মা এতটা সাহস পায় না। সামান্য চাকরি, সহায় বলতে কেউ নেই, মাস কয়েকের ভাড়া যদি জমে যায় আর দেওয়া হবে না। তখন যদি তাড়িয়ে দেয় বাড়ি থেকে একেবারে রাস্তায়।
এই পঞ্চাশটা টাকা মা নিশ্চয় বাড়তি পেয়েছে। কখন কোথায় টাকা কেটেছিল ফেরত দিয়েছে, কিংবা বাড়তি ডি-এ পেয়েছে হুট করে। হয়তো আরও পেয়েছে কিছু। এরকম দু-চার বার মার বরাতে জুটে যায়।
টাকা হাতে এসেছে বলে কি মার মন ভাল? না, তা মনে হয় না। অন্য কারণে হতে পারে, বা এমনিও হতে পারে। প্রত্যহ দুবেলা মানুষ কত আর মন মুষড়ে থাকবে। বোধনদেরও তো এক একদিন মন বেশ ভাল থাকে। অথচ তার কি মন ভাল থাকার কথা?
বোধন?
দাঁড়াল বোধন। তাকাল। গৌরাঙ্গ।
দেখতেই পাস না? গৌরাঙ্গ বলল, তোর জন্যেই দাঁড়িয়ে আছি।
দারুণ চড়িয়েছিস! বোধন হাসল। গৌরাঙ্গ হালকা সবুজ আর হলুদ মেশানো সোয়েটার চাপিয়েছে গায়ে। পুরো হাতা। খুব শীত পড়ে গেছে, তাই না? বোধন ঠাট্টা করল।
নারে, শো দিচ্ছি।
দে।
চা চলবে?
চলতে পারত। কিন্তু বাজার? দেখছিস তো?
রাখ। দশ মিনিটে তোর বাজার উঠে যাবে না। চল, মেঘার দোকান থেকে দু গ্লাস মেরেনি। তোর সঙ্গে কথা আছে।
কিছু আসে যায় না পাঁচ দশ মিনিটে। আজ রবিবার। মার কোনও তাড়া নেই। নিজের হাতে সব রান্নাবান্না করবে। অন্য দিন তাড়াহুড়োর মাথায় কিছু মা রান্না করে, কিছু চুয়া। জবাদিও করে দেয়। আজ জবাদি নীচের তলা থেকে ফিরে এলে কাজকর্ম শুরু হবে সংসারের। বাটনা বাটা, তরকারি কোটা জবাদি সামাল দেবে মাকে। চুয়া বসবে কাপড় কাঁচা নিয়ে। আজ মা আর চুয়ার শাড়ি, জামা, সায়া কাঁচার দিন। তার সঙ্গে টুকটাক আছে। মুশকিল হল এ বাড়িতে কাপড় জামা শুকোতে দেবার জায়গা নেই। হয় ছাদে যাও, না হয় খাবার জায়গাটুকুতে কিংবা জানলার শিক বেঁধে ঝুলিয়ে দাও। বড় বিশ্রী ব্যাপার।
মেঘার চায়ের দোকানে চা খেয়ে বোধন আর গৌরাঙ্গ সামান্য তফাতে দাঁড়াল। রাস্তার ওপর বেঞ্চি ভরতি, এদিক-ওদিকেও চায়ের খদ্দের দাঁড়িয়ে।
গৌরাঙ্গ বলল, তোকে একটা খবর দি। বলাইবাবু-কে চিনিস তো?
বলাই সিংহ?
মাথা নাড়ল গৌরাঙ্গ। কাল একটা দরকারে বলাইবাবুর কাছে গিয়েছিলাম। আমাদের একটা কেস ওঁর কাছে পড়ে আছে চার মাস ধরে। তা কথায় কথায় বলাইবাবু বললেন, ওঁদের ফার্মে ঝামেলা বেঁধে আছে। জনা দুয়েক লোককে হটাবেন। তারা গণ্ডগোল করছে বড়। উনি আমার চেনা-জানা ভাল লোকের কথা বললেন। পাড়ার ছেলে-ছোকরা হলে ভাল হয়। বললেন, আমার ছোট অফিস। চাকরি যদি দিতে হয়–আমি চেনাশোনা পাড়ার ছেলেকে দেব। তাতে আমার স্যাটিসফেকশন আছে। …তোর কথা আমার তখনই মনে পড়ল।
বোধন পাড়ার বলাই সিংহীকে চেনে। তাঁর অফিস আছে তাও শুনেছে। কিন্তু কীসের অফিস জানে না। বলল, বলাই সিংহীর কিসের অফিস?
ক্লেম রিকভারি। মেইনলি ওরা রেলের সঙ্গে কাজ করে। রেলের কাছে পাওনা ক্লেম আদায় করে দেয়। গভর্নমেন্ট ক্লেমও করে।
বোধন তেমন কিছু বুঝল না। বলল, আমায় চাকরি দেবে কেন?
কেন দেবে না? তুই কোয়ালিফায়েড। স্কুল ফাইন্যাল পাশ করেনি এমন লোক দিয়েও কাজ চালায় যখন তখন তোর কেন হবে না? তা ছাড়া তুই পাড়ার ছেলে। তোর কোনও বাজে ব্যাপার নেই। সবাই বলবে, তুই শালা গুড বয়।
বোধন হাসল। গুড বয়?
মেঘার দোকানের বাচ্চাটা চা দিল।
গৌরাঙ্গ চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, আমি কথাটা বলি? যদি বলিস আজই সন্ধেবেলায় যেতে পারি বলাইবাবুর কাছে।
বেশ, বল। আমার আর কী! যা হয় একটা পেলেই হল।
মাইনে কিন্তু কম।
কত?
ঠিক জানি না। তবে ওয়ান টুয়েন্টি ফাইভ কি থার্টি ফাইভ হবে। অফিস লালবাজারের মুখে। কম মাইনের জন্যেই অফিসে গণ্ডগোল চলছে।
বোধন চা খেতে খেতে বলল, গণ্ডগোলের মধ্যে আমার ঢোকা কি উচিত হবে? তারপর আমাকেই ওরা দালাল বলবে। মারধোর করবে।
গৌরাঙ্গ তাচ্ছিল্যের মুখ করল। যা রে শালা, মারধোর করকে অত সোজা! মালিক যদি কাউকে তাড়ায় সে তারা বুঝবে। ইট ইজ নট ইওর ফল্টা…যাক গে, সে বলাইবাবু বুঝবে। তোর কী? তোকে চাকরি দিলে তুই করবি। না দিলে করবি না।
যুক্তিটা বোধন মেনে নিল। তার সত্যি কোনও দোষ থাকে না।
চা-খাওয়া শেষ হলে গৌরাঙ্গ তাকে সিগারেট দিল।
দু বন্ধু বাজারের দিকে হাঁটতে লাগল। গৌরাঙ্গ হঠাৎ বলল, পাড়ার খবর জানিস?
কেন, কী হয়েছে?
গণ্ডগোল চলছে! পলুদের ধরে নিয়ে গিয়েছিল পুলিশ। রজনীরা গিয়ে থানা থেকে ছাড়িয়ে এনেছে। এবার শান্তদের সঙ্গে লাগবে। ভেতরে টেনশন।
কবে ধরেছিল পলুদের?
পরশু রাত্তিরে। কাল সকালে ছেড়ে দিয়েছে।
শুনিনি। তবে পুলিশের গাড়ি কাল দেখছিলাম। বোধন দূরে তাকাল। বাজার দেখা যাচ্ছে। রাস্তায় এখন শুধু বাজার-যাত্রী।
গৌরাঙ্গ বলল, তুই ভেবে দেখ বোধন; এক শালা দমদম লাইনে ছিনতাই পার্টির লিডার। আরেক শুয়ারের বাচ্চা দুবার ডাকাতির কেসে ফেঁসেছে। দুই বানচোতই এখন পাড়ার লেতা। জমেছে ভাল।
বোধন হেসে বলল, বেশি বলিস না, তোকেই ফাঁসিয়ে দেবে!
যা রে শালা, আমায় কী ফাঁসাবে! …নে তুই আলু পটলে চলে যা–আমি একবার ঠনঠনিয়া যাব। মাসির বাড়ি। …তা হলে ওই কথা রইল। বলে হাত নেড়ে চলে যাচ্ছিল গৌরাঙ্গ, হঠাৎ ডাকল বোধনকে। বলল, তোর বোনকে বলবি, অত রাত করে যেন না ফেরে। বাস স্টপের পাশে তেঁতুলতলাটা ক্রিমিন্যালদের আড্ডা হয়ে গিয়েছে! সেদিন মিনিবাসে একসঙ্গে ফিরেছি। ওকে রিকশা করে নিয়ে এসেছি। …কোথায় যায় ও?
