বোধন যেন কিছুই জানে না, বলল, কলকাতার ছেলে?
না। দিল্লির। আমাদের চেনাশোনা। বিনুর বাবারই এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের ছেলে। বন্ধুর ছেলেও বলতে পারো। ছেলেটি ভাল। বিনুকে বাচ্চা বয়েস থেকে দেখেছে। দুজনে ভাবসাব ছিল বরাবরই।
ও। আচ্ছা।
ছেলের তরফ থেকে তাড়া বেশি। ছেলের বাবার শরীর ভাল যাচ্ছে না। তিনি ব্যাপারটা ফেলে রাখতে চান না।
বোধন মাথা নাড়ল। যেন সবই বুঝতে পারছে।
অল্পক্ষণ চুপ করে থেকে অনুপমা বললেন, তোমায় কটা কাজ করে দিতে হবে।
বলুন?
বিনুর কাকাকে দিয়ে কোনও কাজ হয় না। ভরসাও করা যায় না। অফিস আর অফিস থেকে বেরিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ক্লাবে বসে তাস খেলা। কিছু বোঝে না। এক বললে আরেক করে বসবে। আমি সুকুমারকে বলেছি৷ আমায় একটা বাড়ি জোগাড় করে দিতে হবে, অন্তত চার পাঁচ দিনের জন্যে। দিল্লি থেকে ছেলের বাড়ির ছ সাতজন থাকবে এসে। তারপর ধরো বিয়ে-থার ব্যাপার। প্যান্ডেল, আলল, খাওয়া-দাওয়া বাজার ছোটাছুটি…। আমার তো সহায় বলতে কিছু নেই। তোমাকেই বলতে পারি! আর সুকুমার।
বোধন শুনল সব। বলল, আপনি ভাবছেন কেন। সুকুমারদাকে বলেছেন তো, সব হয়ে যাবে, আর আমি তো আছি।
অনুপমা যেন খুশি হলেন। আবার কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, বিনু এল। পাঁপড় ভাজা চা রাখল।
মেয়েকে দেখে অনুপমা যেন অস্বস্তি বোধ করলেন। আরও কিছু বলার আছে। বললেন, তোর কাকার খাবারটা করে রাখ না। আসার তো সময় হল।
বিনু চলে যেতে যেতে বলল, বোধনদা, যাবার আগে বলবে আমার দরকার আছে।
নাও, চা খাও, অনুপমা বললেন।
বোধন পাঁপড় ভাজা খেতে লাগল।
অন্যমনস্ক হয়ে অল্পক্ষণ বসে থাকলেন অনুপমা, তারপর বললেন, আর একটা কথা আছে, তুমি কাউকে বলবে না।
তাকাল বোধন। অবাক হচ্ছিল।
বলবে না?
ইতস্তত করে বোধন বলল, না।
আমার কিছু সোনাদানা আছে। বিনুর জন্যে ভেঙেচুরে গড়তে দিয়েছি। …আর কিছু আছে যা আমি বেচতে চাই। গলার স্বর একেবারে নেমে গেল অনুপমার। তোমাকে সঙ্গে নিয়ে আমি দোকানে যাব। একা যেতে পারি না। যাওয়া উচিত নয়।
বোধন আশ্চর্য হয়ে গেল। সোনা বেচতে তাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চান বিনুর মা। বোধন সোনাই চেনে না। তাদের বাড়িতে সোনা বলতে মার কানে কী একটা আছে একরত্তি, আর হাতের লোহাটা। মা সেই কবেকার সোনা দিয়ে বাঁধানো লোহাটা এখনও পরে আছে।
বোধন বলল, আমি তো সোনার দোকান চিনি না।
দোকান আমি চিনি। …আমার চেনা দোকান।
তা কাকাবাবু তো আছেন তিনি আপনার সঙ্গে…
না, অনুপমা মুখের কাছে আঙুল তুললেন, গলা আরও নামল, বিনুর কাকাকে কিছু জানাতে চাই না বলেই তোমায় বলছি। সে যেন কোনওদিন কিছু জানতে না পারে।
বোধন বোবা। কিছু বুঝছিল না। বিনুর মার চোখ সতর্ক। বোধনের দিকে তাকিয়ে আছেন।
বেশ, যাব।
অনুপমা নিশ্বাস ফেললেন, আমি তোমায় পরে জানাব।
কথা ঘুরিয়ে নিলেন অনুপমা, অন্য কথা তুললেন। দু চারটে এলোমেলো কথা বলে উঠলেন।
বোধনের চা খাওয়া শেষ হয়েছিল।
বিনুকে ডেকে দি, তোমার সঙ্গে কী দরকার বলল…।
অনুপমা চলে গেলেন।
বোধন বিনুর মা আর বিনুর কাকার কথা ভাবছিল। আশ্চর্য। সবই কেমন অদ্ভুত।
বিনু এল। উঠবে?
হ্যাঁ।
চলো তবে।
সদরে এসে বিনুই দরজা খুলল। বাইরে এল। বোধনও বাইরে এসে দাঁড়াল। শীতের হাওয়া দিচ্ছে কনকনে। চারপাশে কুয়াশার মতন। ট্রেন যাচ্ছে অনেকটা তফাত থেকে, ইলেকট্রিক ইঞ্জিনের হুইসল বাজছিল।
বিনু বলল, মা আমার বিয়ের কথা বলছিল না?
হ্যাঁ।
আর কী বলল?
আবার কী! ওই কথাই বলছিলেন।
বিনু বোধনের বুকের কাছে আঙুল দিয়ে খোঁচা মারল। আজ তোমায় একটা কথা বললাম না। আর কদিন যাক, বলব। বাইরে থেকে সব জিনিস দেখো না।
বিনু সদরের দিকে মুখ ঘোরাল আবার।
.
সুকুমারের দোকান থেকে ঘুরে বোধন বাড়ি ফিরছিল। রাত বেশি নয়। আটটা হবে। জোর শীত পড়েছে। আকাশের তলায় কুয়াশা যেন জমাট বাঁধছে। উত্তরের বাতাস দিচ্ছিল। এই ঠাণ্ডায় ঘোরাঘুরি না করে কাঁপতে কাঁপতে বাড়ি ফিরছিল বোধন। সুকুমারদার সঙ্গে কথা হয়েছে। বাড়ির খোঁজ পাওয়া যাবে কাল পরশু, প্যান্ডেল বাঁধার জন্যে ঘনশ্যামকে বিনুদের বাড়ি নিয়ে গেলেই হবে, ইলেকট্রিকের জন্যে সুকুমারদাই রয়েছে। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারটা বিনুর কাকা দেখবেন। ক্যাটারিং। মোটামুটি এই। কিছুই আটকাবে না। বাকি কাজ যেটা–সেটা নিয়ে সুকুমারদার সঙ্গে কথা বলার উপায় নেই। কিন্তু বোধন কিছুতেই বুঝতে পারছে না, বিনুর মা কেন সোনা-দানা বেচতে চান? নিশ্চয় টাকার জন্যে। বিয়ের খরচ মেটাবেন বিনুর মা। বিনুর কাকা তা হলে আছেন কেন? তার চেয়েও বড় কথা বিনুর মা বিনুর কাকাকে লুকিয়ে একাজ কেন করতে চান? দুজনের মধ্যে কীসের একটা ব্যাপার আছে। বোধন এতদিনে অনেকটা ধরতে পেরে গেছে ওঁদের সম্পর্কটা সোজা, সরল, স্বাভাবিক নয়।
তা থাকগে। বোধনের কী? এরকম আজকাল খুব চলে। সি ব্লকের প্রতিভা বউদিরও এইরকম। দুই মেয়ে নিয়ে থাকে, বারো চোদ্দো বয়েস, স্বামী আছে কোথাও, আসে না, যে-আসে সে অন্য লোক– প্রতিভা বউদির এক মাসতুতো ভাই, সিনেমার ক্যামেরাম্যান। আরও আছে। এই পাড়াতেই।
বিনুর বিয়েটা তা হলে ভাল মতনই হচ্ছে। তোক। বরপক্ষ আসবে দিল্লি থেকে, প্যান্ডেল বাঁধা হবে, আলো জ্বলবে, বিনু ফুল চন্দন পরে কনে সাজবে, রেকর্ডে সানাই বাজবে, আহা–দারুণ হবে। বোধনের দিদির কথা মনে পড়ল। ছেলেবেলায় পাড়ায় যখন বিয়ে হতবোধন সব সময় ভাবত, দিদির বিয়ের সময় সে একবার দেখে নেবে। মাতব্বরি কাকে বলে দেখিয়ে দেবে।
