বাবা মুখ নিচু করে গাল চুলকোচ্ছে। ভরতি দাড়ি।
তুমি হচ্ছ পাকা শয়তান। বোবা সেজে বসে থাকো। বসে বসে শয়তানি করো।
বোধন কিছুই বুঝতে পারছিল না। কী নিয়ে আজ শুরু হয়েছে সে জানে না। অবশ্য হবার কোনও বিশেষ কারণ মার থাকে না, যে কোনও সময়ে অকারণেও শুরু হতে পারে। মার মরজি।
শিবশংকর বললেন, একেবারে নিচু গলায়, আমি কথা বলে কী করব?
কেন, তোমার মুখ নেই? খাবার সময় মুখ হাঁ করতে পারো কথা বলার সময় পারো না। ন্যাকামি!
শিবশংকর চুপ।
সুমতি স্বামীর কাছাকাছি গিয়ে ঝুঁকে পড়লেন। কেন তুমি ওকে চিঠি লিখেছিলে?
কেমন যেন অসহ্য হল শিবশংকরের। বললেন, আমি তোমায় হাজার বার বলছি, চিঠি আগে আমি লিখিনি।
লেখোনি তো সে আসতে চাইছে কেন?
বোধনের বুক ধক করে উঠল। দিদি নাকি? দিদির চিঠি? বাবা কি দিদিকে চিঠি লিখেছে? কেন? ঠিকানা পেল কোত্থেকে? তা হলে দিদির সম্পর্কে নীলু যা বলেছে তা সত্যি নয়? দিদি যদি অতই খারাপ হয়ে গিয়ে থাকবে বাবা নিশ্চয় তাকে চিঠি লিখত না।
তুমি, শিবশংকর বললেন, ভেবেচিন্তে কথা বললে আমায় দোষ দিতে না। কী হয়েছে সবই তুমি জান। মাধু আমায় যে চিঠি লিখেছিল তাতে তোমারও চিঠি ছিল। সে লিখেছিল, বছর খানেক ধরে ভুগছে। ওখানকার ডাক্তার কিছু করতে পারছে না, ধরতেও পারছে না। একবার কলকাতায় এসে হাসপাতালে গিয়ে বড় ডাক্তার দেখাতে চায়। …তা তুমি আমায় বললে, জবাব লিখে দিতে। আমি লিখে দিয়েছি। এতে দোষের কী করেছি?
বাজে কথা বোলো না, একেবারে বাজে কথা বলবে না, সুমতি হাত তুলে আঙুল নাড়তে লাগলেন শাসনের ভঙ্গিতে, আমি তোমায় বলিনি তোমার ভাগ্নিকে নেমন্তন্ন করে ডেকে আনন। বলেছি?
না, তা বলোনি, তবে…
তবে-টবে নয়। আমি বলিনি, তবু তুমি সোহাগ করে ডাকতে গিয়েছ। নিজের পাছায় কাপড় নেই–শঙ্করাকে ডাকে। কেন তাকে তুমি ডাকবে?
বোধন ঘরের দিকে চলে গেল। হয়তো তাকে মা বাবা কেউ দেখেনি। যাক, দিদি নয়, মাধুদি মানে পিসিমার মেয়ে।
ঘর থেকে বোধন বাবার কথা শুনছিল।
আমি আর কী করতে পারি! তুমি তো বলে দাওনি যে আসতে বারণ করে লিখে দাও। সম্পর্কে ভাগ্নি, পুষ্প কবে মারা গিয়েছে। না লিখতে পারলাম না। লজ্জা করল।
লজ্জা করল! আহা কী আমার লজ্জা পাবার মানুষ! সুমতি স্বামীকে ভেঙিয়ে বললেন, তোমার ভাগ্নির বেলায় লজ্জা, আর নিজের মাগের বেলায় লজ্জাও নেই, মায়াও নেই। সে মরুক। মুখে রক্ত তুলে মরুক। তুমি বাঁচো। আমিও বাঁচি৷।
শিবশংকর কোনও জবাব দিলেন না।
সুমতি বোধ হয় আবার ঘরে চলে গেলেন।
বোধন এতক্ষণে ব্যাপারটা অনুমান করতে পারছিল। মাধুদি কলকাতায় আসার জন্যে বাবা-মাকে চিঠি লিখেছিল। মা বাবাকেই জবাব দিয়ে দিতে বলেছিল। বাবা বেচারি ভাগ্নিকে আসতেই লিখেছে। হয়তো সেই চিঠির জবাব এসেছে আজ। বাবা মাকে বলেছে। তারপর ওই নিয়ে বেধে গেছে।
বাবা কাজটা ভাল করেনি। নিজের ভাগ্নি ডাক্তার দেখাতে আসতে চাইলে না করা যায় না। ঠিক, বাবা সেদিক থেকে ঠিকই। কিন্তু এই বাড়িতে মাধুদি এসে কোথায় থাকবে। জায়গা নেই এক ফোঁটাও। এমন কী মাধুদিকে শুতে দেওয়াও যাবে না। রোগী লোক, সঙ্গে বাচ্চা থাকবে, আর যদি মাধুদির স্বামী থাকে তবে তো হয়েই গেল। বাবা ভুল করেছে। দোষ নেই বাবার। তবু ভুল।
আবার মার পায়ের শব্দ শুনতে পেল বোধন। মুখে কথা নেই। রান্নাঘরে গেল বোধ হয়। ডাল পোড়ার গন্ধ আসছে। সারাদিন খেটেখুটে এসে মা আর রান্নায় মন বসাতে পারে না, শরীরেও কুলোয়, তখন সেদ্ধ ডাল নামিয়ে তার মধ্যে কাঁচা লঙ্কা পিয়াজ, এক মুঠো কড়াইশুটি দিয়ে দেয়। আর বেগুনপোড়া। কিংবা আলু ফুলকপির ঘেঁট। আবার কী! এই যথেষ্ট।
বোধন আবার মার গলা পেল। রান্নাঘর থেকেই চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছে।
তুমি কালকেই লিখে দাও, এখানে এসে উঠতে হবে না।
একটু চুপ।
কী সাড়া নেই যে–? আবার বোবা?
দেব। লিখে দেব।
হ্যাঁ, তাই দেবে। …আমার নাম করে লিখবে না। তোমার নামে লিখবে।
শিবশংকরের সাড়া পাওয়া গেল না।
বোধন এতক্ষণ ঘরে আলো জ্বালায়নি। জ্বালাবে কিনা ভাবছিল।
সুমতি আবার কথা বলছেন। রান্নাঘর থেকেই। আমি কেন তোমার ভাগ্নির দায় অদায় দেখব। আমার যখন মাথার ঘায়ে পাগল হবার জোগাড় হয়েছিল–তখন কেউ দেখেছিল আমায়। ওই তোমার বোনও কি দেখেছিল? নাকি তোমার সোহাগের ভাগ্নি একটা চিঠি লিখেছিল। …আমি কিছু ভুলিনি, সব মনে করে রেখেছি। তোমার বোন আমার সংসারে আমার গতরে বসে খেয়েছে আর ন্যাকামি করে ফিট হয়েছে। তার মার কাছে গুজগুজ করত। আমায় একটা ভাল শাড়ি পরতে দেখলে খুঁটত। আবার ঠোরও দিত কত: তুমি তো দেখতে ভাল, তাই বুঝি বাসন্তী রং পরো….আমি কি বুঝতাম না কিছু। আমি দেখতে ভাল তাতে ওর গায়ে জ্বালা ধরত। স্বার্থপর বদমায়েস, পাজির দল…।
শিবশংকর বললেন, এই একঘেয়ে পুরনো কথাগুলো কেন তুমি বলো! আমি কাল চিঠি লিখে দেব।
বাইরে এসেছেন সুমতি। হ্যাঁ দেবে। স্পষ্ট করে লিখে দেবে, আমরা কোনও ঝক্কি নিতে পারব না। এখানে জায়গা নেই।
বোধন বাতি জ্বালাল। প্যান্টটা ছাড়ছিল।
সুমতির পায়ের শব্দে মনে হল ঘরে চলে গিয়েছেন।
বোধন প্যান্ট ছেড়ে লুঙ্গি পরে ঘরের বাইরে এল। হাত পা ধোবে। বাথরুমে যাবার সময় দেখল, বাবা ছাদের দিকে মুখ করে অন্ধকার দেখছে। বাবার গায়ে সেই অদ্ভুত চাদর।
