বোধন যেন ঘা খেল। থিয়েটারের শো ছিল বোধ হয়!
তোর বোন থিয়েটার করে! বলিস কী রে! জানতাম না তো!
.
বাজার থেকে বাড়ি ফিরে এসে বোধন দেখল, বাড়িতে খুব হাসাহাসি চলছে। মা হাসছে, বাবাও। চুয়াও হাসছিল। জবাদি মাথার কাপড় কপাল পর্যন্ত টেনে ঘর ঝাঁট দিচ্ছে। কী নিয়ে হাসাহাসি তা অবশ্য বোধন বুঝল না। কিন্তু এ বাড়িতে এমন উদোম হাসি নমাসে ছমাসেও বড় শোনা যায় না।
বোধন মুদির বাজার টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল, সবজি বাজার রেখে এল রান্নাঘরের কাছে।
সুমতি শাড়ি, সায়া একপাশে জড়ো করে রাখছিলেন। কাঁচাকাচিতে দেবেন। চুয়া জানলার কাছে দাঁড়িয়ে।
বোধন বলল, মা, আমি কিন্তু দেড় টাকা বেশি খরচা করে ফেলেছি। সেরকম মাছে এক টাকা বাঁচিয়েছি।
কী কিনেছিস?
সত্যনারায়ণ গরম শিঙাড়া ভাজছিল। জিলিপিও গরম ছিল। মিলিয়ে দেড় টাকার নিয়েছি। বোধন জানে মা গরম জিলিপি খেতে খুব ভালবাসে!
সুমতি বললেন, ভালই হয়েছে। বলে স্বামীকে দেখালেন, তোর বাবাকে খাওয়া। কী মানুষ নিয়ে ঘর করলাম ভগবানই জানেন।
বোধন কিছু বুঝল না। মা হাসি-খুশি মুখে কথা বলছে; রাগ নেই জ্বালা নেই, বরং চোখভরা কৌতুক।
কেন? বাবা?
সুমতি আঙুল দিয়ে টেবিলের দিকটা দেখালেন। তোর বাবা গায়ে দেবার শাল তৈরি করেছে। দেখ। চুয়া, দেখা তো খোকাকে।
চুয়া টেবিলের সামনের চেয়ার থেকে একটা রংচঙে কী তুলে নিল। নিয়ে উঁচু করে বুকের কাছে। নিয়ে মেলে ধরল। বোধন অবাক হয়ে দেখল, বাড়িতে যত পুরনো ছেঁড়া পেঁজা শাল ছিল বাবা তার আস্ত জায়গাটুকু কেটে নিয়ে অন্য শালের সঙ্গে জুড়েছে। বাদামি, কালো, সবুজ সব মিশিয়ে সে এক বিচিত্র চেহারা হয়েছে।
সুমতি হাসতে হাসতে বললেন, এই জিনিস গায়ে দিয়ে কাল শুয়েছিল। বলে বাড়িতে থাকে, ওটা গায়ে দিয়ে শীত কাটিয়ে দেবে।
বোধন হাসতে পারল না। শীত পড়ছে। মা কবেকার একটা রং-মরা মেয়েলি সস্তা শাল গায়ে জড়িয়ে অফিস যায়। বাবা খদ্দরের মোটা চাদর গায়ে জড়িয়ে বসে থাকে। বোধনের একটা কালো রংয়ের সোয়েটার আছে–যা আর পরা যায় না। আর চুয়া বাইরে আসা-যাওয়া করে বলে সেদিন একটা নতুন কী কিনেছে। সস্তার জিনিস। হয়তো তাকে কেউ দিয়েছে।
বাবা অব্যবহার্য পুরনো জিনিস জোগাড় করে শীত বাঁচাবার চেষ্টা করছে। সামনেই শীত। এই শীত কি যাবার?
.
১০.
বোধন ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম ভাঙার পরও তার মনে হচ্ছিল, এখন মাঝরাত। সবই অন্ধকার হয়ে আছে। মা বাবা তাদের ঘরে ঘুমোচ্ছে; বোধন নিজের ক্যাম্প খাটে শুয়ে। এই আচ্ছন্নতা কয়েক মুহূর্তের মধ্যে কেটে গেল, তাকাল বোধন। চুয়া শাড়ির পায়ের দিক ঠিক করে নিচ্ছে।
খেয়াল হল বোধনের, এখন দুপুর। হয়তো বিকেল হয়ে আসছে। সে চুয়ার বিছানায় শুয়ে কাগজপত্র পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছিল।
তেষ্টা পাচ্ছিল বোধনের। এক গ্লাস জল খাওয়াবি?
চুয়ার তখনও যেন কিছু বাকি। আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে… বলতে বলতে বাইরে চলে গেল চুয়া।
বোধন শুয়েই থাকল। খাওয়া-দাওয়া শেষ করতে বেলা হয়েছে। মা আজ তিন চার রকম রান্না করছিল, সাধারণ রান্না। খেতে বেশ হয়েছিল। মাছ-টাছ মা একসময়ে সত্যি ভাল রাঁধত, এখন কালেভদ্রে সেরকম রাঁধে।
জল এনে দিল চুয়া।
বোধন উঠে বসল। জল খেল। কোথায় যাচ্ছিস?
আজ আমার টানা রিহার্সাল! চুয়া বলল। তাকের ওপর রাখা আয়নায় মুখ দেখতে দেখতে কপালের চুল ঠিক করল।
কোথায়?
অনেক দূর যেতে হবে–সেই ভবানীপুর, বলতে বলতে চুয়া মুখে একটু পাউডার মাখল, মুছল। কোথা থেকে লিপস্টিক বার করে ঠোঁট রং করতে লাগল।
তুই আজকাল লিপস্টিকও চালাস?
বা, ঠোঁট ফাটে না?
আজ কোন অফিসের থিয়েটার?
বললাম না রিহার্সাল। অফিসের নয়, আমাদের ক্লাবের।
তোর আবার কোন ক্লাব?
চুয়া নাম বলল। বোধন শোনেনি নামটা, জানেও না। তার কোনও আগ্রহ নেই জানার। বোধন বোনের সাজগোজ দেখছিল। মন্দ দেখাচ্ছে না চুয়াকে। পিঠময় চুল ছড়ানো। বিনুনি করেনি। শাড়িটা নির্ঘাত মার। চওড়া পাড়। পুরনো নিশ্চয়? মার একসময় ভাল ভাল শাড়ি ছিল, তার দু-একটা ছেঁড়া পেঁজা হয়েও থেকে গেছে এতদিন।
শোন, বোধন বলল, তুই একেবারেই রাত করে ফিরবি না। পাড়ায় একটা গণ্ডগোল বাধতে পারে। গৌরাঙ্গ বলছিল।
চুয়া লিপস্টিক রাখল। বাধলে আর কী করব! তা বলে সন্ধের মধ্যে বাড়ি ফিরতে পারব না।
বোধন বিরক্ত হল। কেন পারবি না? একটা ঝামেলার মধ্যে পড়ে গেলে তখন কী হবে?
চুয়া তৈরি। গায়ের শাল নিল। তার ব্যাগ। বলল, এত লোক আসছে যাচ্ছে তারা ঝামেলায় পড়ছে নাকি? অত ভয় করলে কলকাতায় চলাফেরা করা যায় না।
বোধনকে তেমন গ্রাহ্য করল না চুয়া, চলে গেল। সদর দিয়ে যাবার সময় চেঁচিয়ে বলল, জবাদি, দরজা বন্ধ করে দিয়ো৷।
বাড়িতে কারও গলা পাওয়া যাচ্ছে না। মা নিশ্চয় ঘুমোচ্ছ। বাবা কোথায়? বাবাও কি শুয়ে আছে? জবাদি বাসনপত্ৰ মাজতে বসেছে। বাসন মেজে, ঘর মুছে চলে যাবে জবাদি। কটা বাজল? এ-ঘরে ঘড়ি নেই। মার একটা টাইমপিস আছে। সেটা কোনও রকমে চলে। মার নিজেরও ঘড়ি নেই, বাবার একটা ঘড়ি ছিল। সেটা বোধ হয় কোনও সময়ে বেচে দেওয়া হয়েছে।
জানলার আলোর দিকে তাকিয়ে বোধন সময় অনুমানের চেষ্টা করল। শীতের দুপুর। আলো দেখে কিছু আন্দাজ করা যায় না। তবে তিনটে হবে। খাওয়াদাওয়া শেষ করতেই তো দেড়টা বেজে গিয়েছিল। তারপর এক দেড়ঘণ্টা নিশ্চয় কেটেছে।
