সবজি বাজারের ফর্দ মা আরও টুকটাক বলল। দেখিস না যদি চিংড়ি মাছ পাস। ঘোট ঘোট বাগদা!
অনেক দাম নেবে। বোধন বলল, আঠারো কুড়ি।
তোদের কাছে সবাই দাম নেয়। রেবা বলছিল, বারো চোদ্দ করে বেচে তাদের বাজারে। এ বাজারে কি সবই গলাকাটা…?
মা, তোমার সব কিছুতেই রেবা, চুয়া বলল, সামান্য বিরক্ত হয়েই, কাছেই ছিল চুয়া, রেবা মাসি পাঁচ বললে পাঁচ, সাত বললে সাত। টালিগঞ্জের বাজারটা কি রেবা-মার্কেট! নিজে একদিন বাজারে গিয়ে দেখো না…।
মেয়ের বিরক্তি সত্ত্বেও সুমতি রাগ করলেন না। বললেন, ওদের দিকের বাজার ভাল। সস্তা। এখানে সব ডাকাত।
শিবশংকর খবরের কাগজের পাতা ওল্টাচ্ছিলেন। আজ রবিবার। অন্যদিন পাঠকবাবু কাগজ পড়া শেষ করে অনেকটা বেলার দিকে পাঠিয়ে দেন শিবশংকরকে। চোখ বুলিয়ে ঘণ্টা খানেক পরে সেটা ফেরত পাঠাতে হয়। টানাটানির সংসারে সুমতি খবরের কাগজের জন্যে বাড়তি খরচ করতে নারাজ। শিবশংকর যে ক্রস ওয়ার্ডের জন্যে ইংরেজি কাগজ কেনেন সেটা ছেলেমেয়ের কাছে চেয়ে চিন্তে। স্ত্রীর মন বুঝে যে দু-এক টাকা না নেন তাও নয়। এনট্রি ফি-র বেলাতেও তাই।
রবিবারের কাগজের ব্যাপারটা আলাদা। ওটা বোধনের।
কাগজ পড়তে পড়তে শিবশংকর বললেন, চিংড়ি মাছ এখন ফরেনে চালান যাচ্ছে। বাজারে মাছ আসবে কোথায়? ক বছর আগেও সাত-আট টাকায় ভাল বাগদা, দশ টাকায় গলদা পাওয়া যেত মানিকতলা বাজারে। বলে স্ত্রীর দিকে তাকালেন।
সুমতি বললেন, সবই বিদেশে যাচ্ছে; এ-দেশে আর থাকছে কী! ভাবলে মাথা গরম হয়ে যায়। …হ্যাঁ গো, তোমার মনে আছে–যে বছরে আমরা রাজকেষ্টবাবুদের বাড়ি ভাড়া নিলাম–তখন চার পাঁচ টাকায় অঢেল বাজার হত না? পাঁচ ছ জনের সংসার দুবেলা হেসেখেলে চলে যেত। চার টাকা সাড়ে চার টাকায় বড় বড় পারসে মাছ, সোয়া তিন টাকায় সরষের তেল কিনেছি, খাঁটি তেল, চিনি সাত সিকে। আর এখন–যেমন কয়লা তেমনি তেল ডাল চিনি, সেই রকম শাকসবজি। মানুষ বাঁচবে কী করে?
বাঁচাতে চাইছে না তো বাঁচবে! শিবশংকর বললেন।
বোধন কদাচিৎ, কালেভদ্রে মাকে এমন সহজ,নরম, শান্ত মেজাজে দেখতে পায়। ঘুম থেকে উঠেও মার মুখচোখ প্রসন্ন থাকে না, কেমন এক বিরক্তি, অবসাদ, রুক্ষতা নিয়ে দিন শুরু করে মা, সারাদিন সেটা বাড়ে–বেড়েই যায়–জ্বর বাড়ার মতন, তারপর রাত্রে মা প্রায় বিকারগ্রস্ত রোগীর মতন হয়ে থাকে। আজ মা অন্য রকম। কেন কে জানে! বোধনের ভাল লাগছিল।
সুমতি মেয়েকে বাজার আর মুদিখানার জিনিসপত্র গুছিয়ে দিতে বললেন। একসঙ্গে আনবি, না আলাদা আলাদা!
একসঙ্গেই আনি, বোধন বলল। তেল, ডাল, সাবান–মুদিখানার ফর্দ যতই হোক–সবই দুশো আড়াইশো গ্রামের ব্যাপার, কাজেই অসুবিধের কিছু নেই। এবাড়িতে এভাবেই জিনিসপত্র আসে, দিন দুই তিন চলার মতন। মাসকাবারি বাজার আগে আসত, বাবার আমলে। এখন আর কেমন করে আসবে!
চুয়া রান্নাঘর থেকে সরষের তেলের শিশি, গুড় আনার জন্যে ছোট টিফিন কৌটো, এটা-ওটা এনে বাজারের থলি সমেত বোধনের হাতে দিল।
চা কিন্তু নেই আর, চুয়া বলল।
চা আনিস, সুমতি মাথার চুল মুঠো করে এনে নাকে গন্ধ শুকলেন, নিজেই নাক কোঁচকালেন। একশো বেসম আনিস তো খোকা, মাথা ঘষব!
বোধন মার চুল দেখছিল। কত চুল পেকে গিয়েছে মার। এখন বুড়ি বুড়ি মনে হয়। অথচ এমন কি বয়েস মার! পঁয়তাল্লিশ ছেচল্লিশ হবে। বিনুর মা মার একেবারে সমবয়সী না হলেও কাছাকাছি তো নিশ্চয়। অথচ বিনুর মার পাশে মাকে অনেক বড় দেখাবে! সচ্ছলতা আর নেই নেই-এর এই তফাত বোধ হয়। একজন যতটা সম্ভব নিজেকে রাখতে পারে, অন্য জন পারে না।
বোধন চলে যাচ্ছিল, শিবশংকর স্ত্রীর দিকে তাকালেন, পাঁচটা সিগারেট হবে না?
সুমতি প্রথমে স্বামীর দিকে তাকালেন–তারপর ছেলের দিকে। তোর বাবার ভিক্ষে চাওয়ার বহর দেখছিস! আনিস। একটা গোটা প্যাকেটই আনিস। .. বলে আবার স্বামীর দিকে তাকালেন, তুমি চুরুট খেতে পারো না? আমাদের ক্যাশের দাসবাবু ছোট ছোট চুরুট খায়। পাঁচ পয়সা না কত যেন। দিনে তিন চারটেতেই কুলিয়ে যায়। তোমার যত বিড়ি-ফিড়ির নেশা। তাও আবার নিবিয়ে নিবিয়ে খাওয়া। কী দুর্গন্ধ। অতই যদি নেশার প্রাণ–পান-জরদা খাও। খোকা, পান আনবি, সুপুরি। অর্ধেক দিন মুখে পান দিতে পারি না।
বোধন আর দাঁড়াল না। বেলা হয়ে যাচ্ছে। আজ রবিবার। সবাই হেলেদুলে বাজারে যাবে। মাংসের দোকানে লাইন মারবে, মাছ নিয়ে কাড়াকাড়ি করবে, কপি কিনবে উবু হয়ে বসে, বেগুন টিপবে। খাবার শখ সকলেরই। সাধ্যও অনেকের আছে নিশ্চয়, নয়তো দামের জিনিস বিকোয় কেমন করে? ঘুষবাবুরা সংখ্যায় বাড়ছে মানুষ বাড়ার মতন। একটা স্ট্যাটিসটিক্স থাকলে হত। গভর্নমেন্ট কেন ঘুষবাবু ওভারটাইম বাবুদের হিসাব রাখে না।
দোতলা থেকে বোধন নীচে নেমে গেল।
পঞ্চাশটা টাকা মা ঝপ করে বের করে দিল এটাই আশ্চর্যের। কোথথেকে পেল মা। পরশু দিনও বলেছিল, তিন মাসের ভাড়া বাকি পড়ে গেছে। সরকারি বাড়ি বলে কোনও তাগাদা নেই। এখানে অনেকে পাঁচ সাত এমনকী এক বছরের ভাড়া বাকি রেখেও দিব্যি বসে আছে। গ্রাহ্যই করে না। ভাবটা এমন, সরকারি বাড়ির আবার ভাড়া কী? কাগজে মাঝেমাঝে বেরোয় লাখ কয়েক টাকা নাকি বাকি পড়ে আছে গভর্নমেন্টের হাউসিংয়ে। বেড়ে আছে সব। গৌরী সেনের বাচ্চা।
