কোথায় কী ভেবেছিল, আর কী হল। দিদি পালিয়ে গেল। শুধু পালিয়েই গেল না, এখন সে অন্য রাস্তায় চলে গেছে। বদ্যিনাথ কোথায়? মারা গিয়েছে নাকি? না, দিদি বদ্যিনাথকে ছেড়ে চলে এসেছে? দিদির সেই ছেলেটারই বা কী হল? আচ্ছা, নীলু বাজে কথা বলেনি তো? বোধনকে ঘা দেবার জন্যে? না, নীলু তেমন মেয়ে নয়। কী দরকার তার মিথ্যে কথা বলে।
বোধন দিদির কথা কাউকে বলেনি। বলা যায় না। মা কিংবা বাবা একথা শুনলে কানে আঙুল দেবে। বোধনেরও কেমন কান মুখ গরম হয়ে ওঠে কথাটা মনে পড়লে। ছি ছি। ছি ছি! তার দিদি প্রস্টিটিউট। ছিছি। মাথা তোলার আর কিছু রাখল না দিদি।
হাউসিংয়ের মধ্যে ঢুকতেই স্কুটার-চাপা দুটি ছেলেকে দেখতে পেল বোধন। ফুল স্লিভ পুল ওভার। মাথায় গরম নাইট ক্যাপ। কাকে যেন খুঁজছে।
বোধনকে দেখতে পেয়ে দাড়িঅলা ছেলেটি বলল, এই যে দাদা, আমাদের একটু হেল্প করবেন?
দাঁড়াল বোধন। তাকাল।
অৰ্চনা চৌধুরী কত নম্বর ফ্ল্যাটে থাকে? যাদের দেখতে পাচ্ছি জিজ্ঞেস করছি বলতে পারছে না?
বোধন বুঝতে পারল। চুয়াকে খুঁজছে। নিশ্চয় থিয়েটারের ছেলে। বোধন বলতে যাচ্ছিল, ডেকে দিচ্ছি, হঠাৎ কী ভেবে বলল, অর্চনা…! মানে যে থিয়েটার করে?
হ্যাঁ হ্যাঁ। রাইট।
ওই যে ওই বাঁদিকের ব্লকের সেকেন্ড এনট্রেন্স…দোতলায়।
থ্যাঙ্ক ইউ, দাদা।
বোধন ইচ্ছে করেই অন্য ফ্ল্যাটের দিকে চলে গেল। ছেলে দুটোকে সে সঙ্গে করে বাড়ি নিয়ে গিয়েই বা কী করত! ঘরে ডেকে বসতে দিতে পারত না। বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখতে হত। সেটা বিশ্রী। চুয়া বুঝুক কী করবে।
মানিকদের ব্লকের দিকে সরে গিয়ে আড়ালে দাঁড়াল বোধন, ফাঁকায় নয়, এনট্রেন্সের তলায়। চুয়ার জন্যে বাড়ি বয়ে লোক আসে খুঁজতে। থিয়েটারের লোক। চুয়া কি খুব নাম করে ফেলেছে! এরা কোন ক্লাবের ছেলে? কোন অফিসের? যাক, চুয়ার কিছু একটা হল। মেয়েদের একটু আধটু গুণ থাকলে হয়ে যায় কিছু। কিন্তু ছেলে দুটোকে বলিহারি! এই শীতের মধ্যে স্কুটার চালিয়ে চুয়াকে খুঁজতে এসেছে। তা ছাড়া, দুটোই বোকা, গাধা। পাড়ায় ঢোকার মুখে তারা কি থমথমে ভাবটা বুঝতে পারেনি? রজনী ভার্সেস শান্তদের লড়াই চলছে। ও-দিককার রাস্তার বাতি-টাতি নিবোনো থাকে, দোকানপত্রও প্রায় বন্ধ হয়ে যায় রাত হলে। লোকজন ভয়ে ভয়ে চলাফেরা করে। কালও বোমাবাজি করেছে দু দলে। বেপাড়ার ছেলে রাত্রে এসেছে, ফেঁসে না যায়। বোধনের উচিত ছিল সাবধান করে দেওয়া।
আরও খানিক দাঁড়িয়ে বোধন নিজের বাড়ির দিকে চলল।
মোটাসোটা ছেলেটা স্কুটার নিয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুকছে। দাড়িঅলা এইমাত্র নেমে এসে বন্ধুর কাছে দাঁড়াল।
ওরা কী বলছে বোধন শুনতে পায়নি। কাছে আসতেই আবার চোখাচোখি।
কী, দেখা হল? বোধন জিজ্ঞেস করল।
ধ্যুৎ মশাই; কীসের দেখা! বাড়ির মধ্যে ফাটাফাটি হচ্ছে। কী চেল্লানি। দরজার কড়া নাড়ছি, শুনতেও পেল না। শেষে এক মহিলা বেরিয়ে এসে আমাকেই মারে আর কী।
অৰ্চনাকে পেলেন না?
না বাড়িতেই নেই বোধ হয়। কোথাও খেপ মারতে গিয়েছে। একটু প্রফেসন্যাল হয়ে গেলে এই সব মেয়েদের আর ধরা যায় নাকি! এই নিয়ে তিন দিন ধরার চেষ্টা করলাম। না পারি ওর ক্লাবে ধরতে, না পারি ওর শো-এর দিন ধরতে। …বাজে থার্ড ক্লাস মাল, বাজারে চলে গেল। স্কেয়ারসিটি মেকস ডিম্যান্ড। বন্যা হলে কুমডোর ফালির দাম চড়ে যায় জানেন তো, দাদা; এ হল তাই। আচ্ছা চলি, দাদা। ধন্যবাদ। চলো, নির্মল। …আগেই তোমায় বলেছিলাম ওর পিনুদাকে না ধরলে কি হবে না। যাও পিনুকে তেল মারো।
স্কুটারে স্টার্ট দিয়ে ছেলে দুটো চলে গেল। দাড়িঅলা দারুণ স্মার্ট। দাঁড়াবার সময় নাচে, কথা বলার সময় গলা ওঠায়। নাটুকে কায়দা। কিন্তু ওদের দু একটা কথা বোধনের ভাল লাগেনি। বাজে থার্ড ক্লাস মাল–মানে কী? কেন বলল কথাটা? পিনু কে? পিনু কি চুয়ার ক্লাবের কেউ? চুয়া গেলই বা কোথায়? আজ ওর বাইরে যাবার তোড়জোড় তো বোধন দেখে আসেনি। বোধ হয়, মার চেঁচামেচি শুনে অন্য কোথাও গিয়ে বসে আছে। মা একবার শুরু করলে তো থামে না, তখন বাড়িতে থাকা সত্যিই দায়। ছেলেটা বোধ হয় মার তাড়া খেয়েছে। তা খাক, কিন্তু অর্চনা চৌধুরীর মা কেমন তা জেনে গেল। ওদের বন্ধুবান্ধবদের কাছে গল্প করবে।
মার মেজাজ এখন গরম। বাড়ি না ঢুকতে পারলে ভাল হত। কিন্তু এই ঠাণ্ডায় বাইরে বাইরে কোথায় ঘুরে বেড়াবে বোধন। বড় শীত করছে।
দরজা খোলাই ছিল। ভেজানো ছিল। বোধন দরজা ঠেলতেই খুলে গেল।
ঘরের ভেতর থেকে গলা শোনা যাচ্ছিল মার। বাবা সেই নিজের জায়গাটিতে টেবিলে বসে। চেয়ারের পাশে দেওয়াল ঠেস দিয়ে ক্রাচ দাঁড় করানো। বাতি জ্বলছিল আজ।
বোধন চোরের মতন নিশব্দে চটি খুলে পাশের ঘরে ঢুকে পড়বে ভাবছিল, দেখল, মা ঘর থেকে বাইরে এল, দুহাতে শাড়ি গুটিয়ে হাঁটুর ওপর তুলেছে।
একদিন এই নো-ড়া নিয়ে আমি আমার কপালে ঠুকব। ঠুকে ঠুকে মরব। আর তোমাকেও আমি রেহাই দেব না। সে-মেয়ে আমি নই। ওই নোড়া তোমার কপালেও ঠুকব।
বোধন চুপ করে দাঁড়িয়ে। মা তাকে দেখেনি। বরং বোধন দেখছে, মা কেমন করে নিজের কপালে আর বাবার কপালে নোড়া ঠুকবে তার ভঙ্গিটা মা দেখাচ্ছিল।
