না, বোধন যেতে পারে না। দু দিকে দুই ফাঁসের মতন মা আর বাবা তাকে আটকে রেখেছে।
আমার যাওয়া হবে না, বিনু। এ-জন্মে নয়। বোধন মনে মনে বলল, যেন সত্যিই সে যেতে পারত বিনুর সঙ্গে কিন্তু পারল না।
.
১৫.
সকাল থেকেই চুয়াকে ব্যস্ত দেখাচ্ছিল।
এই সময়টায় তার কিছু কাজ থাকে। সকালের চা তৈরি, বিছানাপত্র ঘর পরিষ্কার, রেশনের চাল বাছা, বাজার এলে শাকসবজি ধুয়ে মার কথামতন কেটেকুটে দেওয়া–এই ধরনের টুকিটাকি কাজ। সকালে একটু বেলা করেই ওঠেন সুমতি, তারপর আর সময় থাকে না, শীতের দিন হুহু করে বেলা চলে যায়।
আজ চুয়া বাথরুমে ঢোকার মুখেই জবাকে কিছু বলল। বোধন শুনতে পায়নি।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে চুয়া তাড়াতাড়ি চায়ের পাট নিয়ে বসল। ওই ফাঁকে নিজের ঘরদোরও পরিষ্কার করে ফেলল যতটা পারে।
বাবাকে চা দেবার সময় চুয়া বলল, আমি কিন্তু বেরিয়ে যাব। আজ আমার দরকার।
শিবশংকর কিছু বললেন না। মেয়েকে একবার দেখলেন। চুয়া ঘরে চলে গেল।
বোধন চা খাচ্ছিল।
শিবশংকর বললেন, কাল এদিকে গণ্ডগোল হয়েছে।
বোধন এমন বদ্ধ জায়গায় শোয় কিছু শুনতে পায়নি। বলল, কখন? কোথায়?
তা এগারোটা সাড়ে এগারোটা হবে, শিবশংকর বললেন, প্রায় আধঘণ্টা ধরে দুমদাম হল।
বোধন জবাব দিল না। রাত্রে গুলি কিংবা বোমার আওয়াজ-টাওয়াজ এ-পাড়ায় নতুন কিছু নয়। রেল লাইন দুরে, তবে তেমন দূরে নয়। কাছাকাছি রেল ইয়ার্ডও রয়েছে। রেলের পুলিশ আর ওয়াগান ব্রেকারদের মধ্যে মাঝেসাঝে গুলি বোমার খেলা হয়। হয়তো সেই রকম কিছু।
শিবশংকর চায়ের অর্ধেক শেষ করে বিড়ি ধরালেন। জানলার দিকে তাকিয়ে থাকলেন কয়েক মুহূর্ত। বাইরে রোদ। আলোও পরিষ্কার। তোমার মা এমনিতেই আজকাল কম ঘুমোয় তার ওপর শব্দ-টব্দ শুনলে আর ঘুমোত পারে না।
বোধন মার ব্যাপারটা বোঝে। রাত্রে মার ভাল ঘুম হয় না। শেষরাত কিংবা ভোরের দিকে ঘুম ঘন হয়। সকালে উঠতে দেরি করে। আসলে সারাদিনের খাটুনি হুড়োহুড়ির পর মার বোধ হয় এতই অবসাদ থাকে যে চট করে ঘুম আসে না। তার ওপর নানা দুশ্চিন্তা। মাথা গরম হয়ে থাকে। মাঝে মাঝে শোবার পরও মা ঘর বেরিয়ে এসে বাথরুমে গিয়ে মাথায় জল দিয়ে নেয়। শীতের দিনেও বাদ যায় না। মাথার ব্রহ্মতালুতে জল চাপড়ে চাপড়ে মা মরবে। অদ্ভুত সব অভ্যেস মার।
বোধন বলল, রেল লাইনের দিকে হতে পারে শব্দ।
না না, অত তফাতে নয়কাছেই কোথাও।
কাছেই? তবে কি রজনী আর শান্তদের ব্যাপার? হতে পারে। রজনী আর শান্তদের রেষারেষি এমন একটা অবস্থায় পৌঁছে থেমে আছে যে শুধু একটা দেশলাইয়ের কাঠি ফেললেই হয়। কালী পুজোর সময় থেকেই এটা চলছে। রজনীরা তাদের সাম্রাজ্য বাড়িয়ে ফেলে জিজিয়া আদায় বেশি করছে শান্তরা হটে যাচ্ছে, মোটামুটি এই নিয়ে রেষারেষি। ওটা একটু চাপাচুপি ছিল, তারপর আবার লেগেছে। দু পক্ষই তৈরি। একটা ছুতো কিংবা সুযোগের অপেক্ষায় আছে। পুলিশ এখন রজনীদের যতটা পারে খাতির করে চলছে। কিন্তু শাতরাও কম যায় না, সোজাসুজি না হলেও বেঁকা রাস্তায় তারাও থানার দুচারজনকে হাত করে রেখেছে। কাজেই উভয় তরফই সেজেগুজে শুধু একটা সুযোগের অপেক্ষায় বসে আছে। পাড়ার লোকজন এটা জানে। জানে বলে সাবধানে চলাফেরা করছে রাত্রে।
চা শেষ করে বোধন উঠে পড়ল। মা ঘুম থেকে উঠে চোখ-মুখ ধুয়ে চা না-খাওয়া পর্যন্ত তার কিছু করার নেই। মা টাকা পয়সা দিলে সে বাজারে যাবে।
চুয়া আবার কখন বাথরুমে ঢুকেছিল। ভেজা মুখ, খোলা চুল নিয়ে ঘরে চলে গেল।
আজ আবার কী আছে চুয়ার? এই সাত সকালে?
বোধন ঘরে এল। চুয়া শাড়ির শুকনো আঁচলে মুখ মুছছে ঘষে ঘষে।
কী ব্যাপার রে? কোথাও বেরুবি? বোধন জিজ্ঞেস করল।
হ্যাঁ। নটায় বাস।
বাস? কোথায় যাচ্ছিস?
কেষ্টনগর। ভাড়া বাসে।
কেষ্টনগর। সেখানে কী?
শো আছে সন্ধেবেলায়। দুপুরে পৌঁছে যেতে হবে।
শো! মানে থিয়েটার।
চুয়া মাথার চুল আঙুলে ছাড়িয়ে নিয়ে মোটা চিরুনি দিয়ে আঁচড়াতে লাগল।
কীসের থিয়েটার? বোধন জিজ্ঞেস করল!
কল শো। আমাদের ক্লাবের নয়, আমি ক্লাব ছেড়ে দিয়েছি। যত প্যাঁচ মারামারি। টাকা দেব বলে দেয় না, দেব-দিচ্ছি করে, বড় বড় কথাই শুধু। তার চেয়ে আমার এই মধুচক্র-ই ভাল। পিনুদা টাকাপয়সা নিয়ে ছ্যাঁচড়ামি করে না।
বোধন কিছুই বুঝল না। কত টাকা দেবে তোকে?
তিরিশ।
তিরিশ। বলিস কী রে! একবার স্টেজে নামবি, তার জন্যে তিরিশ?
একবার মানে? গানও গাইতে হবে।
বোধন নাক টানল। বোনকে ঈর্ষাও করছিল। তিরিশটা টাকা কত সহজে রোজগার করে চুয়া! তা তুই ফিরবি কেমন করে?
কী জানি। ভাড়া বাসেই ফেরার কথা। তবে বেশি রাত হয়ে গেলে আজ হয়তত ফেরাই হবে না।
বোধন অবাক হল। রাত্রে বাড়ি ফিরবে না চুয়া! আশ্চর্য। মা কি তা হলে আস্ত রাখবে। চুয়ার সাহস দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। মা ওকে আস্কারা দিচ্ছে বেশি।
সুমতির সাড়া পাওয়া গেল।
চুয়া চিরুনি মাথায় খুঁজে বেরিয়ে গেল। বোধ হয় সুমতির চা ঢেলে দিতে।
বোধন দাঁড়িয়ে থাকল ঘরে। নিজের বিছানার দিকে চুয়া কিছু দিন হল তার এক ছবি টাঙিয়েছে। ছোট ছবি। সাজগোজ করে তোলা। মাথায় ফুল। এই ছবি চুয়ার থিয়েটারের ছবি। রীতিমতো ভালই দেখায় তাকে। ..কোন সিনেমার রঙিন কাগজে একবার ছবিও বেরিয়েছিল চুয়ার। চুয়া আর একটা ছেলে একসঙ্গে আছে, অভিনয়ের ছবি, চুয়া দাদাকে দেখিয়েছিল। দারুণ, তুই তো ফেমাস হয়ে যাচ্ছিস রে? কোথায় আর। বংশীদার জন্যেই ছবি। কত হাতে পায়ে ধরতে হয় একটা ছবি বার করার জন্যে।
