তুষার কপাল মুছে নিল। একটা হাতপাখা অবশ্য আছে ওদিকে। কোনও দরকার নেই পাখার। এখুনি জানলা দিয়ে দমকা হাওয়া বয়ে গেলে ঘর আবার ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগবে। আজকের বাতাস তেমন গরম নয়। বরং দুরে কোথাও বৃষ্টির জলে ভিজে ঠাণ্ডা হয়ে মাঝে মাঝে এপাশে এসে লুটিয়ে পড়ছে।
বসে থাকতে থাকতে তুষার সাহেবদাদুর কথা ভাবছিল। আজ যাবার আগে নিশ্চয় একবার দেখা করে যেতে হবে। গত দুদিন তুষার তাঁর কাছে যেতে পারেনি। সাহেবদাদুর শরীরটা এই একবছরে যেন বড় তাড়াতাড়ি ভেঙে পড়ল। সেই যে টমটম করে কোথায় যেতে গিয়ে গাড়ি উলটে পড়ে একটা দুর্ঘটনা ঘটালেন, তারপর থেকেই ওঁর শরীর ভাঙার দিকে। অবশ্য বয়স হয়েছে, শরীর ভাঙবে, অথর্ব হয়ে পড়বেন ক্রমশই–এটা কিছু আশ্চর্যের নয়। কিন্তু বছরখানেক আগেকার সাহেবদাদুর সঙ্গে আজকের সাহেবদাদুর তুলনা করলে মনে হবে, এক বছরে এত স্বাভাবিক নয়।
উনি নানা দুশ্চিন্তা দুর্ভাবনায় আছেন। একটা দুটো দুর্ভাবনার কথা তুষার জানে, আশাদিও জানে। জ্যোতিবাবুও যে না জানেন এমন মনে হয় না।
সেই সব দুর্ভাবনার একটা হল, অর্থচিন্তা। এই শিশুতীর্থের জন্যে উনি ওঁর যথাসর্বস্ব দিয়েছেন। মোটামুটি ধনী লোক না হলে বা অর্থের ব্যবস্থা না থাকলে এই প্রতিষ্ঠান এতকাল কষ্টেসৃষ্টে চালানোও সম্ভব ছিল না। এত কিছুঘরবাড়ি জিনিস-পত্র–যত দীন ভাবেই হোক উনি একার সামর্থেই করেছেন। এখন ভাণ্ডার বোধ হয় প্রায় শূন্য। সর্বক্ষণই দুশ্চিন্তা, কেমন করে শিশুতীর্থ চলবে।
সাহেবদাদুর এক বন্ধু কোনও মিশনারি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের যেন হর্তাকর্তা ব্যক্তি। তুষার আশাদির কাছে শুনেছিল সাহেবদাদু সেই বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করে বাৎসরিক কিছু সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন। তুষার ঠিক জানে না সাহায্যটা এত দিনে পাওয়া গেছে কি না। এ ছাড়া সামান্য আর যা সাহায্য অন্যান্য সূত্র থেকে আসে–সাহেবদাদুর অবর্তমানে তা পাওয়া যাবে কি না কে জানে!
সাহেবদাদুর অন্য দুর্ভাবনা ইতি। দেখতে রোগা মতন মেয়েটা তার অবোধ মুখ নিয়ে কেমন বড় হয়ে উঠল। তুষার নিজের চোখেই গত দুবছর ধরে ওকে দেখছে। কেমন শীর্ণ শ্যামলা ছিল, সেই মেয়ে যেন বাড়ন্ত হবার সময়ে এসে হু হু করে বেড়ে উঠল। মেয়েদের এই এক আশ্চর্য ব্যাপার। ঝড় এলে যেন বানের মতন আসে। পনেরো বছরের ইতিকে চট করে দেখলে কে আজ বলবে যে বছরখানেক আগেও অমন রোগা ছিপছিপে চঞ্চল মেয়ে ছিল। আজ ইতি রীতিমতো তুষারের মাথায় মাথায় হয়ে উঠেছে। শরীর বড় সুন্দর হয়ে বেড়েছে, নতুন ফোঁটা ফুলের মতন দেখায়। গায়ের সেই শ্যামলা রং যে কী উজ্জ্বল মিষ্টি হয়ে উঠেছে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।
ইতির সবই ভাল। মন্দ এই যে, মেয়েটা কেমন করে যেন এই বয়সেই অনেকখানি গম্ভীর, চুপচাপ। এত শান্তশিষ্ট হওয়া ওকে–ওই বয়সের মেয়ের পক্ষে-মানায় না। মাঝে মাঝে মেয়েটাকে, তুষার লক্ষ করে দেখেছে, বড় একা নিঃসম্পর্ক নিষ্প্রাণ দেখায়। যেন একটা বৈরাগ্যের ছবি।
সাহেবদাদু ইতির সম্পর্কে সব সময় দুশ্চিন্তা করেন। তাঁর অবর্তমানে মেয়েটার কী হবে, এই শিশু-তীর্থ সম্বল করে সে কি জীবন কাটাতে পারবে? শিশুতীর্থের ভবিষ্যতই যেখানে স্পষ্ট করে দেখা যায় না, সেখানে ইতিকে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করে নিশ্চিন্ত হওয়া কিংবা ভরসা পাওয়া অসম্ভব। তা ছাড়া ইতির কাছে, কে বলতে পারে, এই শিশুতীর্থের মূল্য সত্যি সত্যি কতটা!
ঘুঘুর ডাকে তুষারের মনোযোগ ছিল না। জানলার বাইরে থেকে একটা হলুদ ছিটঅলা পাখি ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল। ফর ফর করে উড়ে আবার অন্য জানলা দিয়ে বেরিয়ে গেল। তুষারের অন্যমনস্কতা ফিকে হয়ে এল, ঘুঘুর ডাক আবার শুনতে পেল তুষার। দু-এক দমক হাওয়া এসেছে। বাইরের রোদ এত ঘন যেন আলোর সর পড়ে জমে আছে।
ছেলে-মেয়েদের দিকে চোখ বুলিয়ে তুষার জানলার বাইরে তাকাল। মনে পড়ল, সাহেবদাদুর সঙ্গে দেখা করতে গেলে উনি আদিত্যবাবুর কথা জিজ্ঞেস করবেন। আশাদি বলেছে। সাহেবদাদু জিজ্ঞেস করলে তুষার যে কী জবাব দেবে বুঝতে পারল না।
এত লোক থাকতে তুষারকেই বা কেন যে আদিত্যবাবুর সম্পর্কে প্রশ্ন করার যোগ্য পাত্র মনে হল এও এক অদ্ভুত ব্যাপার। খুব সম্ভব আশাদি বিদঘুঁটে ব্যাপারটা তার ঘাড়ে চাপিয়ে নিস্তার পেয়েছে।
তুষার কিছু জানে না। সামান্য অসহিষ্ণু হয়ে বিরক্ত হয়েই তুষার মনে মনে বলল, আমি কিছু জানি না। আদিত্যবাবু এখানে কী করছেন, কেমন দেখছেন শিশুতীর্থ, কী বলছেন–আমি জানতে চাই না, জানি না।
ব্যাপারটা অস্বস্তিকর বলেই তুষার তার দায় এড়াতে আদিত্য সম্পর্কে নিস্পৃহ থাকতে চাইল। কিন্তু পারল না। কারণ এখানে–এই শিশুতীর্থে তুষার ছাড়া অন্য কেউ আদিত্যর ওপর প্রসন্ন নয়। আশাদি খুবই বিরক্ত, মুখে কিছু বলেন না। জ্যোতিবাবু হয়তো বিরক্ত নন, কিন্তু আদিত্য তাঁকে এড়িয়ে চলে। মলিনা আর প্রফুল্লবাবুকে আদিত্য গ্রাহ্য করে না।
ভদ্রলোক এখানে কেন এসেছেন তুষার বুঝতে পারে না। অযথা সময় নষ্ট করছেন এখানে বসে। শিশুতীর্থ তাঁকে কিছু শেখাচ্ছে না, বা তিনি এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁর খোরাক কিছুই জোগাড় করতে পারছেন না। তবু বসে আছেন। বসে বসে নিজের এবং অন্যদের সহিষ্ণুতার মাত্রা নষ্ট করছেন।
