চন্দ্র শীল। আমি কণা
০৯.
সেই থেকে আমার তারিণী লাইব্রেরিতে চাকরি। দিনের বেলা সহদেবদার বাসায় খেতে পেতাম, মাস-মাইনে পঁচিশ টাকা। আমি নতুন, পুরনো কর্মচারী আরও ছিল দেড়জন। দাশমশাই আর দুলাল। দুলালটা বাচ্চা, বছর চোদ্দ-পনেরো বয়স। ছেলেটা বোবা-হাবা, কথা বলতে পারত না, কিন্তু কাজকর্ম করত চমৎকার। সহদেবদা দুলালকে সব সময় নন্দদুলাল বলে ডাকত। কেন, কে জানে?
১০.
শহর কলকাতা দেখতে দেখতে কবে যেন সয়ে গেল আমার। সহদেবদা বলত: কলকাতায় এলে ফিলটার করা জল খাওয়া যায় বুঝলে ফটিকচাঁদ, আয়নার মতন রং জলের। এ-জল পেটে ধরে গেলে অন্য জল মুখে সরে না আর। ঠাট্টা করেই বলত সহদেবদা। আর দোকানের তক্তায় তবলার বোল বাজিয়ে কলকাতার গান গাইত:
তুমি যে পরের সোনা আগে তা ছিল না জানা…
সহদেবদার বুড়ো আঙুল থেকে আরও একটা ছোট কচি আঙুল বেরিয়েছিল। ডান হাতটা উপুড় করলে বুড়ো আঙুলটা চেপ্টা মাথা-ভাঙা মাগুর মাছের মতন দেখাত। একদিন সহদেবদা আমায় বলেছিল, আমাকে তুই একলব্য করে দিতে পারিস ফটিকচাঁদ, এই আঙুলটা দেখলে বউ শালী বড় ঘিন ঘিন করে।
১১.
সহদেবদার বউ দেখতে ভাল ছিল। বেশ কটকটে ফরসা রং, মাটির সরার মতন গোল মুখ, চোখ দুটি ছিল ভয়ংকর টানা টানা–যেন কাজললতা। …দুপুরের আগে আগে আমি খেতে যেতাম, সহদেবদা দোকানে থাকত, আমি ফিরে এলে সহদেবদা চলে যেত। সহদেবদার বউ আমায় পাত পেড়ে খেতে দিত। প্রথম প্রথম কথাবার্তা বলত না, পরে বলত। গলার স্বরটা কিন্তু মোটা মোটা ছিল তার।
১২.
একদিন ভাতের মধ্যে একটা মাথার কাঁটা পেয়ে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। সহদেবদার বউকে আমার ভয় করত। কপালের চারপাশ থেকে টেনে কষকষে করে চুল বাঁধত সহদেবদার বউ, বিড়ের মতন মস্ত খোঁপা করত, সরার মতন গোল মুখটা তাতে যেন রুক্ষ রুক্ষ দেখাত। গলার স্বরটাও ছিল মোটা, খ্যাসখ্যাসে।
১৩.
রুপোর ঝুমকো কাঁটাও পেয়েছিলাম একদিন। সহদেবদার বউ গা করেনি। বরং ঠোঁট উলটে চোখ চলকে এমন ভাব করেছিল যেন ঠাট্টা করেই বলল, কাঁটাটা তোমার গলায় বিঁধেছে নাকি?
১৪.
সহদেবদার দোকানে হরেক রকমের বই-যাত্রার পালা, ব্রতকথা, রামায়ণ, মহাভারত, গীতা, নাটক, নবেল, যাদুমন্ত্র, শিক্ষা, রতিশাস্ত্র। দোকানের কাজকর্ম হালকা থাকলে আমি বসে বসে বই পড়তাম। একদিন দুপুরে এক ছোকরা বাবু বশীকরণ কিনতে এসেছিল। খদ্দের বিদেয় করার পর সহদেবদার হঠাৎ সে কী হাসি। হাসতে হাসতে দমবন্ধ হবার জোগাড়। একটু সুস্থির হবার পর সহদেবদা বলল, কী কারবারই ফেঁদে বসেছি ফটিকচাঁদ, আমার দোকানে বাজারের সেরা বশীকরণ পাওয়া যায়; মেয়েছেলে বশীকরণটা আমার বাবা লিখেছিল, বেটাছেলে বশীকরণটা আমি লিখেছি। সহদেবদা হা হা করে হেসে উঠল আবার।
১৫.
সহদেবদার বউয়ের সঙ্গে আমার বেশ জমে আসছিল। চুলের কাঁটা ভাতের পাতে পড়ত না আর। তার বদলে সাজানো গোছানো ভাতের থালায় কোনওদিন একটু ঘি পড়ত, কোনওদিন বা মাছের বড় টুকরো। খেয়ে-দেয়ে আঁচিয়ে উঠলে সহদেবদার বউ আমার হাতে দুখিলি পান টুপ করে ফেলে দিত। …একদিন পানের সঙ্গে কড়া জরদা মিশিয়ে দিয়েছিল। দোকানে আসার পথে গা গুলিয়ে বমি এল। সেদিন সারাটা বিকেল গা বিড়োনো ভাব নিয়ে কাটল।
১৬.
পরের দিন সহদেবদার বউ ঠোঁটা-টেপা চাপা হাসি হেসে শুধোল, কী গো কাশীর বাবু, কেমন আছ? হাসিটা যেন রঙ্গ রসে জ্বাল দেওয়া, মোটা সর পড়েছে গালে চোখে। আমি নজর করে সে হাসি দেখলাম। …সেদিন সহদেবদার বউ পান দেবার সময় হাতের খিলি খুলে দেখাল। বলল, চুন সুপুরি ছাড়া কিছু নেই বাপু, দেখে নাও; পরে যে বলবে শেকড়-টেকড় খাইয়ে দিয়েছিবলতে বলতে দুলে দুলে হেসে উঠল সহদেবদার বউ। আমার মনে হচ্ছিল, মানুষের শরীরে যত শেকড় থাকে এত আর কোথাও নয়।
১৭.
শীত ফুরিয়ে গেছে। আমাদের চিৎপুরের গলিতে ভোঁ কাটা ঘুড়ির মতন টাল খেতে খেতে ফাল্গুনের বাতাস দু-এক দমকা এসে পড়ে। হোলির হররা ছুটছে রাতে। সহদেবদার বউ ততদিনে আমার কাছে আমি তুমি হয়ে গেছে। ওর চোখ দেখে আমার কী মনে হয় তা বলেছিঃ কী টানা টানা–ঠিক যেন কাজললতা। সহদেবদার বউ চোখের মনি আড় করে হেসেছে, বলেছে, তা হলে বলল এই কাজললতার কাজল পরতে কাশীর বাবুর বড্ড সাধ।
১৮.
সাধ মেটার আগে আগেই একদিন সহদেবদা সাত সকালে দোকানে এসে হাজির। সবে দোকান খুলে আমি ঝাড়া-মমাছা করছি, মাটির গণেশের তাকে ধূপদানিতে ধূপকাঠিটা অর্ধেকও পোড়েনি, খুশির চোটে লুটোপুটি খেতে খেতে যেন দোকানে ঢুকল সহদেবদা। আত্মহারা। দোকানের সিন্দুক খুলল, কাগজপত্র কী বের করল, পকেটে পুরল। আমায় দশটাকার একটা নোট দিয়ে বলল, আমি একটু শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছি বুঝলি, দাশমশাই এলে পাঁচটা টাকা দিয়ে কালীঘাটে পাঠিয়ে দিবি পুজো দিতে, বাকি টাকাটায় তোরা পেট ভরে মিষ্টি খাস৷কীসের পুজো, মিষ্টিই বা কেন হঠাৎ? সহদেবদা চৌকাঠের ওপারে পা রেখে একটু দাঁড়াল, প্রাণভরে হাসল। বলল, তুই না একেবারে গবেট, গবেটের বাচ্চা…কীসের আবার মিষ্টি বুঝলি নান্যাকা চৈতন…তোর বউদির এবার মাইরি জোর আটকেছে…সহদেবদা হাসির টাল সামলাতে সামলাতে নেমে গেল। …চমক ভেঙে চেয়ে দেখলাম, ফুল দিয়ে ময়ূরপঙ্খী সাজানো একটা মোটর গাড়ি হুস করে চলে গেল, বর বউয়ের মুখ দেখতে পেলাম না।
