নীলিমা জোরে হাসল না। বলল, সাহসও নেই। চুরি গুণ্ডামিতেও সাহস লাগে।
বোধনের হঠাৎ কেমন বিনুর মার কথা মনে পড়ে গেল। বিনুর মা অচেতন হয়ে মাটিতে পড়ে আছেন। তাঁর গলায় হার, হাতে চুড়ি। আলমারির চাবি আলনার কাছে পড়ে। বোধন ইচ্ছে করলেই টাকা পয়সা সোদানা কিছু সরাতে পারত। পারেনি কেন? সাহসে কুলোয়নি? হয়তো তাই, কে জানে! বোধনের সেদিন আরও একটা লোভ এসেছিল বিনুর মাকে দেখতে দেখতে। ঘামে জলে ভেজা আধ খোলা জামাটা তাকে অস্বস্তির মধ্যে ফেলেছিল। কেন বিনুর মার গা বুক এখনও দেখতে ভাল। কত ভাল। কেন তার মায়ের নয়।
নীলিমা বলল, করবে চুরি? এমন আচমকা নীলিমা বলল যে বোধন শুনতে পেল না।
তাকাল বোধন।
বলছি, চুরি করবে? নীলিমা বলল।
বোধন অবাক হল। নীলিমাকে দেখছিল বোকার মতন।
করলে বলল, ব্যবস্থা করে দেবার চেষ্টা করব। ঠাট্টা করেই বলল কিনা নীলিমা কে জানে।
নীলিমা এবার বিছানা থেকে উঠে দেরাজের কাছে চলে গেল। কিছু হাতড়াল। ফিরে এল। হাতে সিগারেটের প্যাকেট, দেশলাই। খাবে?
তুমি সিগারেট খাও? বোধন বিমূঢ় বোধ করছিল।
আজকাল খাই। আগে একআধটা খেতাম। এখন দিনে আটটা দশটাও খাই। নীলিমা বোধনকে একটা সিগারেট দিল।
বোধন তখনও যেন বিশ্বাস করছিল না।
নীলিমা নিজের সিগারেট ধরিয়ে নিল। ধোঁয়াও গিলল।
বোধন কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে তার বাকি চা-টুকু শেষ করল।
তা হঠাৎ সিগারেট টানা শুরু করলে কেন? বোধন বলল।
এমনি। অনেকেই তো খায়। কম খাটুনি! ক্লান্তি লাগে। খাই। খেলে ভাল লাগে। তা ছাড়া বাড়িতে যখন থাকি একা একা, কতক্ষণ আর চুপচাপ, একেবারে একা চুপচাপ ভাল লাগে! ওই সিগারেট খাই।
তোমার জামাইবাবুর সামনে?
হ্যাঁ আড়ালে কেন খাব! জামাইবাবুর আবার নেশাভাঙ পছন্দ। নীলিমা হাসল।
বোধন দেশলাই চাইল। তুমি অনেক পালটে গিয়েছ।
বিছানায় বসল নীলিমা। পালটাব না কেন? কচি খুকি তো আর নয়। বয়েস হয়ে গিয়েছে। তোমার সমান সমান।
বোধন মুখ ভরতি করে সিগারেটের ধোঁয়া নিল। গিলে ফেলল সবটাই। আলুর চপের ঝাল, চায়ের তেতো স্বাদ সব মিলেমিশে গলা-জিব কেমন লাগছিল। দেখছিল নীলিমাকে। টান করে বাঁধা চুল, বড় বড় চোখ, গলার তলায় কি শ্বেতি ফুটছে। গায়ের আঁচল আলগা। শুধুই জামা পরে আছে নীলিমা, নীচে বোধ হয় কিছু নেই। আঁটো, ছোট বুক। নীলিমার ওই রকমই বরাবর। যাকে বাড় বলে নীলিমার কখনওই তেমন বাড়ন্ত গড়ন হল না। তবু ও চাকরি করে, খাটে, উপার্জনের পয়সায় পেট ভরায়।
কে না পালটায় গো,নীলিমা বলল, তোমরা পালটাওনি?
বোধন জবাব দিল না। দেবার দরকার করে না। তারাও পালটেছে। বাবা, মা, চুয়া–সবাই। হঠাৎ কেমন রাগ হল বোধনের। বলল, তুমি আর কী নেশা করো?
নীলিমা চোখে চোখে তাকিয়ে কেমন যেন বেঁকা করে হাসল ঠোঁটে। মদের কথা বলছ? আমাদের কেউ কেউ খায়। দুদশ ফোঁটা মদে আর কী হবে। আমিও খেয়েছি। ঘরেই থাকে, জামাইবাবুর কাছে।
বোধন বলল, দারুণ। গলার মধ্যে বিদ্রূপ ছিল। আর কিছু করো না?
দেখছিল নীলিমা বোধনকে। মুহূর্ত কয় চুপ করে থেকে বলল, আরও অনেক কিছু করি। করতে হয়। খারাপ কী। গা বাঁচিয়ে চললে আমাদের চলে না। তোমাদের ভদ্র সংসারের কত রকম দেখতে হয়…।
শুনি?
কী?
একটা দেখার গল্প বলল, শুনি।
কেচ্ছা শুনতে চাইছ। বলল নীলিমা। অন্যমনস্ক হল সামান্য। কী হবে শুনে! নীলিমা ভাবছিল কিছু। হঠাৎ বলল, শুনবে? একটা অন্য ঘটনা বলছি শোনো, কেচ্ছার নয়। আমি হাসপাতালের চাকরি ছাড়াও মাঝে মাঝে নার্সিংহোমে গিয়ে কাজ করে আসি। বাড়তি কিছু টাকা হাতে আসে। টাকার কার না দরকার, বলো। এই পাড়ার কাছাকাছি এক নার্সিংহোমে আমি মাঝে মাঝে ঠিকে কাজ নি। একবার দিন সাতেকের কাজ নিয়েছিলাম। এক ভদ্রমহিলার মেয়েলি বড় অপারেশান। সেখানে একদিন রাত দশ সোয়া দশটা নাগাদ একটা কাণ্ড ঘটল।
বোধন সিগারেট খাচ্ছিল অলসভাবে। নীলিমা দু হাত বিছানার দুপাশে দিয়ে ঝুঁকে বসে আছে। সিগারেট শেষ।
কতকগুলো ছেলেজনা চার পাঁচ হুড়মুড় করে দোতলায় উঠে এল। ডাক্তারবাবুকে খুঁজছে। ওদের সঙ্গে আর একজন। তার মুখের ওপর একটা ছেঁড়াফাটা জামা জড়ানো, হাতে ফেট্টি। সে চিৎকার করে কাঁদতে চাইছে যন্ত্রণায়, পারছে না। বন্ধুরা তাকে ধমকাচ্ছে, বারণ করছে। অত রাত্রে নার্সিংহোমে ডাক্তার কোথায় পাবে। দরকার ছাড়া কেউ আসে না। ইনচার্জের সঙ্গে কী কথা হল জানি না আমাদের কেবিনের পাশে ছেলেটাকে রেখে তার বন্ধুরা চলে গেল। তারপর সারারাত সে কী চিৎকার আর কান্না, একটা গোরু মোষ কাটলে যেমন চেঁচায় জন্তুটা সেইরকম। ইনজেকশন দিয়েও তাকে ঘুম পাড়ানো যায় না। তার কী হয়েছিল জানো? পুলিশ মারতে বোমা বাঁধছিল, ফেটে গিয়ে নাক মুখ ঝলসে পুড়ে গিয়েছে, চোখ অন্ধ। কিছু দেখতে পাচ্ছিল না বেচারি। বুঝতে পারছিল তার চোখ অন্ধ হয়ে গিয়েছে। কাঁদছিল, চেঁচাচ্ছিল। আর তার বন্ধুরা লুকিয়ে লুকিয়ে এসে তাকে বলে যাচ্ছিল–তুই ভাবিস না, আমরা অন্য ব্যবস্থা করছি। কোনও রকমে সহ্য কর। চেঁচামেচি করিস না। পুলিশ স্পট করে ফেলবে। তুই একটু সহ্য কর, সব ঠিক হয়ে যাবে।
বোধন নিশ্বাস বন্ধ করে শুনছিল।
ছেলেটা যতক্ষণ হুঁশে থাকত, আমার চোখ, আমার চোখ কী হল আমার, কেন আমি দেখতে পাচ্ছি না করে চেঁচাত আর কাঁদত। ছেলেটা দুদিন ওইভাবে পড়ে পড়ে কাঁদল। তারপর একদিন রাত্তিরে এসে তার বন্ধুরা ওকে নিয়ে গেল।
