আরও কয়েক পা এগিয়ে নীলিমাদের বাড়ি। নীচের তলায় ভুজিঅলা গিরিধারী থাকে বউ বাচ্চা নিয়ে, তার বউ তিন মনী লাশ নিয়ে মুড়ি-ছোলা ভাজে সারাদিন, প্রচণ্ড চেঁচায়। অন্যদিকে থাকে কলমিস্ত্রি অখিল। অখিলকে লোকে বলে লাটুমিস্ত্রি। দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত ধেনো খায়। আর পান। পাড়ায় সন্ধেবেলায় কোনওদিন যদি দেখাও যায় তাকে–লোকটাকে স্বাভাবিক অবস্থায় দেখা যাবে না।
দোতলায় থাকে নীলিমারা। নামেই দোতলা। ভাঙা সিঁড়ি, কড়িবরগা ফাটা ছোট ছোট ঘর, হাত কয়েকের বারান্দা। তার একপাশে কাঠের তক্তা মেরে রান্নাঘর করা। অনেকদিন আছে নীলিমারা।
সিঁড়ি দিয়ে উঠে নীলিমা প্রথমে একটা ভাঙা টিনমারা দরজা খুলল। এটা আগে ছিল না।
বোধন হেসে বলল, গেট করেছ?
না করে উপায় কী! সারাদিন যদি কেউ না থাকে বাড়িতে তা হলে…।
নীলিমা নিজের ঘরের তালা খুলে বাতি জ্বালাল। এসো।
ভেতরে ঢুকল বোধন। জিনিসপত্রে ঠাসা। কোনওটাই বহুমূল্য নয়, হবার কথাও না। নীলিমার যাবতীয় যা কিছু সবই জড়ো হয়ে আছে। জানালাটা খুলে দি, কেমন? ঘরে একটু বাতাস ঢুকুক।
বেতের মোড়া এগিয়ে দিল নীলিমা। বসো।
শীতের ঠাণ্ডা বাতাস আসছিল ধীরে ধীরে। বাতাস বোঝা যায় না। ঠাণ্ডা বোঝা যায়।
চা খাবে না? নীলিমা বলল। খাব না কেন? বোধন ঠাট্টা করল, যা খাওয়াবে খাব। বাস ভাড়া ওসুল করতে হবে না!
তা হলে বসো! আমি কাপড়টা ছেড়ে নি। বলে কাপড়চোপড় উঠিয়ে নিয়ে নীলিমা বারান্দায় চলে গেল।
নীলিমা বোধ হয় বারান্দায় অন্ধকারে দাঁড়িয়ে কাপড় ছাড়ছিল। বারান্দা থেকেই বলল, তেলেভাজা খাবে? হাঁদুর তেলেভাজা।
সে তো রাস্তায়!
আমি নিয়ে আসব। …বাব্বা, পাড়ার পুরনো লোক, বাড়িতে পায়ের ধুলো দিয়েছ। মান্যগণ্য অতিথি।
ঠাট্টা করছ?
নীলিমা কাপড় ছেড়ে ঘরে এল আবার। হাতে পুঁটলি করা ছাড়া কাপড়। রাখল। বলল, একটু চুপ করে বসে থাকো, আমি নীচে থেকে তেলেভাজা আর চা একসঙ্গে নিয়ে আসি। বাড়িতে আর কেন চা করি, কী বলো!
বোধন গাল চুলকে নিল। দেরি করবে?
পাঁচ দশ মিনিট। এখন সাতটাও বাজেনি। তোমার এত তাড়া কীসের। বসোনা দুটো সুখদুঃখের গল্প করি। অনেক কথা আছে।
বোধন হাসল। তা নয়। আমি বসতেই পারি। তুমি আর জিরোতে পারছ না…।
নীলিমা পয়সা নিল। তারপর ঘরের এক পাশ থেকে কলাইয়ের একটা মগ। চটি পায়ে দিয়ে চলে গেল।
বোধন বসেই থাকল। পকেটে সিগারেট নেই। থাকলে খাওয়া যেত।
.
নীলিমার কথাই ভাবছিল বোধন। এই পাড়ায় বোধনরা আসার পর থেকেই দেখছে নীলিমাকে। বোধনদের লাহাবাবুর ফ্ল্যাট বাড়িতে বাচ্চা বাচ্চা সময়বয়সী বন্ধু ছিল নীলুর। খেলতে যেত। বোধনের সমবয়সী। দিদির সঙ্গেও ভাব ছিল নীলুর। চুয়া খানিকটা ছোট বলে তেমন পাত্তা পেত না নীলুদের। নীলুর মা ছিল না, বাবা ছিল। বাবা আর দিদি। দিদি অনেক বড়। অণিমাদিই সব দেখাশোনা করত। অণিমাদির বিয়ে হল। তারপর নীলুর বাবা মারা গেল। বাবা মারা যাবার পর নীলুরা প্যারি রোয়ে চলে যায়। দিদিই মানুষ করেছে নীলুকে। দিদি বেঁচে থাকতেই নীলু নার্সিং পাশ করে ফেলেছে। দিদিও একদিন চলে গেল। এখন নীলু একা। তার জামাইবাবু একসময় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কেরানিগিরি করত। সব ছেড়েছুঁড়ে এখন ধর্ম করে।
নীলুর সঙ্গে বোধনের একসময় মেলামেশা ছিল। ভাল লাগালাগির ব্যাপারও ছিল দুজনের মধ্যে। এমনকী বোধন যখন পাড়া ছেড়ে চলে গেল তখনও প্রথম প্রথম সে নীলুর টানে এখানে আসত। কলেজে পড়ার সময়ও নীলুর সঙ্গে মাখামাখি রেখেছিল। ধীরে ধীরে টান কমে গেল। তবু, নীলু অনেকটা তার ছেলেবেলার বন্ধুর মতন, আবার খানিকটা অন্যরকম।
সিঁড়িতে চটির শব্দ পাওয়া গেল, নীলু আসছে।
ঘরে এসে নীলিমা বলল, তোমার কপাল ভাল, হাঁদু সবেই কড়া থেকে আলুর চপ নামিয়েছে আমি গিয়ে হাজির। খুব গরম।
ঘরের কোণ থেকে কাচের প্লেট কাপ নিয়ে নীলিমা কুঁজোর জলে সব ধুয়ে নিল। আলুর চপ আর চা দিল বোধনকে। নিজেও নিল। নিয়ে বিছানায় বসল।
হাঁদু দারুণ তেলেভাজা করে। তেলেভাজার দোকান চালিয়ে সিঁথিতে জমি কিনেছে বলে গুজব। বোধন আরাম করে তেলেভাজা খাচ্ছিল।
নীলিমা খেতে খেতে বলল, আর কী খবর, বলো?
খবর! ..খবর আর নতুন কী থাকবে?
তোমাদের বাড়িতে একদিন যেতে খুব ইচ্ছে করে। জায়গাটা ঠিক চিনি না!
বাসে উঠবে, চলে যাবে। কঠিন কিছু নয়!
তুমি আস না, আমি কেন যাব?
বোধন একটা চপ প্রায় শেষ করে এনে দু চুমুক চা খেল। পকেটে বাস ভাড়া থাকে না, ভাই। ঠাট্টা করে বলল, বলে হাসল।
নীলিমা বোধনকে ভরা চোখে দেখছিল। বলল, এতদিনে একটা চাকরি জোগাড় করতে পারলে না?
দাও না একটা।
আমি চাকরি দেবার মালিক?
সবাই ওই কথা বলে, নীলু। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। চাকরির বাজার তুমি জান না।
বেশ জানি, নীলিমা বলল। তার চপ খাওয়া শেষ সে একটাই নিয়েছিল। চায়ের কাপে মুখ দিল। তবু লোকে একেবারে পাচ্ছে না তাও নয়। চেষ্টা করো আদা জল খেয়ে।
বোধন হাসল। কিছু না খেয়েই করছি। তবু জুটছে না। একটু থেমে বোধন আজ আশিসের কাছে আসার আসল কারণটা বলল।
নীলিমা কিছু ভাবছিল। সামান্যক্ষণ দুজনেই চুপচাপ।
বোধন ফাজলামির গলায় বলল, এবার চুরি-চামারির লাইনে নেমে যাব। বলেই নিজের হাত পা দেখল দু পলক। শরীরটাও তেমন মজবুত নয়। ল্যাকপেকে তাই না? চলবে এতে?
