বোধন বুঝতেই পারছিল। পিকনিকের কথা বিনু আগেই বলেছিল, তবে সে যাবে কি যাবেনা তখনও ঠিক করেনি। নতুন বছর পড়ে গিয়েছে, শীতের দিন–এখন তো এসব হবেই।
আমি আর তা হলে কী করব! পালাই? বোধন বলল।
পালাবে কেন, বোসো। বিনু মুখ তুলে আবার কাশল। গলা পরিষ্কারের চেষ্টা করল। করেই লজেন্স মুখে দিল।
মাসিমা কোথায়? বোধন জিজ্ঞেস করল।
ঘরে। আসছে। …কাল তুমি আসনি তো?
না। কেন?
কাল তোমাদের পাড়ার দুটো ছেলে এসে তোমার নাম বলে মার কাছ থেকে পাঁচটা টাকা নিয়ে গেছে। বলেছে কীসের যাত্রা-ফাত্রা করবে।
আমি কাউকে পাঠাইনি। যাত্রার ব্যাপারও জানি না। আচ্ছা তো!
মা সেটা বুঝতে পেরেছে। …তোমাদের পাড়ায় কতগুলো বাজে ছেলে থাকে। …সব পাড়াতেই থাকে। এ-পাড়ার বাজে ছেলেগুলো একেবারে বাজের বাজে।
বোধন হেসে ফেলল।
বিনুর মার সাড়া পাওয়া গেল। বিনু, বোধন এসেছে?
হ্যাঁ।
আসছি।
বিনুকে আগের চেয়ে আজকাল সামান্য ভাল দেখায়। উনিশ বিশ। বাড়িতে এখন তার খুব যত্ন। বোধন ঠিক জানে না, বিনুর মুখেই শুনেছে–গত বছর তার প্লুরিসির মতন হয়েছিল, সেরে গিয়েছে– তবু এখনও ঠাণ্ডা লাগানো, ভারী কাজকর্ম করা বারণ। বিনু কিছুই করে না, হয়তো নিজের বিছানাটা পরিষ্কার করল, চা করল কিংবা ওমলেট ভাজল একটা। এমন আরামে থেকেও কেমন করে অসুখ করে মানুষের কে জানে! বিনুর কোনও অভাব নেই। না থেকেও এই শরীর স্বাস্থ্য! আশ্চর্য।
বিনুর মা ঘরে এলেন। গায়ে চাদর। পাতলা। কালো রং। মাথার খোঁপা সামান্য ওঠানো। চশমা চোখে নেই। তুমি কাল এলে না কেন?
কাল? কাল তো আমার…বোধন অবাক হচ্ছিল।
সুকুমার তোমায় কিছু বলেনি?
কই না।
আমি যে ওকে বললাম, তোমায় একবার পাঠিয়ে দিতে। বেলার দিকে ও সামনের বাড়িতে এসেছিল। দেখতে পেয়ে বললাম।
বোধন বুঝতে পারল। কাল বোধন সুকুমারদার দোকানে যায়নি। দেখাও হয়নি। বোধন কাল সারা দুপুর, বিকেলে পাড়াতে ছিল না। গৌরাঙ্গর সঙ্গে ইডেন গার্ডেনসে রঞ্জি ট্রফির খেলা দেখতে গিয়েছিল। গৌরাঙ্গই টেনে নিয়ে গিয়েছিল। গৌরাঙ্গ বেলগাছিয়ার ক্রিকেট টিমে খেলে। বোধনও একসময় পাড়ার ক্লাবে খেলত। কাল নিতান্ত শীতের দুপুর কাটাবার জন্যে, রোদ খাবার জন্যে বোধন মাঠে গিয়েছিল। ফিরেছে সন্ধে নাগাদ। বাড়ি ফিরে আর কোথাও বেরোয়নি।
আমার সঙ্গে সুকুমারদার দেখা হয়নি, বোধন বলল। কোনও দরকার ছিল?
ছিল। ..তুমি একটু বোসো। আমি হাতের কাজ সেরে আসছি।
অনুপমা চলে গেলেন। বোধন বিনুর দিকে তাকাল, যেন জানতে চাইল, কাজটা কী?
বিনু হাতের রুমাল নিয়ে খেলা করছিল। কেমন যেন গন্ধ এল বাতাসে। বোধন বলল, কী। লাগিয়েছ?
ইউকেলিপটাস। বেশি পড়ে গিয়েছে।
তোমার ব্যাপার-স্যাপারই আলাদা। বোধন হাসল, অত ইউকেলিপটাসে মাথা ধরে যাবে।
যাক গে, আমারই তো মাথা। বলে বিনু নিজের মাথায় কিল মারল ছেলেমানুষের মতন।
বোধন হাসল। কিছু বলল না। বিনু অদ্ভুত। এই মেয়ের যে কেমন করে বিয়ে হবে কে জানে! যে বিয়ে করবে তারই মাথা খারাপ হয়ে যাবে।
হাসছ যে? বিনু বোধনের হাসি থেকে কিছু অনুমান করে বলল।
এমনি।
এমনি আবার কেউ হাসে নাকি। তোমার মুখ থেকে অন্য কিছু মালুম হচ্ছে।
বোধন নিজেও মজা পেতে চাইছিল। কথাটা বলতে ইচ্ছে করছিল তার। বলবে? দরজার দিকে তাকাল। বিনুর মা কি কাছাকাছি আছেন? না বোধ হয়। গলা নামিয়ে বোধন বলল, মাথা খারাপদের বিয়ে হয় কেমন করে? মজার মুখে হাসছিল।
বিনু টেরা-টেরা চোখ করে চটপট জবাব দিল, রাজুরও তো মাথা খারাপ। আমার চেয়ে বেশি।
দুই মাথাখারাপে তা হলে ভয়ংকর কাণ্ড হবে যে। বোধন হাসছিল।
কাটাকাটি হয়ে যাবে। এ একেবারে মেথামেটিকস।
বোধন জোরে হেসে উঠল। বিনুও হাসছিল।
দুজনের হাসাহাসির মধ্যে অনুপমা ঘরে এলেন। দেখলেন দুজনকে। এত হাসির কী হল?
বিনু বলল, মাথাখারাপের কথা হচ্ছিল। বোধনদা আমায় পাগল বলছে।
বোধন অপ্রস্তুত। না না, পাগল কোথায় বললাম!
বলেছ বেশ করেছ,অনুপমা বললেন, পাগল ছাড়া আবার কী! মেয়ের দিকে তাকালেন আবার চা ভিজিয়ে দিয়ে এসেছি, ঢেলে নিয়ে আসবি? বোধনের জন্যে দুটো পাঁপড় ভেজে আনিস।
বিনু আড়চোখে বোধনকে দেখল। তার চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, সে সবই বুঝতে পারছে। মা তাকে সরিয়ে দিচ্ছে ঘর থেকে।
বিনু উঠে গেল।
অনুপমা বসলেন। কাল তোমার জন্যে হাঁ করে বসে থাকলাম। দরকারি কথা ছিল।
বোধন বলল, আমি খবর পাইনি।
তাই তো শুনছি। অনুপমা সামান্য চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন, বিনুর তো বিয়ে।
বোধন অবাক হবার ভান করল। বিনুর মুখে কী শুনেছে সে সেটা জানতে দেওয়া উচিত নয়। কী মনে করবেন বিনুর মা! বিয়ে?
এই মাঘ মাসের শেষে।
বোধন যেন কতই বোঝে মাথা চুলকে বলল, বিনু তো ছেলেমানুষ, মাসিমা। কম বয়েস।
একেবারে কম কোথায়, কুড়ি পেরিয়ে গিয়েছে। একটু থেমে আবার, আজকালকার হিসেবে একটু কম। আমাদের সময়ে এই রকমই হত। আমারও উনিশ শেষ হতে বিয়ে হয়েছিল। বিনু হয়েছে অনেক পরে, বছর তিন চার।
বোধন মার কথা ভাবল। মারও কুড়ি বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল। মার প্রথম সন্তান দিদি। তারপর বোধন।
আমার তো ওই একটি মেয়ে, অনুপমা বললেন, ছেড়ে থাকতে কি ইচ্ছে হয়। কিন্তু কী করব বলল, বিয়ে তো দিতেই হবে রোগা-সোগা মেয়ে, রোজ শরীর খারাপ, অসুখ। আর নিজেই দেখেছ, লেখাপড়ায় ওর মন নেই। বাড়িতে বসে পড়াশোনা করবে তাও করবে না। ওকে নিয়ে আমার বড় ভাবনা। বরাবর। বিনুর বাবা চলে যাবার পর থেকে ওই মেয়ে নিয়ে আমার কেটেছে। ছেলেমেয়ের দায় বড় দায়, বোধন। সে তুমি এখন বুঝবে না। ছেলেমানুষ। পরে বুঝবে।
