বাথরুমে গিয়ে বোধন হাতে মুখে জল দিল। কনকনে ঠাণ্ডা। ফিরে আসার সময় আবার বাবাকে দেখল। কাছেই কার গামছা ঝুলছে। টেনে নিয়ে মুখ মুছল। পা। ঘরে মা চুপচাপ। বাইরে বাবাও বোবা হয়ে বসে মাথার চুল ছিঁড়ছে। বাবার এই এক মুদ্রাদোষ, যখন কিছু ভাবে তখন মাথার চুল ছেড়ে বাবা কী ভাবছে বোধন অনুমান করতে পারল: চিঠির কথা, কাল আবার চিঠি লিখতে হবে মাধুদিকে, বাবার নিশ্চয় মনে লাগছে। ক্ষোভ ও দুঃখ হচ্ছে।
বোধনের মনে হল, বাবাকে কিছু বলা দরকার, যাতে ব্যাপারটা সহজ করে নিতে পারে। অক্ষমতায় দুঃখ পাবার কারণ নেই। তারা অক্ষম। নিজেরাই দুবেলা দুটো মুখে গুঁজে, কোনও রকমে মাথা বাঁচিয়ে বেঁচে আছে। এখানে আত্মীয়তা দেখাবার উপায় নেই। মা খারাপ কিছু বলেনি।
বোধন একবার মার ঘরের দরজার দিকে তাকাল, তারপর বাবার কাছাকাছি এসে নিচু গলায় বলল, আমি লিখে দেব না হয়।
শিবশংকর ছেলের মুখের দিকে তাকালেন। তারপর হঠাৎ বললেন, না, আমিই লিখে দেব। পাপ যখন আমি করেছি তখন…
ব্যাপারটা তুমি বুঝছ না। একটা লোক এসে থাকা বড় কথা নয়, কিন্তু তাকে রাখা, দেখাশোনা করা…
আমি বুঝছি। তুমি আমায় বোঝাতে এসোনা। …তোমার মা শোধ নিতে চাইছে।
সুমতি একেবারে ঘরের দরজার সামনে। শুনতে পেয়েছেন।
বোধন মাকে দেখেই সরে যাবার চেষ্টা করল।
কী বললে। শোধ নিচ্ছি! …হ্যাঁ, তাই নিচ্ছি। বলতে বলতে এগিয়ে এলেন সুমতি। রাগে কাঁপছেন। চোখ খেপার মতন। জ্বালা আর ঘৃণা। গলার স্বর কর্কশ। কেন শোধ নেব না? তোমাদের সকলের ওপর আমি শোধ নেব। তোমরা ছোটলোক, ইতর, শয়তান। আমায় তোমরা কম পিষেছ? তোমার মা, তোমার বোন, তুমি–কেউ আমায় ছাড়োনি!
বোধন একটু তফাতে সরে গল। শিবশংকর ভয়ে কাঠ।
শোনো, এই আমি তোমায় বলে রাখছি বলে সুমতি যেন স্বামীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন, সারাটা জীবন আমি শুধু জ্বলেছি। আমাকে তোমরা পুড়িয়েছ ছ্যাঁকা দিয়ে দিয়ে। তোমার মা বলত, আমি ছোটলোকের বাড়ি থেকে এসেছি, তোমার বোন বলত–আমার স্বভাব দোষ আছে…
থাক না, ওরা তো স্বর্গে গেছে
স্বর্গে! স্বর্গে যাবার মানুষ। নরকে গিয়েছে।
আমি তোমার কাছে মাপ চাইছি শিবশংকর জোড় হাত করলেন।
না, কীসের মাপ! তোমরা আমার হাড় মাংস রক্ত সব নিয়েছ, আমার ছেলেমেয়েকেও। একটা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেশ্যা হয়েছে, আর-একটা নেচে বেড়াচ্ছে বাইরে–সেটাও যাবে। আমি কিছু বুঝি না। আর ওই আর-এক হারামজাদা, খাচ্ছে-দাচ্ছে ডেংডেঙিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মেয়েমানুষের অধম। …আমি যেদিন চিতেয় উঠব, বুঝতে পারবে। মানুষটার জন্যে এক মণ কাঠও লাগবে না। হুস হুস করে পুড়ে যাব।
মার চোখ-মুখ দেখে বোধনের ভয় করছিল। মাথায় রক্ত চড়ে মুখ লাল হয়ে গিয়েছে।
.
১৪.
বিনুর মা পাঁচ ছটা একশো টাকার নোট বোধনের হাতে গুঁজে দিলেন। বোধন অবাক। কিছু বলতে যাচ্ছিল, ইশারায় বারণ করলেন বিনুর মা। ট্যাক্সি পাড়ায় ঢুকছে। একটু পরেই বাড়িতে পৌঁছে গেল। নেমে ভাড়া মিটিয়ে বিনুর মা সদরে দাঁড়ালেন। হাতে কালো ব্যাগ। পাশে বোধন! বিনুর মা বললেন, টাকাটা তোমার কাছে রেখে দাও। কখন কে কী চায় আমার বার বার টাকা বের করতে বিরক্ত লাগে। তুমিই দিয়ে দিয়ো। এতগুলো টাকা কাছে রাখতে বোধনের ভয় করছিল। যদি হারিয়ে যায়। মেরে নেয় কেউ! কিছু বলতে যাচ্ছিল বোধন, সদর খোলার শব্দ হল, বিনুর মা ফিসফিস করে বললেন, কাউকে কিছু বলতে হবে না। পরে হিসেব দিয়ো। দরজা খুলল বিনু। বিনুর মা কোলের কাছে ব্যাগ ধরে ভেতরে ঢুকলেন। বোধন জানে, ব্যাগে ন হাজারের বেশি টাকা আছে। সোনার দোকান থেকে পেয়েছেন বিনুর মা। বোধন ভেতরে পা বাড়াচ্ছিল, হঠাৎ কী জড়িয়ে গেল।
ঘুম ভেঙে গেল বোধনের। মশারির সঙ্গে পা জড়িয়ে গিয়েছে। সরু ক্যাম্প খাটের একপাশে পা ঝুলে গিয়েছে। কয়েক মুহূর্তে বোধন তেমন হুঁশ করতে পারল না। তারপর বুঝল, সে স্বপ্ন দেখছিল। তার হাতে বিনুর মা টাকা গুঁজে দেননি।
চোখ চেয়ে বোধন একবার যেন সব দেখতে চাইল। কিছুই দেখা যায় না। ঘুটঘুট করছে অন্ধকার। মশারির চাল ঝুলে আছে চোখের ওপর। শীত করছিল। একটা পুরনো ভুট কম্বলের তলায় ময়লা কাঁথা দিয়ে বোধন শোয়। এতে শীত যায় না। যদিও চারদিকে সব বন্ধ। উত্তরের জানলাটাও। আর এও আচ্ছা শীত চলেছে কলকাতায়। কমেই না।
বোধন একবার ভাবল, বাথরুমে যাবে। পরের মুহূর্তে ভাবল, দূর–কে আবার বাথরুমে যায়। একবার বাইরে বেরুলেই শীত গায়ের লোম খাড়া করে দেবে, মশা ঢুকবে শয়ে শয়ে। কাঁথা কম্বল আরও টেনে-টুনে বোধন আস্তে আস্তে করে পাশ ফিরল। জোরে পাশ ফিরলেই ক্যাম্প খাট উলটে যাবে।
তা স্বপ্নটা মন্দ নয়। হাতের মুঠোয় পাঁচ ছশো টাকা এলে ভালই লাগে। পরের টাকা হলেও। বোধন ইচ্ছে করলেই কিছু সরিয়ে ফেলতে পারত। পঞ্চাশ, একশো, দুশো। কে দেখতে যাচ্ছে। বিনুর মা অত দেখতে চাইবেন না। চাইলেও বোধন ম্যানেজ করতে পারত। অবশ্য সে কিছুই করত না। টাকাটা সত্যি সত্যি হাতে থাকলেও, বড় জোর দু চার প্যাকেট সিগারেট উড়ত, চা চলত। তার বেশি কিছু নয়। বিনুর মা বোধনকে বিশ্বাস করেন। যদি অবিশ্বাসের কাজ করতে হত তবে বোধন পুরো ন হাজার সাড়ে ন হাজার টাকা মারতে পারত। সোনা বিক্রির কোনও রসিদ কেউ রাখেনি। মারলে কে ধরত!
