তক্তপোশ ছেড়ে উঠে পড়ল বোধন। বাইরে এক নাগাড়ে কাক ডাকছে। মাঝে মাঝে চড়ুইয়ের কিচকিচ। জবাদি বাসন মাজছে, তার শব্দও এক আধবার কানে আসছে। একবার বাথরুম যেতে হবে। জবাদি বাসন মেজে না বেরুলে যাওয়া যাবে না।
বোধনের একটা সিগারেট খেতে ইচ্ছে হল। আজ যখন বাবার জন্যে এক প্যাকেট সস্তা সিগারেট কিনল বোধন তখন নিজের জন্যেও খুচরো তিনটে কিনেছিল। দুটো শেষ হয়েছে, একটা আছে। বাবা যদি না জেগে উঠে বাইরে এসে বসে থাকে এতক্ষণে বোধন একটা সিগারেট খেতে পারে জানলার সামনে দাঁড়িয়ে। দেশলাই রান্নাঘরে পাবে।
ঘরের বাইরে এল বোধন। খাবার জায়গাটায় আগাগোড়া শাড়ি সায়া জামা মেলা, শুকোচ্ছে সব। টেবিলটা আড়াল পড়ে গিয়েছে।
বোধন শুকনো, আধ-শুকনো জামা কাপড় সরিয়ে রান্নাঘরে গেল। জবাদি কল খুলে বাসন ধুচ্ছে। জল পড়ার শব্দ হচ্ছিল।
দেশলাই নিয়ে ফিরে আসার সময় বোধন দেখল, মার ঘরের দরজা অর্ধেক ভেজানো। বাবা এখনও ওঠেনি। দুপুরে বাবা বড় একটা ঘুমোয় না, শুয়ে থাকে, না হয় খুটখাট কিছু একটা করে। এখন কোনও রকম সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না।
আজ তারা সকলেই কার মুখ দেখে যে উঠেছিল কে জানে! এমন ভাল দিন যদি মাঝে মাঝে আসত তবু বোঝা যেত বাড়িতে কিছুটা শান্তি আছে। কিন্তু আসে কোথায়?
ঘরে এসে বোধন জামার পকেট থেকে সিগারেট বার করে ধরাল। ধরিয়ে জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকাল। রোদ একেবারেই জ্বলজ্বল করছে না; মানে, তাত নেই। রং আছে, আর খানিকটা পরে রং-ও মরে আসবে। নীচের মাঠটুকুতে মন্টু-টন্টুরা ক্রিকেট খেলছে। বাচ্চা বাচ্চা ছেলে। পাখিও ওদের সঙ্গে ভিড়ে গেছে। ফ্রক দুলিয়ে ছুটছে, বল কুড়োচ্ছ। হাসি পেল বোধনের। খেলুক। আজকাল মেয়েরাও ক্রিকেট ফুটবল খেলছে ভাল।
বাচ্চা বয়েসটাও বেশ ভাল। কোনও ঝাট ঝামেলা নেই, দুশ্চিন্তা নেই। বোধনরাও ওই বয়েসে শুধু নয় ওর চেয়েও বড় বয়েসে পাড়ার মধ্যে ক্রিকেট খেলছে। একবার তো তার বল লুফতে গিয়ে লাইট পোস্টের সঙ্গে ধাক্কা লেগে নাকই ফেটে গেল। গলগল করে রক্ত। কিছুতেই রক্ত বন্ধ হয় না। হাসপাতালে গিয়ে নাক প্লাগ করতে হল। মার সে কি অবস্থা তখন, ভয়ে তটস্থ, একদিকে কাঁদছে অন্য দিকে বোধনকে গালাগাল দিচ্ছে। বোধন তখন একেবারে কচি খোকাটি নয়, ক্লাস সেভেন এইটে পড়ে। মা ছেলেকে কোলের কাছে নিয়ে শুয়েছিল সারারাত। বাবা পরের দিনই ভাল ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল। তখন থেকে বোধনের নাকের হাড় সামান্য বেঁকে আছে। থাকুক। কী আর করা যাবে।
সংসারে তখন সবই অন্যরকম ছিল। সকাল শুরু হত ঝরঝরে চেহারায়। বাবা চা খেয়ে বাজারে চলে যেত, কি কাজ করত বাড়িঘরের, মা বাসি কাপড় বদলে সংসারের কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ত, দুধ জ্বাল দিচ্ছে, চাল মেপে নিচ্ছে, দিদি টুকটাক ফাঁই ফরমাশ খাটছে। বাবা বাজার নিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে আরও যেন জোর কদমে ছুটতে লাগল সংসার। বাবা বাজার ফিরতি জিলিপি, কচুরি না হয় রুটি-মাখন নিয়ে আসত। জলখাবারের সঙ্গে দুধ। দুধ খাওয়া নিয়ে মার সঙ্গে লড়াই। মার তখন মরার ফুরসত থাকত না। বাবা দাড়ি কামাতে ব্যস্ত। শীতকাল হলে তেতলার চাতালে। দাড়ি কামাতে কামাতে মার সঙ্গে কথা বলত।
মা তখন কেমন ছিমছাম ছিল। পরিষ্কার গায়ের রং, আধোভারী চেহারা, হলুদ আর টিয়া-সবুজ শাড়ি পরতে বেশি ভালবাসত মা, ছোট ছোট হাতের জামা পরত, চেপ্টা মোেটা বিনুনি খোঁপা থেকে আধঝোলা হয়ে পড়ে থাকত কাঁধে কাজ করতে করতে যখন-তখন চা খেত গরম করে। বাবার সঙ্গে ঝগড়াও করত, কেন, টিফিনে দুটো টোস্ট খেয়ে পয়সা বাঁচিয়ে আমায় রানি করছ নাকি? কখন দু মুঠো ভাত নাকে মুখে গুঁজে ছোট, টিফিনে ভাল করে খেতে পারো না। ডিম খাবে, কলা খাবে…। যাতে উপকার তাই খাবে। বাবা গোঁফ ছাঁটতে ছাঁটতে নাক কুঁচকে বলত, কলা আমার সহ্য হয় না। তা হলে একটা মিষ্টি খেয়ো৷ ঘরে বাইরে কত মিষ্টি খাব। বাবার গলায় হাসি।
সেই মা কোথায় হারিয়ে গেল, কোথায় যেন মরে গেল সেই বাবা। যা জীবন্ত ছিল তখন, আজ তা মৃত। এখন মাকে দেখলে কেউ বলবে না মা কোনওদিন স্বাস্থ্যবতী, সুশ্রী, সাদামাটা বউ ছিল বাড়ির। মাকে এখন বিশ্রী মোটা, ফোলা, খড়ির মতন সাদাটে, কাঁচা পাকা চুলের এক বুড়ির মতন দেখায়।
সবই দুর্ভাগ্য! বাবা, মা, ছেলে মেয়ে সকলের দুর্ভাগ্য। বাবার যদি চাকরি না যেত, দুর্ঘটনা না ঘটত আজ সংসারের এ অবস্থা হত না। তারা মোটামুটি সুখ-স্বচ্ছন্দে থাকতে পারত। অন্তত আজ যেভাবে আছে–এর চেয়ে নিশ্চয় ভাল। মা ঠিকই বলে বলে বাবার হাত ধরে এ বাড়িতে শনি ঢুকেছে, এ-আর ছাড়বে না।
সিগারেট শেষ হয়ে এসেছিল। বোধন আরও দু-একটা টান দিল, দিয়ে জানলার বাইরে ফেলে দিল। ভাল লাগছিল না। আজ সন্ধের দিকটা তার ফাঁকা। বিকেলেও কিছু করার নেই। কোন দিন বা থাকে। তবু অন্য দিন সুকুমারদার দোকানে গিয়ে বসে থাকা যায়। আজ রবিবার। দোকান বন্ধ। সুকুমারদাকে বাড়িতেও পাওয়া যাবে না, বউদিকে নিয়ে চাঁপাতলায় গিয়েছে শ্বশুরবাড়ি। পাড়ার বন্ধুদের মধ্যে আর যারা দু একজন–তারাও কেউ বসে থাকবে না পাড়ায়, কেউ সিনেমায় গিয়েছে, কেউ বা আড্ডা মারতে বেরিয়ে পড়েছে।
