আনন্দমোহন যেন জানতেন খবরটা কিসের হতে পারে, চেয়ারে বসতে-বসতে বললেন, “অ্যারেঞ্জমেন্ট করেছ বুঝি কিছু?”
“খুব ভাল অ্যারেঞ্জমেন্ট হয়েছে, বেস্ট পসব্ল্, হেল্প আপনি পাবেন। ডাক্তারও বাঙালী—আপনার কোনো অসুবিধে হবে না।” মজুমদারডাক্তার চেয়ারে বসলেন।
সামান্য চুপচাপ। আনন্দমোহন হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে অমলকে বললেন, “অমল, তোমার মাসিমাকে বল ডাক্তারবাবু এসেছেন চা-টা দিতে।”
অমল চায়ের কথা বলতে ঘরের দিকে চলল। এখন সে সবই অনুমান করতে পারছে, বুঝতে পারছে। ভ্রমরকে নিয়ে মেসোমশাই বাইরে যাবেন ডাক্তার দেখাতে। মজুমদারডাক্তার ব্যবস্থা করছিলেন, ভাল কোনো ব্যবস্থা হয়ে গেছে বলে জানাতে এসেছেন।
এখন অমলের মন কেন যেন একটু খারাপ হয়ে গেল। ক্ৰীশমাসের ছুটিতেই মেসোমশাই যাবেন কথা ছিল, কিন্তু এ ক’দিন এ-বাড়ি উৎসবে আনন্দে এরকম মুখর ও মগ্ন হয়ে পড়েছিল যে, ভ্রমরের অসুখের কথাটা যেন কোথায় তলিয়ে গিয়েছিল, কেউ আর সে-কথা তুলত না, বলত না। এমন কি ভ্রমরই তার অসুখ-বিসুখ ভুলে গিয়েছিল। অমলের খুব একটা মনে পড়ে নি, যখনই হঠাৎ মনে এসেছে, সঙ্গে-সঙ্গে অমল ভেবেছে, হয়ত ভ্রমর ভাল হয়ে আসছে, হয়ত আর বাইরে যাবার দরকার হবে না। কিংবা মনে হয়েছে, এখনও দেরি আছে।
অমল বসারঘর খাবারঘর পেরিয়ে করিডোর দিয়ে রান্নাঘরের দিকে হিমানী-মাসিকে খুঁজতে গেল।
যেতে-যেতে অমলের মনে হল, ভ্রমরের অসুখের কথাটা বাস্তবিকই তারা কেউ ভোলে নি, চাপা দিয়ে রেখেছিল। সুখের দিনে দুঃখের চিন্তা করতে কারুর ইচ্ছে হয় নি। নয়ত মেসোমশাইয়ের মতন অমল এবং ভ্রমরও মনে-মনে জানত, এই ক্ৰীশমাসের ছুটিতেই তাদের আলাদা হয়ে যাবার কথা; একজন যাবে ডাক্তার-ওষুধের জিম্মায়, অন্যজন আর মাত্র ক’দিনের মধ্যেই বাড়ি ফিরবে।
ভ্রমরের ঘর দেখতে পেল অমল। দরজা খোলা। ভ্রমর ঘরে আছে কি না বোঝা গেল না। হয়ত নেই। অমল একবার ভাবল, ভ্রমরকে খুঁজে বের করে খবরটা দিয়ে আসে; পরে ভাবল, থাক, এখন থাক।
হিমানীমাসি রান্নাঘরের মধ্যেই ছিলেন, আমার সঙ্গে কথা বলছিলেন। অমল চায়ের কথা বলে ফিরল।
মেসোমশাইয়ের কাছে যাবার আগ্রহ অত্যন্ত প্রবল হচ্ছিল অমলের। ভ্রমর কোথায় যাবে, ক’দিন থাকবে, কবে যাবে—এসব খুঁটিনাটি জানবার জন্যে সে অধৈর্য ও উদ্গ্রীব হয়ে উঠছিল। কৃষ্ণার ঘরের পাশ দিয়ে যাবার সময় পায়ের শব্দে অমল মুখ তুলল, ভ্রমর কৃষ্ণার ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে। চোখে-চোখে দুজনে দুজনকে দেখল, অমল দাঁড়াল একটু, ডাক্তার আসার কথাটা বলতে গেল, অথচ শেষ পর্যন্ত বলতে পারল না। কিছু না বলেই অমল বারান্দার দিকে পা বাড়াল।
মেসোমশাই এবং মজুমদারডাক্তার কথা বলছিলেন, নিঃশব্দ পায়ে অমল কাছা-কাছি এসে দাঁড়াল, পিছন দিকে দাঁড়িয়ে থাকল।
“নাগপুরে আমারও এক বন্ধু রয়েছেন—” আনন্দমোহন বললেন, “এখন বোধ হয় সিনিআর প্রফেসার।”
“এখান থেকে একটু, কাছেও হয়।”
“তা হয়।” আনন্দমোহন উদাস যেন। সিগারেটের ধোঁয়া টানলেন এক মুখ। “ওদের হাসপাতালটা ভালই, কি বল?”
“বেশ বড় হাসপাতাল, সব রকম ব্যবস্থা আছে।” মজুমদার বললেন, “আমি হাসপাতালের কথা বলছি এইজন্যে যে, হাসপাতালে না থাকলে প্রপার ইনভেস্টি-গেশন হয় না। বাড়িতে নানা রকম অসুবিধে।”
অমল কাঁটাফোটা বুড়ো আঙুলটা মুখে পুরে আবার জিব দিয়ে আস্তে-আস্তে ভিজিয়ে নিল। ভ্রমর তবে নাগপুরের হাসপাতালে যাচ্ছে! জব্বলপুর নয়। কেন জব্বলপুর গেল না! হাসপাতালেই বা কেন যাবে?
“কত দিন থাকতে হবে?” আনন্দমোহন জিজ্ঞেস করলেন।
মজুমদারডাক্তার সামান্যক্ষণ চুপ করে থাকলেন, হয়ত হিসেব করছিলেন; বললেন, “তা ঠিক কিছু বলা যায় না। খুব শর্ট স্টে হতে পারে, আবার কিছুদিন থাকতেও হতে পারে। ওখানে গিয়ে ডাক্তার না দেখানো পর্যন্ত কিছুই জানতে পারছেন না।”
আনন্দমোহন আরও একমুখ ধোঁয়া নিলেন গলায়। আস্তে-আস্তে বুকে টানলেন। “আমার পাঁচ তারিখ পর্যন্ত ছুটি, তার মানে কাল তোমার নিউ ইয়ার্স ডে পড়ছে। পরশু, যদি বেরুই, পাঁচ তারিখের মধ্যে ফিরতে পারছি না।”
“না। হাতে আরও কিছু ছুটি নিয়ে যান! অন্তত দিন পনেরোর।” বলে মজুমদার কি যেন ভেবে আবার বললেন, “কাজ শেষ হয়ে যায় চলে আসবেন, না হয় ক’দিন ওদিক থেকে বেড়িয়ে-টেড়িয়ে আসবেন, ক্ষতি কিসের।”
সিগারেটের টুকরোটা ফেলে দিলেন আনন্দমোহন। অল্পক্ষণ উভয়েই নীরব থাকলেন। মনে হল আনন্দমোহন কিছু ভাবছেন। মজুমদার তাঁর চেয়ার সামান্য সরিয়ে নিলেন, রোদ লাগছিল চোখে।
“আচ্ছা ভাই—আমি একটা কথা ভাবছি”, আনন্দমোহন বললেন, “মেয়েটার শরীর এখন একটু ভালই যাচ্ছে…আজকাল আর অত সিক্ মনে হয় না। তোমার হাতে আর কিছুদিন থাকলে পারত না? যদি এখানে থেকেই রিকভার করতে পারত কথাটা—” কথাটা শেষ না করে আনন্দমোহন মজুমদারের চোখের দিকে যেন কোনো আশ্বাস পাবার প্রত্যাশায় তাকালেন।
মজুমদারডাক্তার কোনো জবাব দিলেন না। বোধ হয় বলার মতন কিছু ছিল না। সামনের দিকে তাকালেন, চোখের চশমা খুলে মুছলেন, তারপর বললেন, “কই, ভ্রমরকে একবার দেখি।”
“আজকাল খানিকটা ইমপ্ৰুভ করেছে বলেই মনে হয়—”
“ডাকুন একবার—দেখি।”
আনন্দমোহন ঘাড় ফেরাতেই অমলকে দেখতে পেলেন। বললেন, “অমল, ভ্রমরকে ডাকো একবার।”
