বোধন আগে বুঝতে না, এখন সে বুঝতে পারছে, চুয়া ধীরে ধীরে পায়ের তলায় মাটি করে নিচ্ছে। একদিন সে দাঁড়িয়ে যাবে। বোধন পারবে না।
দুঃখ এবং নিজের ওপর কেমন ঘেন্না হল বোধনের। সত্যিই সে অপদার্থ। নীলু তাকে বলেছিল, তুমি পয়সা রোজগার করতে চাও, আমি তোমায় চুরির রাস্তা শিখিয়ে দেব। …না, শেষ পর্যন্ত বোধনের বোধ হয় ওই রাস্তাতেই যেতে হবে।
চুয়া ঘরে এল। তার সময় তর তর করে চলে যাচ্ছে। বলল, কাপড়টা বদলে নিই।
বোধন ঘর ছেড়ে চলে এল। দরজা ভেজিয়ে দিল চুয়া।
সুমতি চা খেতে বসেছেন। আলগা, এলোমেলো, মিলের শাড়ি। ময়লা। সুমতির পা দুটো ছড়ানো। শাড়িটা বোধ হয় খাটো হয়ে গিয়েছে। চোখ-মুখ ফোলা, চোখ ছলছল করছে, মুখময় অবসাদ। মাথার চুল উস্কোখুস্কো, কপালের কাছে অজস্র পাকা চুল। সুমতি এখনও হাই তুলছিলেন।
শিবশংকর মাঝে মাঝে স্ত্রীর দিকে তাকাচ্ছেন, কিছু যেন বলতে চান, বলতে পারছেন না। চোখ নামিয়ে নিচ্ছেন।
ছেলের দিকে তাকালেন সুমতি। রোজ রাত্তিরে এত হইহই কীসের হয়?
সুমতি এমনভাবে বললেন যেন বোধনই হইহই করে বেড়ায়।
নিজের বাড়িতে শুয়ে রাত্তিরে চোখ বোজার উপায় নেই! কী ছোটলোকের জায়গা।
বোধন নিচু গলায় বলল, রেল লাইনের দিকে হবে বোধ হয়।
যে লাইনের দিকে হোক, আমার তাতে কী? ঘরে বাইরে কোথাও এক ফোঁটা শান্তিতে থাকার উপায় রাখল না। যত রাজ্যের গুণ্ডা বদমাশের রাজত্ব হয়ে গিয়েছে।
শিবশংকর বললেন, পুলিশ আজকাল কিছু করে না। পড়ে পড়ে ঘুমোয়।
তোমার মতন সব– সুমতি স্বামীর দিকে বিতৃষ্ণার চোখে তাকালেন, খায় দায় নাক ডাকিয়ে ঘুমোয়। আবার একবার হাই তুলে চা মুখে দিলেন, বিস্বাদের মুখ করলেন, চা না গঙ্গাজল!
বোধন চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। মা টাকা দিলে সে বাজারে যাবে। বাইরে যেতে পারলে রোদটাও গায়ে লাগানো যায়। সকালের দিকে এই বাড়িটা বড় ঠাণ্ডা, কনকনে। মার কিন্তু শীত নেই। গায়ে একটা সুতির চাদরও মা সকালে জড়াবে না। শিবশংকর আবার কিছু বলার চেষ্টা করেও থেমে গেলেন। একটু আগেই ধমক শুনেছেন স্ত্রীর।
নিজের হাতে না করলে কোনও জিনিস মুখে ভোলা যায় না– সুমতি বললেন, সবই দায়সারা।
বোধন বলল, আজ বাজার…
বাজারে না গেলে গিলবে কী? যাও আমার ব্যাগটা নিয়ে এসো।
বোধন মার ব্যাগ আনতে ঘরে গেল।
ফিরে এসে দেখল, চুয়া সেজেগুজে বাইরে এসেছে। হাতে একটা মেয়েলি ব্যাগ। চুয়াকে বেশ দেখাচ্ছিল। মাথার চুল এলো। চোখে বোধ হয় কাজল দিয়েছে। মুখে পাতলা করে পাউডার মাখা। বড় বড় ফুলকাটা ছাপা শাড়ি। নাইলন নাইলন দেখাচ্ছে। গায়ে চাদর।
চুয়া পায়ের দিকের কাপড় টেনে গুছিয়ে নিল। নিয়ে সুমতির দিকে তাকাল। আমি যাচ্ছি। দেরি হয়ে গেল। বলে শিবশংকরের দিকে তাকাল। কই, দাও?
শিবশংকর কেমন জড়সড় হয়ে সংকোচের ভাব করলেন। মেয়ের মুখ থেকে চোখ সরিয়ে স্ত্রীর দিকে, আবার মেয়ের দিকে তাকালেন।
চুয়া বলল, কী হল?
শিবশংকর আরও আড়ষ্ট হয়ে গেলেন। অপ্রস্তুত। থুতনির কাছে দাড়ি চুলকোলেন। অস্বস্তি বোধ করছিলেন। স্ত্রীর দিকে তাকালেন। তাকিয়েই আবার চোখ সরিয়ে নিলেন। গলায় কেমন এক শব্দ হল চাপা।
কী, দেবে না? চুয়ার মুখ বিরক্ত হয়ে উঠল, চোখ রুক্ষ।
আজ হল না, বিব্রত গলায় শিবশংকর বললেন।
হল না? বাঃ! চুয়ার চোখ নাক কুঁচকে, মুখ বিশ্রী হয়ে উঠল।
শিবশংকর হাতে-পায়ে ধরার মতন করে বললেন, তুই আজ চালিয়ে নে। পরে দেব…
সুমতি প্রথমে স্বামী তারপর মেয়ের দিকে তাকালেন। কী, হয়েছে কী?
বাবা আমার টাকা নিয়েছে, বলেছিল দেব, দিচ্ছে না। চুয়া ভীষণ রেগে গিয়েছিল।
টাকা? কেন? কীসের জন্যে? সুমতি বললেন।
আমি কেমন করে জানব। চুয়া রুক্ষভাবে বলল, আমি তখনই বললাম, দু একটা টাকা নিয়েই তুমি ফেরত দাও না কোনওদিন, দশ টাকা তুমি ফেরত দিতে পারবে না। আমি দিচ্ছিলামই না। তখন আমায় খোসামোদ করে টাকা নিল। বলল, তোর মার কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে ফেরত দেব।
সুমতি স্বামীর দিকে তাকালেন। তুমি টাকা নিয়েছিলে?
অসহায়ের মতন মাথা নাড়লেন শিবশংকর।
কেন? কীসের জন্যে তুমি ওর কাছ থেকে টাকা নিয়েছ? দশ-দশটা টাকা?
শিবশংকর চুপ। সমস্ত মুখ লজ্জায়, সংকোচে, অপমানে দীন, করুণ দেখাচ্ছিল।
সুমতির গলা ভীষণ চড়ে গিয়েছিল, মুখও লালচে। তোমার কীসের টাকার দরকার হল? নেশাভাঙের জন্যে? বেঁটা মারি তোমার অমন নেশার মুখে। বসে বসে আর কিছু করতে পারো না, শুধু নেশা? এতগুলো টাকার নেশা…
শিবশংকর কিছু বলার চেষ্টা করেও পারলেন না।
চুয়া বলল, আমার কাছে একেবারে টাকা নেই। পরশু থেকে বলছি, আমার টাকা ফেরত দাও। রোজ বলে, কাল দেব, কাল দেব। এখন আমি কী করব? আমি বাইরে যাচ্ছি, টাকা আমার চাই।
সুমতি চিৎকার করে আবার বললেন, কেন তুমি টাকা নিয়েছিলে, বলো? বোবা হয়ে থাকবে না। বলল, কেন নিয়েছিলে?
কেন আর নেবে? চুয়া ঘেন্নার গলায় বলল, ওই যে কাগজ আনায়, ক্রস ওয়ার্ড, সেগুলো পাঠায়।
ও! ওই ছাইভস্ম। ওরা টাকা নিয়ে বসে আছে তোমার জন্যে। কী নির্লজ্জ বেহায়া তুমি? পেটে ভাত জোটে না, পেছনে কাপড় নেই, টাকা খরচা করে তুমি জুয়া খেল। ছি ছি, গলায় দড়ি তোমার।
চুয়া টাকা পাবে না বুঝে নিয়ে বিশ্রীভাবে বাবাকে বলল, আর তুমি কখনও আমার কাছে টাকা চাইবে না। মিথ্যুক কোথাকার। টাকা নেবার সময় খুকি খুকি। ফেরত দেবার সময় মাকে দেখাও। ফেরত দেবার মুরোদ নেই টাকা নাও কেন? খালি ধাপ্পাবাজি।
