বাথরুমে মা জল ঢালছে। গা ধুচ্ছে। গা ধুয়ে সামান্য জিরাবে, তারপর রাত্রের সামান্য কিছু রান্না।
লোকটা মাকে খুব খাতির করে ঝালমুড়ি করে দেয়, বোধন আর এক মুঠো নিল। সে চাইছিল, বাবা দু মুঠো খাক। যদি না খায়, মা আবার যে কী করবে কে জানে!
শিবশংকর কিছুই বললেন না। তাঁর বসা বিষণ্ণ চোখ যেন ছলছল করছিল।
বোধন খুব মৃদু গলায় বলল, মা চটে যাবে। একটু খাও।
শিবশংকর মাথা নাড়লেন। তিনি খাবেন না।
.
০৮.
বিনু এক হাতে অনেকগুলো চুড়ি পরেছিল। তার রোগা লিকলিকে হাতে চুড়িগুলো ঢলঢল করছে। হাত নাড়লেই শব্দ হচ্ছিল। ইচ্ছে করেই শব্দ করছিল বিনু।
বোধন বলল, এত চুড়ি পরেছ কেন? ঠাট্টা করেই বলল।
ইচ্ছে হল।
তোমার?
বিনু ভুরু বেঁকাল যতটা পারে, আমার কত সোনা আছে, জানো?
বোধন হেসে ফেলল। না। কত?
পঁচিশ ভরি। …এসব আমার বাবার দেওয়া।
বোধন এবার খানিকটা অবাক হল। বলল, তোমার হাতে অত বড় বড় দেখাচ্ছে।
মার হাতের মাপে তখন হয়েছিল। করিয়ে রেখেছিল বাবা। বড় হয়ে আমি পরব।
আচ্ছা!
বিনু তার মেয়েলি গরম ভেস্টটা আলগা করল। কাল পরশু শীত পড়ল। আজ আবার কমে গেল। আমার গরম গরম লাগছে।
বোধনের লাগছিল না। বিনুর লাগতে পারে গরম। দু তিন প্রস্থ জামা। বোধনের জামার তলায় গেঞ্জিও নেই। ঠাট্টা করে বোধন বলল, সোনার গরম।
বিনু এবার আড়চোখ করে বোধনকে দেখল! হাসি হাসি ঠোঁট। বলল, এ আর কী গরম! পরে দেখবে।
বোধন মাথা চুলকে নিল। রগড় করেই। তারপর বলল, নাও, অঙ্কটা করো।
বিনু ডট পেন ফেলে দিয়ে দু হাত ছড়িয়ে আলস্য ভাঙল। তুমি অত মাস্টারি কোরো না তো! কী হবে অঙ্ক করে! একটা গাড়ি যত জোরে যায়–যাক। আমার বয়েই গেল! ভেলোসিটির নিকুচি করেছে।
বাঃ, পড়বে না?
ধ্যুত, পড়ে ঘোড়ার ডিম হবে। …ভাল লাগে না।
কী করবে তবে? বোধন সরলভাবে বলল, হালকা গলায়।
বিনু চোখ বুজে ভাবল যেন, তারপর বলল, বিয়ে।
বোধন থমকে গিয়েছিল, পরে হেসে উঠল! জোরে, বেশ জোরে।
বিনু বলল, হাসছ কেন! বিয়ে তো আমার ঠিকই করা আছে।
বোধনের হাসি তখনও থামেনি। কোথায়?
দিল্লিতে। …আমরা আগে দিল্লিতে ছিলাম জানো তো? বাবা মারা যাবার পরও কিছুদিন ছিলাম। তারপর কাকা কানপুরে এল। সেখান থেকে কলকাতায়।
না-জানার কারণ নেই বোধনের। এসব কথা তো উঠেই থাকে যখন-তখন। বিনু এখনও দু চারটে হিন্দি বুলি মিশিয়ে দেয় বাংলার সঙ্গে। দিল্লিতে বছর সাত পর্যন্ত ছিল বিনু। তারপর কানপুরে তিন চার বছর। শেষে কলকাতায়। তিন জায়গার জল বিনুকে আর যাই করুক পড়াশোনায় মতি দেয়নি।
বোধন মজার গলায় বলল, তোমার কি দিল্লিতেই বিয়ে হচ্ছে?
বিন্দুমাত্র আড়ষ্ট হল না বিনু, যেন তার কোনও মেয়ে বন্ধুর সঙ্গে ব্যক্তিগত কথা বলছে, বলল, হচ্ছে তো! রাজুর পড়াশোনা সব শেষ। চাকরিও পেয়ে গিয়েছে। এখনই আয় নশো। চণ্ডিগড়ে পাঠিয়ে দিলে আরও বাড়বে, কোয়ার্টার পাবে।
বোধন অবাক হয়ে যাচ্ছিল। বিনু বরাবরই সাদামাটা, সরল, সোজাসুজি কথা বলে। কিন্তু নিজের বিয়ের কথা, যে ছেলের সঙ্গে বিয়ে হবে তার কথা যেভাবে বলছিল এমন করে কোনও মেয়ে বলতে পারে কোনও ছেলের সামনে সে জানত না। বিনু কি সত্যি কথা বলছে? মিথ্যেই বা কেন বলবে? বোধনের কেমন কৌতূহল হল। যে-ছেলেটির কথা বলল বিনু সে নিশ্চয় বিনুর চেনাজানা। কতটা চেনাজানা?
চেনা ছেলের সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে তবে? বোধন সরল গলা করে বলল।
বাঃ, আমার ইনু মাসির ছেলে তো রাজু। একসঙ্গে খেলেছি, ঘুরে বেরিয়েছি। রাজু কানপুরে এসেছে দু বার। কলকাতায় একবার। কলকাতা একেবারে লাইক করে না।
বোধন খানিকটা ঘাবড়ে গেল। মাসির ছেলের সঙ্গে বিয়ে হয় কী করে? নিশ্চয় নিজের মাসি নয়। কিংবা হতেও পারে। আজকাল কত কী লোকে মানে না।
বইয়ের পাতা ওলটাল বোধন অকারণে। হাসল। আজ কি তাহলে তোমার বিয়ের গল্পই হবে? অঙ্কটা করবে না?
মাথা নাড়ল বিনু। ভাল লাগছে না।
বিয়ের তো দেরি আছে, বোধন মজা করে বলল।
না না, কে বলল। জানুয়ারির লাস্টেই হয়তো বিয়ে। বলে বিনু হাতের চুড়ি দেখাল। এই সব চুড়ি ভেঙে আবার গড়তে দেওয়া হবে। সেই জন্যেই তো পরেছি। দুদিন বাড়িতে পরে নিই।
বোধন বই বন্ধ করল। তা হলে আর আমি বসে থেকে কী করব? উঠি?
ইস! উঠবে মানে! মা ফিরুক। বিনু ভুরু কোঁচকাল।
মাসিমা কোথায় গেলেন?
সামনের বাড়িতে। লম্বুর বউয়ের শরীর খারাপ হয়েছে–ডাকতে এসেছিল লম্বুর মা।
লম্বু? লম্বুটা কে?
লম্বুকে চেন না? ও-বাড়ির ছেলে। বাঁশের মতন লম্বা। আমরা লম্বু বলি।
বোধন গলা ছেড়ে হো হো করে হেসে উঠল। ফণীদার দারুণ নাম দিয়েছে তো বিনু।
বোধন বলল, ফণীদা শুনলে তোমায় মারবে।
একেবারেই নয়! লম্বুদা আমার কত ভালবাসে। দেখলেই হাসে।
বোধন কথা পালটাল। মাসিমা অনেকক্ষণ গিয়েছেন।
আসবে এখুনি। বোসোনা। যাবে কোথায়? বলে বিনুকী ভেবে আচমকা জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, তুমি এই সন্ধেবেলাটা ঠিক করে নিলে কেন? সকালে কী কর?
বোধন খানিকটা অবাক হল। বলল, আমি ঠিক করব কেন! তোমরাই করেছ! মাসিমা বললে, শীতের দিন, সকালে হুড়োহুড়ি হয়, তোমার কলেজ থাকে…।
বিনু বললে, আর সন্ধেবেলায় লোডশেডিং হয়…।
হয় তো! মাঝে মাঝে দু চার দিন ভাল থাকে একটু, আবার হয়। আজ এখনও হয়নি।
টুকলে তো! এই বার হবে।
