বোধনের হঠাৎ মানিকতলার কথা মনে পড়ল। কত দিন যাওয়া হয়নি। মাস আড়াই তো হবেই। আজ গেলে হয়। আশিসকে নিশ্চয় পাওয়া যাবে। আশিস খুব ঘরকুনো। তা ছাড়া ওর বাড়িতে একটা আড্ডাখানা আছে। পূর্ণ, টুকুনসবাই জমায়েত হয়। বোধন নিশ্চয় কাউকে পেয়ে যাবে। তা ছাড়া আজকের কাগজে সে দু তিনটে বিজ্ঞাপনের মধ্যে একটা বিজ্ঞাপন দেখে সন্দেহ করছে, কে পি ওয়ার্কস আশিসের মামাদের হবে। রাবারের কারখানা আশিসের মামাদের ছিল, ওই রকম– নারকেলডাঙ্গায় না রাজাবাজারে। রবিবারের একটা ইংরিজি কাগজ বোধন নেয় চাকরির বিজ্ঞাপন দেখার জন্যে। আজকের কাগজে সে কে পি ওয়ার্কস দেখেছে। চাকরিটার খোঁজ নেওয়া দরকার। গৌরাঙ্গ বলাইবাবুর কথা বলেছে–সেটা এখনও জলে পড়ে, কথাবার্তা বলুক গৌরাঙ্গ। তারপর যদি ডাক পড়ে বোধনের নিশ্চয় যাবে। দু একটা টাকা হয়তো অন্যদের কাছে কিছু নয়–বোধনদের কাছে তার দাম আছে।
না, আজ আর এ-পাড়ায় নয়, মানিকতলাতেই যাবে বোধন। বাস ভাড়া তার কাছে আছে। তা হলে আর দেরি করা কেন, বেরিয়ে পড়লেই হয় হাত মুখ ধুয়ে।
বোধন বাইরে এল। জবাদি রান্নাঘরে ঢুকছে। বাবার গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল ঘরে।
বাথরুমের দিকে যেতে যেতে বোধন বলল, আমি চোখে মুখে একটু জল দিয়ে আসছি। তুমি শুকনো শাড়িগুলো তুলে নাও না, জবাদি। হাঁটা যায় না।
বাথরুম থেকে ভিজে মুখে বেরিয়ে বোধন দেখল, জবাদি শাড়ি তুলে নিচ্ছে। বাবার গলা পাওয়া যাচ্ছিল ভেতরে।
কদিন ছুটি নাও না, বাবার গলা! ঘুমটুম হলে, বিশ্রাম নিলে সেরে যাবে।
এত ঘুমোই, আর কত ঘুমোব।
কোথায় ঘুমোও! ছটফট করো সারারাত। সাউন্ড স্লিপ দরকার। বয়েস বেড়েছে পরিশ্রম হচ্ছে…।
আর পারি না। শরীরের মধ্যে কেমন যেন হয়। মাথা তুলতে ইচ্ছে করে না, ঘাড় টনটন করে। একদিন হুট করে মরে যাব।
পাগল! …মরে যাবে!
মরেই তো আছি। না হয় বরাবরের জন্যে মরব। তোমার মতন খোঁড়া, অকর্মণ্য মানুষটার তখন কী হবে তাই ভাবি।
বোধন আর দাঁড়াল না, সরে গেল।
৩. বিডন স্ট্রিট
১১.
বিডন স্ট্রিট দিয়ে খানিকটা এগুতেই দেখা। মুখোমুখি।
বোধন,নীলিমা ডাকল।
নীলিমাকে দেখেই মনে হল হাসপাতাল থেকে ফিরছে ও।
বোধন হাসির মুখ করল। এই তো৷ ডিউটি থেকে ফিরছ?
মাথা নাড়ল নীলিমা। এদিকে কোথায়? পথ ভুলে?
আশিসের কাছে এসেছিলাম। নেই। ওরা নাকি বাড়িসুষ্ঠু মধুপুরে বেড়াতে গিয়েছে পরশু।
আর কাউকে পেলে না? নীলিমা ফুটপাথের দিকে আরও একটু সরে দাঁড়াল।
গজেনকে পেয়েছিলাম। ও আবার শোভাবাজার যাচ্ছে…।
নীলিমা বলল, ফিরে যাচ্ছ তা হলে?
ভাবছিলাম। ফিরে না গিয়ে কী করব?
মাসিমারা কেমন আছে?
ওই যেমন থাকে।
মেসেমশাই? চুয়া?
চলছে সব। …তুমি কেমন আছ?
আমারও চলছে।
নীলিমা বলল, তা এসেছ যখন চলো, আমার বাড়িতেই বসবে।
বোধন বোধ হয় এটা আশা করেনি। দেখল নীলিমাকে। তুমি সবে ডিউটি থেকে ফিরছ।
তাতে কী। …পাড়ায় এসে ফিরে যাবে, পাড়ার বদনাম। নীলিমা হাসল, আস তো না। ভুলেই গিয়েছ। চলো৷
বোধন এড়িয়ে যাবার উপায় দেখল না, ইচ্ছেও হল না। বাড়ি ফিরে গিয়েই বা কী করবে? বলল, চলো। তোমাদের এখানে লোডশেডিং হচ্ছে না?
কোথায় না হচ্ছে। তবে এখন বেশির ভাগ দিন সন্ধেবেলায় থাকে, রাত্তিরে যায়। নীলিমা হাঁটতে লাগল। বোধন পাশে পাশে।
নীলিমা থাকে প্যারি রোয়ে। বোধন বাড়ি চেনে। আসা-যাওয়া ছিল একসময়ে। নীলিমাকে কেমন যেন লাগত বোধনের। কালো রং গায়ের, গড়নে একেবারে ছিপছিপে, মুখের ধাঁচ বেশ লম্বা, বড় বড় চোখ–যেন দুটো ঝকঝকে চোখ ঠেলে নাক ছুঁয়ে ফেলছে। গালে ব্রণ, ব্রণের গর্ত। মস্ত কপাল। সমস্ত চুল একেবারে টেনে বাঁধত। কপাল তাই লম্বা দেখাত আরও। এখনও সেইভাবে চুল বাঁধে। নীলিমার চেহারায় কী আছে বোধন বুঝতে পারত না। কিন্তু আকর্ষণ অনুভব করত। ঠাট্টা করে পাড়ায় তাকে বোধনরা বলত, ব্ল্যাক বিউটি।
তুমি একেবারেই আর এদিকে আস না? নীলিমা জিজ্ঞেস করল।
খুব কম। এসে কী করব বলল! কাউকে পাব না। শুধু শুধু বাস ভাড়া খরচা করে আসা আর ফিরে যাওয়া।
নীলিমা ঘাড় বেঁকাল। তুমি যা মিথ্যেবাদী হয়েছ।
মিথ্যেবাদী! কেন?
তোমার সঙ্গে সেই যে কলেজ স্ট্রিটের মোড়ে একদিন দেখা হল, বললে সামনের রবিবারে আসবে। এলে?
বোধন ঘাড় চুলকে হাসল। না, সে আসেনি। নীলিমা ঠিকই বলেছে, মাস চার পাঁচ আগে একদিন দেখা হয়ে গিয়েছিল কলেজ স্ট্রিটে। বোধন ব্যাঙ্কিং পরীক্ষা দেবে বলে একটা বইয়ের খোঁজে ও পাড়ায় গিয়েছিল। ফেরার সময় দেখা। বলল, বলেছিলাম। তারপর নানা ঝাটে পড়ে গেলাম!
তোমার ঝঞ্ঝাট…কিছু করছ?
না। একেবারে বেকার।
সেই পরীক্ষার কী হল? বলছিলে যে?
কিছু হয়নি।
বড় রাস্তা শেষ করে গলি। এ-পাড়া একদিন বোধনেরই ছিল। সবই নখদর্পণে। এখানে এলে কখনও কখনও বোধনের মনে হয়, এমন কিছু হয় না আচমকা, ম্যাজিকের মতন, বোনরা আবার এখানে ফিরে আসে।
সরু গলি। রিকশা যাচ্ছে। আলোও জ্বলছিল। খানিকটা এগিয়ে নীলিমাদের বাড়ি।
বোধন বলল, তোমার জামাইবাবুর খবর কী?
কথার জবাব দিল না নীলিমা সঙ্গে সঙ্গে। পরে বলল, কী আবার। জপতপ, তেলক কাটা, এটা ওটা সবই চলছে। আজকাল আবার মাঝে মাঝে ক্যানিংয়ের দিকে কোথায় যায়। সেখানে ওর চেলারা আশ্রম খুলে দিয়েছে। বলে নীলিমা বোধনের কনুয়ের কাছে ধরল। হাসল যেন, তোমার ভয় নেই। জামাইবাবু আজ তিন চার দিন নেই। সাধনা করতে গিয়েছে।
