কী হল তারপর?
তা জানি না। তবে পরের দিন ভোরে পাঞ্জাবি হোটেলের কাছে রাস্তায় একটা ছেলেকে গুলি খেয়ে মরে পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল।
বোধন আঁতকে উঠে শব্দ করল: নোটন। তাদের পাড়ার নোটন। নোটন পাঞ্জাবি হোটেলের সামনে মরে পড়েছিল বলে সে শুনেছে। নোটন?
নীলিমা কোনও জবাব দিল না।
একেবারে চুপচাপ। কিছুক্ষণ পরে বোধন বলল, নোটনকে তার দলের বন্ধুরাই মেরেছিল বলে শুনেছি। ধরা পড়ার ভয়ে।
নীলিমা চুপচাপ।
বোধনের মনে হল, সে অনেকক্ষণ বসে আছে। কটা বাজল কে জানে। কটা বাজল বলতে পারো?
সোয়া আট, সাড়ে আট হবে। ঘড়ি দেখে বলব?
না, থাক। আমি এবার উঠি।
উঠবে?
শীতকাল। রাত হচ্ছে।
তা হলে এসো।
বোধন উঠে দাঁড়াল। তোমার আর একটা সিগারেট নেব?
নাও না।
বোধন সিগারেট নিল; ধরাল না! পরে রাস্তায় ধরাবে।
দরজার কাছে এসে নীলিমা বলল, ও একটা কথা তোমায় বলতে ভুলে গিয়েছি। শোভনাদিকে সেদিন দেখলাম।
দিদিকে? কোথায়?
আমাদের হাসপাতালে এসেছিল।
হাসপাতালে? কেন?
নীলিমা হাসির মুখ করল। তুমি বুঝতে পারবে না। দায়ে পড়ে এসেছিল। মাস খানেকের প্রেগনেন্সি নিয়ে। আজকাল এক রকম যন্ত্র বেরিয়েছে। প্রথম দিকে এলে ওতে বেশি সময় লাগে না। ঘণ্টা খানেক পরেই ছাড়া পেল। ট্যাক্সি করে চলে গেল! সঙ্গে লোক ছিল।
বদ্যিনাথ?
না বদ্যিনাথ নয়। অবাঙালি একজন। তা খুব যত্ন করে নিয়ে গেল।
দরজার মুখে দাঁড়িয়ে বোধন নীলিমার মুখ দেখল। হাত পা কাঠ। বোধন সবই বুঝতে পারছিল।
.
১২.
কলকাতায় এমন হাড়-জমানো শীত পড়বে ভাবাই যায়নি। হুট করে চলে এল। কাগজে বলছে, উত্তরে বরফ পড়ছে, শীতের ঝাঁপটা চলছে দিল্লিতে, আগ্রায়; পাটনাতেই এক দিনে তিন জন মারা গিয়েছে।
সুকুমার অঘটনের খবর পড়তে ভালবাসে। সে এই সব পড়ছিল আর বোধনকে বলছিল। বোধন বসে বসে একটা চিঠি তৈরি করছে সুকুমারের জন্যে। সুকুমার তার দোকান বাড়াবার জন্যে হন্যে হয়ে উঠেছে। ব্যাঙ্কের একজন বলেছে, টাকা ধার পাইয়ে দেবে সুকুমারকে। সেই টাকার আশায় এই চিঠি। সুকুমারের কথা মতন বোধন বাবার কাছ থেকে জেনে এসেছে, কী লিখতে হবে, কেমন করে লিখতে হবে চিঠিটা। চিঠি কালই সুকুমার ব্যাঙ্কে নিয়ে যাবে। আগে চিঠি, তারপর না অন্য কাজ।
দোকানে বসেই চিঠি লেখা হচ্ছিল। এখন কদিন আলো থাকছে সন্ধেবেলায়। আজ এখন অন্তত আছে, হুস করে চলে যেতেও পারে।
বোধন চিঠি লেখা প্রায় শেষ করে এনেছিল। সুকুমার চুপচাপ বসে থেকে সকালের বাসি কাগজটাই রেডিয়োর খবর পড়ার মতন করে পড়ছিল।
শীতের জন্যে রাস্তায় লোকজন কম কম লাগছে। তবু আসা-যাওয়া রয়েছে, ট্যাক্সি ঢুকছে, রিকশা যাচ্ছে, একটা লরিও ঝরঝর করতে করতে চলে গেল।
সুকুমার বলল, বোধনা, আর একবার চা হোক কী বলিস? সুকুমারের মেজাজ খুশি থাকলে সে বোধনকে আদর করে বোধনা বলে।
বোধনের শীত করছিল। জামার তলায় গেঞ্জি নেই, পুরনো হাতকাটা এক সোয়েটার, তার ওপর জামা। জামার ওপর সুতির চাদর। মেয়েলি চাদর। মার। পা দুটো কনকন করছে।
বলল, বোধন বলল।
দোকানে কেউ নেই। সুকুমার উঠে পড়ে চা বলতে গেল।
বোধন চিঠি শেষ করতে লাগল। বাবাকে একবার দেখিয়ে নিতে হবে। ভুলভাল কী লিখছে সে জানে না।
সুকুমার ফিরে এল। নে কেক খা।
কেক?
বছরের শেষ দিন। খেয়ে নে। পরিমলের দোকানে একটাই পড়েছিল। নিয়ে নিলাম। সুকুমার আধখানা কেক বোধনের সামনে রাখল।
চিঠি শেষ করল বোধন। মাথা তুলল। শুনবে কী লিখলাম?
পড়। ইংলিশ ব্যাপার, বুঝিয়ে দিবি।
বাবাকে একবার দেখিয়ে নেব।
তা হলে আর আমায় শোনাচ্ছিস কেন? মেসোমশাই দেখে দিলেই ফাইন্যাল।
তবু একবার শোনো। তোমার জিনিস।
পড় তবে।
চিঠি পড়ার মধ্যে দোকান থেকে কাচের গ্লাসে চা এল।
বোধন চিঠি শেষ করে বলল, ঠিক আছে?
ফার্স্ট ক্লাস। মেসোমশাইকে দেখিয়ে নিবি। …নে, চা খা।
সুকুমারের মন-মেজাজ আজ কদিন ধরেই ভাল। মা বর্ধমানে গিয়ে শান্তিতে আছে। বাড়িতে বউ আর ওরকম কানের কাছে গজগজ করছে না। তার ওপর সুকুমার ধরেই নিয়েছে, ব্যাঙ্কের টাকা সে পাবেই, পেলেই দোকানটা আরও বাড়াবে, গুছিয়ে নেবে, মালপত্র রাখবে ইলেকট্রিকের, রেডিয়ো সারাইয়ের ব্যবস্থা করবে। এসব দিয়ে দোকান বাড়ালে সেটা চলবেই। দেখতে দেখতে পাড়াটা কেমন জমজমা হয়ে গেল।
কেক চা খেতে খেতে বোধন বলল, তোমার সঙ্গে বলাইবাবুর কথা হল?
তাকাল সুকুমার বোধনের দিকে। আজই হয়েছে।
কী বলছে?
বলছে, অফিসের গণ্ডগোলটা না মিটলে কিছু করতে পারছে না।
গৌরাঙ্গ অন্য কথা বলছে।
কী বলছে গোরা?
বলাইবাবুর পার্টনার বাগড়া দিচ্ছে।
সুকুমার জবাব দিল না। ব্যাপারটা অন্যরকম। গৌরাঙ্গ বোধনকে নিয়ে বলাইবাবুর কাছে গিয়েছিল। কথাবার্তাও বলেছেন বলাইবাবু বোধনের সঙ্গে। কিন্তু অন্য জায়গায় আটকে গিয়েছে। সুকুমার বোধনের জন্যে তদ্বির করতে গিয়ে প্রথম দিন কিছু শোনেনি, দ্বিতীয় বার যাবার পর বলাইবাবু বললেন, তোমায় আসল কথাটা বলি সুকুমার লিক করে দিয়ো না। আমার লোক চাই নিশ্চয়, কিন্তু তাকে ক্যাশ হ্যাঁন্ডেল করতে হবে। যে ছিল সে আমাদের ডুবিয়েছে। ক্যাশের ব্যাপার বুঝতেই পারছ, দশ বিশ টাকা সরিয়ে নিলেও ধরা যাবে না। রিলায়েবল লোক হওয়া দরকার। বোধনদের ফ্যামিলির যা অবস্থা শুনলাম তাতে ভরসা হচ্ছে না। অভাবে স্বভাব নষ্ট বলে যে কথা আছেউড়িয়ে দেওয়া যায় না একেবারে। তার ওপর আমি ওর বাবা সম্পর্কেও একটু খোঁজ নিলাম। লাকিলি আমার পুরনো এক বন্ধু ওই ব্যাঙ্কে কাজ করেছে। সে বলল, ভদ্রলোক ব্যাঙ্কের লোন সেকশানে কাজ করতেন। টাকা পয়সা খেতেন। আরও সব কী ব্যাপার! হি ওয়াজ সাসপেন্ডেড। কেস হয়। ভদ্রলোকের চাকরি যায়। এই ধরনের বাড়ির ছেলে ক্যাশে আনা…বুঝতেই পারছ, সাহস হচ্ছে না। আমার পার্টনার একেবারে এগেনস্টে। তবু পাড়ার ছেলে বলে আমি চেষ্টা করছি। তুমি কিছু বোলো না। বেচারির মন খারাপ হবে।
