রকমই কথা বলে লোকটা। কী বলছে ভেবে দেখে না।
আপনি তো শিশুশিক্ষার বিষয় নিয়ে চর্চা করেছেন শুনেছি। তুষার বোঝাবার মতন গলা করে বলেছিল একদিন।
না, মোটেই না।
সে কি! আমরা যে শুনেছিলাম–
শোনানোর মতন পরিচয় আমার ছিল বলে শুনেছেন। তবে সেটা মিথ্যে পরিচয়। পেটের জন্যে রাখতে হয়েছে।
মানে?
জীবিকা। আমায় মাস গেলে চাইল্ড এডুকেশন সোসাইটি অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার থেকে তিনশো টাকা মাইনে দেয়।
তুষার বিন্দুমাত্র খুশি হয়নি কথা শুনে। একটু রূঢ় ভাবেই বলেছিল, তা হলে আপনি ওদের ঠকাচ্ছেন?
একরকম তাই। ঠকানো ছাড়া উপায় কী। আমরা সব সময় হয় নিজেকে না হয় অন্যকে ঠকাই।
হ্যাঁ, যদি ঠগ হই। তুষার ক্ষুব্ধ স্বরে বলেছিল।
আদিত্য গ্রাহ্য করেনি; হেসেছিল।
এই পরিচয় ওর। শিশুশিক্ষা, শিশুর মন, শিক্ষার তত্ত্ব কোনও কিছুর প্রতিই আদিত্যর আকর্ষণ নেই, অথচ এই লোক, তুষার জেনেছে, এই লোকই মনস্তত্ত্বের ডিগ্রি নিয়েছে, শিশুশিক্ষার ডিপ্লোমা পেয়েছে, সরকারি পয়সায় দেড় দুবছর বিদেশ ঘুরে এসেছে শিশুশিক্ষা পদ্ধতির নতুন রীতি-নীতিতে শিক্ষিত হয়ে আসতে। এখানে এসে বাঁধা চাকরি পেয়েছে, চাকরির শর্ত অনুযায়ী নানা শিশুশিক্ষা কেন্দ্রে ঘুরে ঘুরে অভিজ্ঞতা ও গবেষণা করছে।
তুষারের ঘৃণা হয়েছিল। আদিত্যকে সে ঘৃণাই করেছিল তখন। লোকটা শুধু অযোগ্য নয়, প্রবঞ্চকও।
তবু এই মানুষই তুষারকে কেমন একটা সৌজন্যমূলক দুর্বলতার মধ্যে ফেলেছে। যদি সাহেবদাদু ওর কথা জিজ্ঞেস করেন তুষার কি বলতে পারবে, এখানে ওঁকে থাকতে দেওয়া নিরর্থক। শিশুতীর্থের আদর্শ ও শান্তির পক্ষে ভদ্রলোক বিঘ্ন।
তুষার ভেবে দেখল, সে কিছু বলবে না। আদিত্যবাবুর বিপক্ষে নয়, স্বপক্ষেও নয়। বিপক্ষে বলা ভাল দেখায় না, কারণ মানুষটা এখানের অতিথি, মাসখানেকের বেশি হল এসেছে, আরও হয়তো মাসখানেক থেকে চলে যাবে। ওর সঙ্গে শিশুতীর্থের যখন কোনও যোগাযোগ নেই, তখন কেন অনর্থক একজনের অপযশ গাওয়া।
আদিত্যর প্রতি তুষার করুণাই অনুভব করল। নিতান্ত চাকরির জন্যে যে লোক শিশু কল্যাণের ব্রত নিয়েছে তার সম্পর্কে তুষারের কিছু বলার নেই। আদিত্যকে অত্যন্ত দীন এবং হীন বলে মনে হচ্ছিল তুষারের।
শানুর অঙ্ক হয়ে গেছে। শানু তুষারকে ডাকল দিদি।
তুষারের চমক ভাঙল। চমক ভাঙার পরই তুষার অনুভব করতে পারল তার কপাল গলা ঘাড় ঘামে ভিজে উঠেছে।
২. বিকেলের শেষ মলিন-আলোয়
০৬.
সেদিন বিকেলের শেষ মলিন-আলোয় তুষার অবাক হয়ে দেখল আদিত্য তার বাড়ির গেটের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।
আপনি? তুষার বাগানে জল দিয়ে ঝারি হাতে দাঁড়িয়েছিল। শুকনো মাটিতে সদ্য জল পড়ে সোঁদা গন্ধ উঠছে। পাশে কয়েকটা কলকে ফুল বাতাসে দুলছিল।
গেটের মধ্যে সাইকেল ঢুকিয়ে আদিত্য বাগানের সদরে পা দিল। খোঁজ নিতে এলামআদিত্য বলল অক্লেশে। গেটটা বন্ধ করল না।
তুষার মাটিতে ঝারি নামিয়ে রাখল। তার পরনে সাদামাটা শাড়ি, গায়ের জামাটা বাসন্তী রঙের। এখনও চুল বাঁধেনি তুষার। পিঠময় চুল ছড়িয়ে আছে।
আসুন। তুষার নিজেকে সামলে নিয়ে বলল। সে বুঝতে পারছিল না, খোঁজ নিতে এলাম কথাটার অর্থ কী।
আদিত্য সাইকেল ঠেলে সিঁড়ির কাছে এগিয়ে গেল। তার ভঙ্গিতে কোনও আড়ষ্টতা নেই। যেন এইভাবে সে রোজই এখানে আসে।
গেটটা তুষার বন্ধ করে দিল। বিকেলের আলো আর নেই। শুন্যের রং ময়লা। গাছের মাথায় পাখিরা কলরব করছে। গেট বন্ধ করে ফেরার সময় শিউলি ফুলের ঈষৎ গন্ধ পেল তুষার।
সাইকেলটা একপাশে ফেলে রেখে সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আদিত্য সিগারেট খাচ্ছে। এই মাত্র ধরিয়েছে। তুষার লক্ষ করল, আদিত্য আজ প্যান্ট আর হাতকাটা শার্ট পরে এসেছে। এই পোশাকটা সেদিনও পরে এসেছিল আদিত্য যেদিন শহরে আচমকা দেখা হয়ে গেল তুষারের সঙ্গে। তুষার বাজারের দিকে মণিদির বাড়িতে দেখা করতে গিয়েছিল–ফেরার পথে আদিত্যকে বান্ধব চা কেবিনের পাশে সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল। তুষার একটু অবাক হয়েছিল। পরিচিত লোককে পথে দেখলে মানুষ হন হন করে চলে যেতে পারে না। তুষারও পারেনি। আদিত্য সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এল।
আদিত্য তার শহরে আসার কৈফিয়ত দিতে চায়নি। কিন্তু কথায় কথায় বলেছিল, কিছু জিনিসপত্র কিনতে সে শহরে এসেছে। তুষার পথে-ঘাটে বাজারে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, আর এই সদর বাজারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলা তার স্বভাবের বাইরে। তুষার হাঁটতে আদিত্যও পাশে পাশে আসতে লাগল। কথা বলছিল অনর্গল। তুষার একান্ত সৌজন্যবশেই সেদিন ওকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে এসেছিল। আমন্ত্রণ না জানালে ব্যাপারটা খুবই দৃষ্টিকটু হত।
