সুকুমার চটে গিয়েছিল। সামলে বলল, কাকাবাবু, বোধন খুব ভাল ছেলে। সে চুরিচামারি করার ছেলেই নয়। আপনি আমার কথা বিশ্বাস করুন। পাড়ার যে কোনও লোককে ওর স্বভাব চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করুন।
বলাইবাবু শান্ত নম্র গলায় বললেন, আমি জানি সুকুমার। গৌরাঙ্গ ওকে এনেছে, তুমি বলছ–তার ওপর কথা থাকতে পারে না। বাপের দোষ ছেলেতে বর্তাবে যে তারও কোনও মানে নেই। কিন্তু আমার পার্টনার বেশি খুঁতখুঁতে। আমি চেষ্টা করছি। তুমি ওকে কিছুদিন অপেক্ষা করতে বলল। পাড়ার ছেলে আমার বিবেকে লাগছে। আমি ওকে অন্য কোনওভাবে নেবার চেষ্টা করব।
সুকুমার আর কিছু বলেনি। মনে মনে বলেছিল–শালার বিবেক। বেয়াইয়ের পোঁদে তাপ্পি মেরে গাড়ি কিনেছে, শাহেনসা পার্টি।
.
বোধনকে এসব কথা বলা যায় না। বলেওনি সুকুমার। কথা এড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মেসোমশাইয়ের ব্যাপারটা শুনে তার খারাপ লেগেছে। অবশ্য বাপ হলেই কি সে ঠাকুর দেবতা হয়ে ওঠে। সুকুমারের বাবাই বা এমন কি গঙ্গাজল ছিল! এ-পাড়ায় কত চিটিংবাজ, ঘুষ খাওয়া, মালটানা বাপ ঘুরে বেড়াচ্ছে।
সুকুমার কথা ঘোরাল। নে সিগারেট খা। বলাইবাবু চেষ্টা করছেন।
বোধন কেক শেষ করেছিল। চা খেতে লাগল।
আমার কিছু হবে না, সুকুমারদা?
হবে রে বেটা, হবে। না হয়ে যাবে কোথায়? আমার হয়েছিল। বাবা ফট হয়ে যাবার পর কী লাথিঝেটা খেয়েছি রে, বোধন। কুকুর বেড়ালের মতন পাছায় লাথি খেতাম। এখন দেখ। নিজের পেট চালাবার জন্যে কার কাছে হাত পাতি? তোরও হবে আর আমার টাকা এলেই তো রেডিয়ো ডিপার্টমেন্ট করছি তোর জন্যে। নে সিগারেট খা।
বোধন সিগারেট নিল। ধরাল।
ছকু বলছিল, বোধন বলল, ও যে মিনিবাসে খাটে সেখানে আমি খাটতে পারি।
মিনিবাস? কার মিনিবাস?
মালিকের নাম জানি না। নাগের বাজারে থাকে।
ছ কোন রুটে খাটে?
ডানলপ ব্রিজ।
কত কামায়?
গোটা হপ্তা খাটতে পারে না। পাঁচদিন খাটে। শ তিনেক পায়।
ও তুই পারবি না। সুকুমার পা তুলে দিল টেবিলের ওপর, ছক্কু পারে।
এ তুমি কী কথা বলছ? ছকু বি কম পাশ।
এ কম বি কম-এ কিছু না। ছকুর চেহারা দেখেছিস! ও খাটতে পারে, ঝগড়া করতে পারে; আর বানচোত বলে হাত গুটোতে পারে। তুই পারবি না।
কেন?
কেন? সুকুমার এমনভাবে বলল, যেন এই সহজ কথাটা বোধনের মাথায় ঢুকছেনা কেন। কেন বুঝছিস না? মালিকের খেচামেচি তোর সহ্য হবে না। প্যাসেঞ্জাররা তো শালা মাল, এ বলবে ধীরে চলো ও বলবে জোরে চলো, বাসে উঠেই দশ টাকার নোট ভেড়াবে লাটের মতন, পচা নোট চালাবে। তারপর আজ পুলিশের গুতো, কাল প্যাসেঞ্জারের গুতো। টায়ার পাঞ্চার হল তো জ্যাক মারো। …তুই এসব পারবি না। তার ওপর যাদের পাল্লায় পড়বি তারা বেশির ভাগ অ্যায়সা খিস্তি খেউড় করবে তোর যেটা শুনে কান লাল হয়ে উঠবে।
বোধন রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ বলল, আমি যদি কিছু না পারি বাঁচব কেন?
সুকুমার তাকাল। তাকিয়ে থাকল বোধনের দিকে। তার বড় কষ্ট হচ্ছিল। কেন যে এই ছেলেটাকে এত ভালবাসে! কে জানে! ভালবাসে, বিশ্বাস করে, প্রশংসা করে। …কত বছর আগেকার কথা, সুকুমাররা যখন বাগবাজারে থাকত, সুকুমারের বারো তেরো বয়েস তখন তার ছোট ভাই বিশু বর্ধমানের দেশের বাড়িতে পুকুরে ডুবে মারা যায়। সুকুমাররা তখন মাঝে মাঝে দেশের বাড়িতে যেত। বোধনের সঙ্গে ভাইয়ের কোনও মিল নেই। শুধু চোখ দুটোয় যেন ভীষণ মিল।
কথাটা সুকুমারের মনে হয়, কিন্তু কাউকে বলে না, মাকে নয়, বউকে নয়, বোধনকেও না। বলে না এই জন্যে যে, সেই ছোট ভাইবিশুপুকুরে ডুবে মরে যাবার একটা কারণ সুকুমার। যদি সুকুমার সাত আট বছরের বর্ষার ভরা পুকুরে সাঁতার শেখাবার বাহাদুরি না করত বিশু ডুবত না। এই আফশোস, দুঃখ, পাপ সুকুমার এখনও যেন বয়ে বেড়াচ্ছে।
মন খারাপ হয়ে যাচ্ছিল বলে সুকুমার উঠে পড়ল। নে নে ওঠ, দোকান বন্ধ করি।
বোধন কয়েক মুহূর্ত বসে থেকে উঠল।
চিঠিটা নিলি?
নিয়েছি।
মেসোমশাইকে ভাল করে দেখে নিতে বলবি।
বোধন কথা বলল না।
সুকুমার দোকান বন্ধ করতে লাগল। বোধন হাত লাগাল।
দোকানে গোটাতিনেক তালা মারল সুকুমার। জগৎ কাল আসবে। জ্বর ছেড়ে গিয়েছে।
রাস্তায় দাঁড়িয়ে কেঁপে উঠল বোধন। বড় শীত করছে। বাতাসটাও হাড়ে গিয়ে লাগে।
নে চল, সুকুমার পা বাড়াল।
চুপচাপ খানিকটা হেঁটে এসে সুকুমার হঠাৎ বলল, তুই একটা সিসের আংটি পর তো।
কেন? সিসের আংটি পরব কেন?
পর। তোর মাথা ভাল থাকবে। বলে সুকুমার হাসবার চেষ্টা করল, হাসিটা ঠিক গলায় এল না।
.
১৩.
বিনুর গলা বসে গিয়েছিল। অনবরত মুখ তুলে কাশছে। এক হাতে রুমাল, অন্য হাতে কফ লজেন্স। বলল, আমি মরে গিয়েছি। বলে অস্থিরভাবে মাথা নাড়তে নাড়তে ঝপ করে বসে পড়ল।
জ্বর? বোধন জিজ্ঞেস করল।
জ্বর না গলা–টনসিল। কথা শুনছ না? ঘ্যাসঘ্যাস করছে।
বোধন হাসল। বিনুর গলা বসে যাওয়া মানে আজ আর বই খোলাও হবে না। অন্য দিন তবু সামনে বই থাকে, হাতে কলম পেনসিল। আজ তাও নয়।
হাসছে কেন? বিনু বলল।
না, আজ একেবারে ছুটি কিনা তাই, বোধন মজা করে বলল।
কাল আমরা পিকনিকে গিয়েছিলাম। কাকাদের অফিসের বন্ধুরা, উইথ ফ্যামিলি। মা যায়নি, আমি গিয়েছিলাম। সারাদিন গঙ্গার কনকনে হাওয়া খেয়ে এই অবস্থা…।
