১৯.
সেদিন দোকানের বউনি শুরু করেছিলাম ভোজবাজি শিক্ষা দিয়ে।
২০.
চৈত্র মাসটা খাঁ খাঁ করে উঠল। আমাদের বস্তিতে নটু পালের বউ বেশ্যা হল, কার্তিক ছুতোর বসন্ত হয়ে মরল, শৈলবালা বঁটি দিয়ে সোমত্ত মেয়ের পা কুপিয়ে দিল। কেন, কী করে, কেমন ভাবে ঘটনাগুলো ঘটে যাচ্ছে কে জানে! ঘটছে দেখছি, চোখের সামনে হুট হাট ঘটে যাচ্ছে। সমস্তই ভোজবাজি। সহদেবদার বউয়ের পেটে বাচ্চা আসাটাও বোধ হয়।
২১.
সহদেবদার বাড়ি যাওয়া বন্ধ করেছিলাম। দুপুরে দোকানের কাছাকাছি এক হোটেলে ভাত খেতাম। পাঁচ টাকা মাইনে বাড়িয়ে দিয়েছিল সহদেবদা। মানুষটার মেজাজ আরও দরিয়া হয়ে গিয়েছিল। মুখ ফুটে চাইলে আরও পাঁচটা টাকা বেশি দিতে না করত না। সহদেবদার এই ডগমগে ফুর্তির ভাবটা আমি হামেশাই লক্ষ করতাম। মাঝে মাঝে অসম্ভব রাগ হত। লোকটা এত বোকা গাড়োল অঙ্ক কী করে হল।
২২.
ও বাড়িতে একদিন ঘটা করে সত্যনারায়ণ পুজো হল। বউ যাতে ভালয় ভালয় বিয়োয় সহদেবদা সেই আশায় পুজো-আচ্চা তুকতাক কিছু আর বাকি রাখছিল না। সত্যনারায়ণের নেমন্তন্ন রাখতে আমরা তিন জনেই গিয়েছিলাম–আমি, দাশমশাই আর দুলাল। বাড়িতে অন্য লোকজনও এসেছিল। সহদেবদার বউকে অল্পের জন্যে একবার দেখেছিলাম। পেট-ঝোলা হাঁসের মতন হাঁটছিল। উত্তর দিকের ঘর থেকে এল, বারান্দায় সত্যনারায়ণের পুজোর কাছটায় এসে গড় হয়ে প্রণাম করল, শান্তির জল মাথায় নিয়ে চলে গেল। ওর গায়ের কোরা ফাঁপানো শাড়িটা যেন চালচিত্তিরের মতন চটক দিচ্ছিল।
২৩.
ফেরবার পথে দাশমশাই সহদেবদার বাড়ির কথা আমার কাছে খাটো গলায় গল্প করলেন। সহদেবদার বউ বাপের একমাত্র সন্তান, বাপের কিছু সম্পত্তি আছে, নেবুতলায় বাড়ি আর চালু তেলকল। বুড়ো বছর খানেক হল চোখ বুজেছে। মরার আগে মেয়ে-জামাইকে ভাসিয়ে দিয়ে গেছে। বেঁচে থাকতেই জামাইয়ের ওপর হাড়ে হাড়ে চটা ছিল বুড়ো; ভাবত, বেজাত বেজন্ম এই ছোঁড়াটাই তার মেয়েকে পটিয়ে পাটিয়ে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে গেছে। আসলে ওই মেয়েতেই এই ছেলেকে গিথেছিল। …বড্ড রাগ বুড়োর, মেয়ে জামাইয়ের ওপর। সম্পত্তির কানাকড়িও দেয়নি; উইল করে গেছে। মেয়ের যদি ছেলেমেয়ে হয় পুরো সম্পত্তি তাদের বর্তাবে নয়তো ও-সম্পত্তি বুড়োর ভাইপোদের। দাশমশাই বিড়িতে টান দিয়ে বললেন, বুড়োর ভাইপোরা এই সম্পত্তি লুটতে শুরু করেছিল। আমাদের বাবু আর তাঁর পরিবার হাত কামড়ে মরছিল এতদিন। নিজের পাতের ঘি–অন্যে চেটেপুটে খাচ্ছে মানুষ কাঁহাতক আর সহ্য করে!
২৪.
সহ.দেবদার বউকে এরপর আমি যথার্থ করে চিনলাম। বাজির দৌড় জেতবার জন্যে সে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। মাথার কাঁটা তার কিছু কমতি ছিল না। আঁকশির মতন এই কাঁটা সে আরও কত ছড়িয়েছিল কে জানে। তবে ছড়িয়েছিল। নয়তো ছ বছর ধরে যে সহদেবদা কাজে আসেনি–সেই সহদেবদা হঠাৎ কাজে আসত না। সহদেবদার নিজের গুপ্তকথাও আমি কিছু কিছু জানতাম। কবিরাজি হাকেমি নানান ওষুধ খেত ও! বলত, আমার লাইব্রেরির বশীকরণও যেমন ভুসি মাল বুঝলি ফটিকচাঁদ, এশালাও সব তেমনি…কিছু হয় না।
২৫.
সহদেবদার বউকে চিনতে পেরেছিলাম, চিনতে পারিনি সহদেবদাকে। বড্ড সাদামাটা ভাল মানুষ লোক, তার ঘরে অন্যে সিঁধ কেটেছে এবুঝি স্বপ্নেও ভাবত না। শেষ পর্যন্ত নিজের পৌরুষেই সে জিতেছে–মানুষটা এই আনন্দে গর্বে ভরপুর হয়েছিল।
২৬.
বেশ কয়েক মাস পরে সহদেবদাকে আমি চিনতে পারলাম। বাড়িতে সহদেবদার বউয়ের আজকাল অবস্থা। পাক্কা তিন দিন কামাইয়ের পরে দোকানে এল সহদেবদা। তখন সন্ধে হয়ে গেছে, আমরা দোকান বন্ধ করছি। সহদেবদার চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল, আমাদের যেন শ্মশানে যাবার জন্যে ডাকতে এসেছে। দাশমশাই ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন, আমি চমকে উঠেছিলাম, বোবা দুলাল দোকানের দরজার সামনে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দাশমশাইয়ের গলা থেকে স্বর বেরুচ্ছিল না, তবু তিনিই আধ-খাপচা বেয়াড়া স্বরে শুধোলেন, বউমা? .সহদেবদা মাথা নেড়ে বিড়বিড় করে বলল, ঠিক আছে, বেঁচে আছে। আমরা তিনজনে নিশ্চিন্ত হলাম খানিকটা। ..দাশমশাই আর দুলালকে বিদায় করে দিয়ে সহদেবদা বলল, আমায় একটু জল খাওয়া। জল খাওয়ালাম, চা সিগারেট এনে দিলাম। সহদেবদা দু হাতে মাথা ঢেকে চুপ করে বসে থাকল। মাঝে মাঝে মুখ উঠিয়ে রাস্তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছিল। আমার সঙ্গে কথা বলছিল না, যেন সে একা একটি মানুষ এই ঘরে বসে আছে। ধীরে ধীরে রাত হয়ে উঠল। দোকানের বইয়ের আলমারির ফাঁক-ফোকর থেকে দু একটা ইঁদুর বেরিয়ে এল, কড়িকাঠের ওপর থেকে টিকটিকি ডাকল, ট্রামের টিকিতে আগুন ঝলসে দোকানের সামনেটা পলকের জন্যে আলো হয়ে উঠল। …চমক ভাঙল সহদেবদার। বলল, দোকান বন্ধ কর। …কাঠের পাল্লা লাগাতে লাগাতে দেখলাম, দোকানের ক্যাশ খুলে মুঠো ভর্তি করে যা পারল পকেটে পুরে নিল সহদেবদা। দরজায় তালা লাগাচ্ছি সহদেবদা একটা রিকশা থামাল। রিকশায় বসে আমায় ডাকল, উঠে আয় ফটিক।
২৭.
আমরা বেশ্যাপাড়ায় এলাম। গলিটা যেখানে শেষ হব হব, সহদেবদা রিকশা থামাল, নামল। গোটা একটা টাকাই দিয়ে দিল রিকশাঅলাকে। আমায় বলল, ভাল দেখে একটা মেয়েছেলে বাছ–বলতে বলতে সহদেবদা কপা এগিয়ে পাশের দোকানটায় চলে গেল।
