হতে পারে যে বোধন জানে। লোডশেডিং হলে বিনু একটা বড় টেবিল ল্যাম্প এনে টেবিলে বসিয়ে দেবে। কাকা কিনে এনেছেন চাঁদনি থেকে। বাতিটা দেখতেই বড়। আলো তেমন হয় না। পড়াশোনার গরজ এমনিতেই বিনুর নেই, আলো চলে গেলে একেবারেই থাকে না। তখন শুধু আজেবাজে গল্প। বোধনের নিজের তাতে আক্ষেপের কিছু নেই। সে এত কম বোঝে যে পড়ানোর ব্যাপারটা যত কম হয় ততই তার সুবিধে।
বিনু সামান্য চুপচাপ ছিল। এবার বলল, মা খানিকটা ভিতু গোছের। কাকার ফিরতে দু তিন দিন দেরি হয়। বুধবার শুক্রবার তো হবেই। তোমায় মা এই সময়টায় সন্ধেবেলায় হাতছাড়া করতে চায় না।
কথাটা বোধনের কানে লাগল। কেন! তুমি তো বাড়িতেই থাকো!
দূর, আমার ওপর কি ডিপেন্ড করা যায়! মার ওই রকম হলে আমিই ভয় পেয়ে যাই।
বোধন জানে, এর মধ্যেও বিনুর মার আবার একদিন ফিট হয়েছিল। রাত্রে! বিনুর কাছে শুনেছে। তারপর আর হয়নি, বলল, রোগটা সারানো যায় না?
কই! সারছে কই! আগে আরও বেশি বেশি হত। যখন-তখন। বাবা মারা যাবার পর থেকেই শুরু। কাকা আগে তো আমাদের বাড়িতে ঠিক থাকত না। কাছাকাছি থাকত। বাবা মারা যাবার পর আমাদের সঙ্গে থাকে। কাকাই মার সব দেখাশোনা করত। মা তখন যেখানে সেখানে ফিট হত। খেতে বসে, বাথরুমে, কাজ করতে করতে…! মুখে থুতু উঠত গেঁজার মতন, মুখ নীল হয়ে যেত। কত ওষুধপত্র খেয়েছে। কিছু হয়নি।
বড় বাজে রোগ। তোমায় বলেছি না, আমার পিসির হত। বিধবা হয়ে এল পিসি তার পর থেকেই। মেয়েদেরই হয় এটা।
হয়! মার আগে যত হত, এখন আর হয় না। বয়েস বাড়লে নাকি কমে যায়। মা তখন ছিপছিপে ছিল। এখন তো মোটাসোটা হয়ে গিয়েছে। রোগা শরীরেই নাকি বেশি হয়। তখন কিন্তু ফিটের পর এত শরীর খারাপ হত না। আজকাল হয় কম, কিন্তু একবার হলে একদিন দেড়দিন সামলে উঠতে লাগে।
বোধন কোনও কথা বলল না। বিনুর মার ফিট হয়ে পড়ে থাকার দৃশ্য আবার তার চোখের মধ্যে ভাসতে লাগল। এলোমেলো শাড়ি, বুকে কাপড় নেই, জামা ভিজে, নীচের জামা আঁট হয়ে আছে।
আচমকা বোধনের মনে হল, সে যা মনে মনে দেখছে বিনু যেন তা বুঝতে পেরে তার দিকে তাকিয়ে আছে। বোধন তাড়াতাড়ি বলল, পিসিকে দেখতাম একাদশী-টেকাদশী হলেই এ-রকম বেশি হত। বোধ হয় উইকনেসের জন্যে।
বিনু মাথা নাড়ল! মা একাদশী করে না! …মার অন্য ব্যাপারে হয়। বেশি ভাবলে, রাগ হলে, দুশ্চিন্তা করলে। মা বড় অদ্ভুত। কখনও চেঁচামেচি করবে না, ছটফট করবে না, যা হবে সব পুষে রাখবে। তারপরই ওই রকম। সেদিন তো তাই হল। আমার বড় ডাক্তার দেখাবার কথা উঠল। কাকা নানা করছিল; কাজ ছিল কাকার। মা রেগে গেল। কাকা তখন বলল, বেশ ব্যবস্থা করবে।
বোধন এই খবরটা জানত না।
বিনু আপন মনে হাত থেকে চুড়ি খুলতে লাগল। এক হাত থেকে খুলে অন্য হাতে পরছিল। নিচু মুখেই বলল, একটা কথা বলছি কাউকে বলবে না?
বোধন অবাক।
প্রমিস করো।
করলাম।
বিনু অর্ধেক চুড়ি অন্য হাতে পরে নিল। মা আমার তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দিতে চায় এই জন্যেই। রাজু আমায় দেখবে। খুব ভাল রাজু। আমায় কী যে ভালবাসে!
বোধন বিনুর মুখ দেখছিল। রোগা, কালচে মুখ, টানা টানা চোখ, কিন্তু কী সুন্দর দেখাচ্ছে বিনুকে। সারা মুখে মালিন্য নেই, জটিলতা নেই, একেবারে সরল, স্নিগ্ধ।
বিনু কেন যেন মুখ নামিয়ে নিল, বলল, আমাদের অনেক ইয়ে রয়েছে। তুমি বুঝবে না। মা আমার বিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চায়। আমার বিয়ে হয়ে গেলে মার মাথা থেকে বোঝা নেমে যাবে। মা বাঁচবে।
বোধন চুপ করে থাকল। সে এ বাড়িতে আসা-যাওয়া করতে করতে অনেক কিছু দেখছে। অনুমান করতে পারছে। নিজেকে সামলে নিয়ে বোধন বড় করে নিশ্বাস ফেলল। তারপর খানিকটা যেন ঠাট্টার গলায় বলল, তোমার বিয়ে হয়ে গেলে আমার লোকসান হবে। ফাঁকিতে পঞ্চাশটা টাকা পাচ্ছিলাম। আর পাব না।
বিনু বলল, পাবে না। আর কাকাও তোমায় কোনওদিন চাকরি করিয়ে দেবে না। কাকা পারে, তবু দেবে না। মা কাউকে এতটুকু ভালবাসলে কাকা সহ্য করতে পারে না।
বোধন বিনুকে অপলকে দেখছিল।
.
০৯.
সুমতি হাত বাড়িয়ে টাকা দিলেন।
বোধন অবাক হয়ে গেল। মা ভুল করেনি তো?
কোলের ওপর ব্যাগ রেখেই সুমতি আবার একবার ছোট করে হাই তুললেন। চোখের তলা ছল ছল করছে। পাতা ফোলা। মুখটাও ফুলে আছে।
বোধন টাকাটা দেখছিল। পঞ্চাশ টাকার নোট। বাজারের জন্যে পাঁচ টাকাই বরাদ্দ, কোনওদিন বাড়তি কিছু আনতে হলে দু-এক টাকা বাড়ে। আবার যখন টানাটানি থাকে তখন কমেও যায়।
সুমতি বাকি চাটুকু খেয়ে নিলেন।
মুদির দোকানে যেতে হবে। মুখে বলব,না লিখে নিবি? সুমতি বললেন।
মনে থাকবে, বলো।
সুমতি বলতে লাগলেন: তেল, মুগের ডাল, আখের গুড়, গায়েমাখা সাবান একটা, সস্তার কাপড় কাঁচা গুঁড়ো সাবান, একশো সোড়া, এক প্যাকেট ধূপ।
মুদি শেষ করে সবজি বাজারের ফর্দ ধরলেন সুমতি। আলু, আদার পরই জিজ্ঞেস করলেন, গাঁয়ের চাষিদের কাছ থেকে একটা ফুলকপি নিতে পারবি না? তোরা দরদাম করতে পারিস না। রেবারা টালিগঞ্জ বাজারে এক টাকা পাঁচ সিকেতে কপি কেনে! শীত পড়ে গেল, এখনও কপির অত দাম হবে কেন?
বোধনের হাসি পাচ্ছিল। মা শাকসবজি যখনই কিছু আলাদা করে আনতে বলে–গাঁয়ের চাষিদের কথা মনে করিয়ে দেয়। চাষিরা তো গাঁয়েরই, কলকাতার কবে হল? তবে এ গাঁ তো খালের পাশে, না হয় নারায়ণপুর আর কেষ্টপুর। তারা চালাক হয়ে গিয়েছে।
