বিনুর মা বোধনের উপকার নাকি জীবনে কোনওদিন ভুলবেন না বলেছেন। বলেছেন, বিনুর বিয়েটা চুকে যেতে দাও, আমি তোমার চাকরি করিয়ে দেবই দেব। ওকে দিতেই হবে।
বিনুর ব্যাপারটা চুকে যাক। বোধনও আশা করছে, বিয়েটা হয়ে গেলে বিনুর মার ঝাট মিটে যাবে। তখন উনি মন দিতে পারবেন।
বিনু অবশ্য বেশ একটা মজার কথা বলছিল সেদিন। বিনু বলছিল: বোধনদা, তুমি বরং দিল্লিতে চলে যেয়ো। আমি! কেন? আমি রাজুকে বলে তোমার চাকরি জোগাড় করে দেব। আমাদের সঙ্গে থাকবে। শুনে বোধনের ভাল লাগলেও সে হেসে ফেলেছিল: দিল্লি গেলে আমার কেমন করে চলবে বিনু! আমার বাবা খোঁড়া, মার শরীর ভেঙে গেছে। বোনের বিয়ে হয়নি। তা ঠিক, তা ঠিক.বিনু দুঃখের মুখ করল।
কথাগুলো বোধন উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করল। স্বপ্নটা দেখার কোনও মানে হয় না। বিনুর বিয়ের এখনও আট দশ দিন বাকি। বিনুর মার সঙ্গে সোনার দোকানেও যাওয়া হয়নি এখনও। আগামী পরশু যাবার কথা। শুক্রবারে। বিকেলে। শুক্রবার বিনুর কাকার ফিরতে দেরি হয় বলেই বোধ হয় মাসিমা দিনটা বেছেছেন। বোধনের কোনও অসুবিধে নেই। তার কাছে সব দিনই সমান।
একটা ব্যাপার বোধন এই কদিনে পরিষ্কার বুঝতে পেরেছে বিনুর মা আর বিনুর কথাবার্তা থেকে। টাকা পয়সার ব্যাপারে বিনুর কাকা কাঁচাখোলা নয়। বিনুর জন্যে হাজার হাজার টাকা খরচ করতে নিজে নারাজ। বিনুর মাকেও করতে দিতে চান না। বিনুর মা কিন্তু যতটা পারেন করবেন, বিনুর কাকার টাকার মুখ চেয়ে তিনি বসে নেই, বসে থাকবেন না। তা ছাড়া বিনুর মার ইচ্ছে নয়–খাওয়া-দাওয়ার খরচটা ছাড়া বিনুর কাকার টাকায় এই বিয়ের কিছু হয়। কাকা লোকটা বোধ হয় বেশ হিসেবি। নিজের ভবিষ্যৎ ভাল বোঝেন।
পরের সংসারের হাঁড়ির সব খবর জানা সম্ভব নয়। বোধনও জানে না। তবে, দেখেশুনে তার মনে হচ্ছে, বিনুর ব্যবস্থা করে দেবার পর তার মা আর কাকায় একটা গণ্ডগোলও লেগে যেতে পারে। কিংবা চোখের সামনে থেকে মেয়ে সরে গেলে বিনুর মা আরও খোলাখুলিভাবে কাকাকে নিয়ে সংসারে থাকতে পারবে।
অন্যের কথা ভেবে আর লাভ কী! ভাঙা ঘুম আবার জোড়া লাগাবার আশায় বোধন কম্বলটা প্রায় মাথা পর্যন্ত টেনে নিল, কান ঢাকা থাকলে শীতও কম লাগে।
সমস্ত বাড়ি নিস্তব্ধ। হাউসিংও। কোথাও কিছু ডাকছে না। শব্দ হচ্ছে না। এক আধবার দূরের রেল লাইন দিয়ে গাড়ি চলে যাবার শব্দ। নিশ্চয় মালগাড়ি। এখন কোনও লোকাল ট্রেন চলে না।
ভাঙা ঘুম জোড়া লাগছিল না। মা বাবা তাদের ঘুরে ঘুমোচ্ছে। চুয়া তার ঘরে। বোধনের এই শোবার জায়গাটাতে ইঁদুর ছুটছে, আরশোলার দল বাথরুম ভরতি করে রেখেছে। এই ভাবে শুয়ে থাকতে বড় কষ্ট হয়। ক্যাম্প খাটটায় নড়াচড়ার জায়গা নেই। শুয়ে শুয়ে অনেকটা ঝুলে গিয়েছে। মাকে বলবে বোধন। আর-একটা ক্যাম্প খাট তাকে কিনতেই হবে। এভাবে শোয়া যায়! ঝোলা ক্যাম্প খাট, ছেঁড়া শক্ত বালিশ, চাদর বলতে চিট এক টুকরো কাপড়।
এক এক সময়, বোধনের মনে হয়, আকাশ থেকে ঝপ করে পড়ার মতন কিছু টাকা তাদের এই বাড়ির মধ্যে পড়ে গেলে বেশ হয়। এটা এমন কী অসম্ভব! একবার একটা লটারি লেগে গেলেই তারা লাখোপতি। প্রতি হপ্তায়, প্রতি মাসে কেউ না কেউ তো লটারির টাকা পাচ্ছেই–হয় এখানকার, না-হয় ভুটান পাঞ্জাব বিহার কোথাও না কোথাওকার। বাবা লটারির টিকিট মাঝে মাঝে আনায় নীচের তলার পালবাবুকে দিয়ে। একবার কেন একটা লাগছে না? বেশ, লটারি না লাগুক বাবা যে ক্রসওয়ার্ড করে তার একটা লেগে যাক, তাতেও তো পঁচিশ ত্রিশ হাজার।
বোধনদের কপালে একটা কিছু লাগুক। একবারের জন্যে। তাদের সারা সংসারটা এমন ভাবে গরিব, দীন, হতশ্রী হয়ে গিয়েছে যে আর পারা যাচ্ছে না। ছেঁড়াখোঁড়া তোশকের তুলোর মত সব কালচে, ময়লা। চারদিকে এই তুলো ছড়িয়ে আছে, ঘরে, বিছানায়, মেঝেতে টেবিলে রান্নাঘরে বাথরুমে এমনকী তাদের প্রত্যেকের গায়ে মাথায়। এভাবে আর বাঁচা যায় না। শরীরের রক্ত জল হয়ে গেলে যেমন সবই ফ্যাকাশে, খড়িওঠা, নিষ্প্রাণ হয়ে থাকে, এই সংসারের সবই সেই রকম– বিশ্রী, কুৎসিত, নোংরা। টাকার জন্যে যেন দেওয়ালগুলো পর্যন্ত স্যাঁতসেতে, ঠাণ্ডা, কালচে হয়ে গিয়েছে, বিছানাপত্র, দুর্গন্ধে আর উকুনে ভরেছে, ভাঁড়ার খাঁ খাঁ করছে, মেঝে মরার মতন পড়ে আছে।
টাকা টাকা করে তাদের এই ছটফটানি কবে মিটবে? এ-জীবনে, না, পরের জন্মে? নাকি কোনওদিনই মিটবে না!
বোধন আবার সোজা হয়ে শুল। ঘুম আসছে না। এখন কত রাত? দুইনা আড়াই? তিন চারও হতে পারে। কিছু বোঝা যায় না। শুধু অন্ধকার ঝুলে আছে চারপাশে।
আচ্ছা, বোধনের হঠাৎ মনে হল, এই সব ছেড়েছুঁড়ে বিনুর সঙ্গে দিল্লি চলে গেলে কেমন হয়। কিন্তু তো নিয়ে যেতেই চাইছে। দিল্লি যেমন-তেমন জায়গা নয়। রাজধানী। সেখানে সত্যি সত্যি কিছু জুটে যেতে তো পারে। তাদের এক বন্ধু ফটিক তো দিল্লি গিয়ে গুছিয়ে ফেলেছে বলে শোনা যায়।
বোধনও চলে যেতে পারত। কলকাতায় তার কিছু হবে না। কিন্তু কেমন করে যাবে? বাবা বেচারি পঙ্গু, অক্ষম অথর্ব। মা দিন দিন কেমন অসুস্থ হয়ে পড়ছে। জলেভরা ফোলা শরীর, সারা গায়ে খড়ি উঠছে, সাদা নি-রক্ত চেহারা, অনবরত হাঁফায়, হাঁ করে নিশ্বাস নেয়। মার দুচোখের তলায় কালি, ঠোঁট সাদা, দাঁতের মাড়ি ভরতি রক্ত।
