কুলসুম বলিলেন-বাস্তবিক, জীবনে নারীকে সব সময়েই হীন ও ছোট হয়ে থাকতে হয়। মুখ ফুটে প্রাণের কথা বলা তার পক্ষে অসম্ভব। সে নিজে নিঃসহায়, তার নৈতিক শক্তি ঠিক রাখা খুব কঠিন। জোর করে কথা বাও তার সাজে না। স্বামী যদি বুদ্ধিমান হন তবে স্ত্রীর ভবিষ্যৎ চিন্তা করে নিজের মৃত্যু হলে স্ত্রীকে যাতে পথে না দাঁড়াতে হয়, তার ব্যবস্থা করে যেতে হবে। বালিকাঁদের বাল্যকাল হতেই লেখাপড়া শিখাতে হবে–তাদের কোনো হাতের বা শিল্প-বিষয়ক কাজ শিখান চাই–যাতে সে বিপদে পড়ে নিজেকে একেবারে অনাথ মনে না করে। নারীর চিত্তে শক্তি ও স্বাধীনতা দিতে হবে। এই দুই জিনিস যেখানে নাই, সেখানে মনুষ্যত্ব থাকে না। নারীর এই দুই জিনিসে আদৌ নাই, সুতরাং তার মনুষ্যত্ব নাই। সে পিতা, স্বামী ও পুত্রের খরিদা দাসী। পুরুষ ভাবে নারী জীবন মোনাফেকিতে পূর্ণ। নারীর প্রেম মুখস্থ করা। আহা, নারীর কি দুঃখের জীবন, তা কে। ভাবে? এ ব্যাপারে সমাজদরদীরা চুপ করে আছে। পীরেরা আধারে বসে তছবী টিপছে।
নারীর দুরবস্থার জন্য তার বাপ-মাই দায়ী। নারী জীবনে কখনও তারা ঘৃণা ও অসন্তোষ প্রকাশ করতে সাহস পায় না; যা না করতে পারলে মানুষ পশু হয়। মেয়েকে বড় করতে হলে মেয়ের মাকে পূর্ব হতে সতর্ক হতে হবে। নারীর বেদনা নারী ছাড়া আর কেউ বোঝে না।
দেশে ছেলে ও মেয়ের বিয়ের সময় পাড়ার বউ ঝি নেবার প্রথা আছে। বর্তমান সময় কোনো বিয়ে বাড়িতে না যাওয়াই ভালো; বিয়ে বাড়িতে অনেকে অনেক সময় অনেক রকমে অসম্মানিত হয়। যদি অসম্মানের ভয় না থাকে, থাকবার এবং শোবার রীতিমতো ব্যবস্থা থাকে, তাহলে যাওয়া যেতে পারে। অনেক লোকের সঙ্গে মেলামেশা করলে জ্ঞান বাড়ে।
যেখানে সম্মান হয় না, সেখানে কখনও যাবে না। নিজের মর্যাদা অনুযায়ী বসবার স্থান না পেলে সেখানে বসবে না। গরিবের বাড়ি নিরহঙ্কার চিত্তে ঘেঁড়া মাদুরে বসবে। জেনো, অহঙ্কারী লোককে ছোট করে দেন।
মাঝে মাঝে বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীকে দাওয়াত করে খাওয়ান একান্ত কর্তব্য। স্বামী পুরুষ লোককে, স্ত্রী-নারী সমাজকে দাওয়াত করবেন। নারী পুরুষকে একই সময়ে বাড়িতে আনতে হবে, এমন কোনো কথা নয়। হাজার হাজার লোককে খাইয়ে, হাজার হাজার টাকা ব্যয় করলে বিশেষ লাভ নাই। বাঙালীর অনেক টাকা এইভাবে মাটি হচ্ছে। ফলে সমাজ দরিদ্র হয়ে পড়ছে। কয়েকজন বন্ধুবান্ধব ও প্রতিবেশীকে প্রীতিভোজ দেওয়ায় বৃথা পয়সা নষ্ট হয় না। অতিথিকে পরিতোষপূর্বক আহার করাতে পারবে না বলে, একদম কাউকে না খাওয়ান ঠিক নয়।
যার খাওয়ার সঙ্গতি নেই তার কাছ থেকে জোর করে খাওয়া আদায় করতে নেই–আর যে কৃপণ, জোর করে তার বাড়িতে খেয়ে লাভ কি? অবস্থা খারাপ হলে প্রীতিভোজ দিয়ে পরিবারের দুঃখ বাড়ান ভালো নয়।
প্রতিবেশীর বাড়িতে মাঝে মাঝে তোমার বাড়ির ভালো জিনিস পাঠিয়ে দেবে। অল্প হলে ক্ষতি কি?
অত্যাচারী, সুদখোর, জালেমের বাড়িতে পুরুষের খেতে নেই। নারীর অন্য কোনো নারীর নিমন্ত্রণ গ্রহণ করাতে দোষ নেই-কারণ নারীর বহির্জগতের সঙ্গে কোনো সম্বন্ধ নেই। আধুনিকাঁদের কথা স্বতন্ত্র।
বধূকে সকল কাজে নিজের বুদ্ধির পরিচয় দিতে হবে। জীবনকে চালানোর জন্যে কতগুলো বাধাধরা নিয়ম দেওয়া অসম্ভব।
কোনো কথার প্রতিবাদ করলে কোনো কোনো মানুষ চটে। তবুও ভুল দেখলে মানুষের প্রতিবাদ করা উচিত। স্বামীর কোনো কথার প্রতিবাদ তখন করবে না। স্বামীর ভাবকে মেনে নেওয়া স্ত্রী জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্যে। স্বামীর মধ্যে কোনো ভুল পেলে মিষ্টি কথায় যখন তখন না হোক, অন্য সময় বলবে।
অনেক সময় লোকে খামাখা কতগুলি কথা বলে, তার প্রতিবাদ না করলেও বিশেষ আসে যায় না।
স্বামীর ভাব ও চিন্তার প্রতি সর্বদা সহানুভূতি রাখতে চেষ্টা করা কর্তব্য। তর্ক করার খাতিরে বা খারাপ উদ্দেশ্যে স্বামীর সঙ্গে তর্ক করবে না; এরূপ করলে দাম্পত্য জীবনের সুখ নষ্ট হয়। স্ত্রীর কার্য সম্ভবত অন্ধ বন্ধু হওয়া–গুরু হওয়া নয়।
নারীরা ঘরের কোণায় বসে অনেক সময় বড় বড় লোককে পর্যন্ত গালি দিয়ে বসেন; শিক্ষিত ভদ্র নারীদের কর্তব্য নয় পণ্ডিত ও সজ্জন ব্যক্তির প্রতি অশ্রদ্ধা দেখান।
স্বামী ও কয়েকজন নিকট মুরুব্বী ছাড়া অন্য কোনো পুরুষ দেখে কখনও আসন ছেড়ে সম্ভব জানাতে উঠবে না। নারী সর্বদা সকল পুরুষের সম্ভ্রমের পাত্রী, সে আবার কাকে সম্ভব জানাবে?
অনেক সময় সৎ অনুষ্ঠানের জন্য সেবক সম্প্রদায়রা মুষ্টি চালের জন্যে হাড়ি পাঠিয়ে দেয়। তাদের হাঁড়িতে ভাত রান্নার আগে এক-আধ মুঠা চাল রাখতে ভুলবে না। এতে গৃহিণীদের বিশেষ লোকসান হয় না। চালগুলি কোনো সৎ অনুষ্ঠানে না দিলেও এক মাস পরে তাতে সংসারের অনেক উপকার হয়।
অন্ধকার রাত্রে বাইরে থেকে বা হাট-বাজার থেকে যদি বাড়ির কেউ আসে, তবে তাড়াতাড়ি একটা প্রদীপ নিয়ে পথে এসে দাঁড়াতে হয়। এতে আগন্তুকের অভ্যর্থনা করা, তার পরিশ্রান্ত মনে আনন্দ দেওয়া, সব কাজই হয়।
স্বামী যদি বাইরে থেকে পরিশ্রমের কাজ করে আসেন, তবে তাকে দুটি তৃপ্তিদায়ক কথা বলতে ভুলবে না। স্বামীর কোনো ভালো কাজে খুব আনন্দ প্রকাশ করবে।
