হালিমা বিস্ময়ে কহিলেন–ছিঃ ছিঃ লজ্জা, ঘৃণার কথা!
কুলসুম : নিশ্চয়! স্ত্রীলোকদের পায়খানা-প্রস্রাব করবার বিশেষ বন্দোবস্ত থাকা। আবশ্যক। যেন কোনো প্রকার অশ্লীলতা প্রকাশ না হয়, সেদিকে প্রত্যেক ভদ্রলোকের নজর থাকা চাই।
.
উনবিংশ পরিচ্ছেদ
কুলসুম বলিলেন–প্রিয় হালিমা, মানুষের সঙ্গে কিরূপ ব্যবহার করতে হবে এ জানতে হলে পূর্ব হতে প্রভৃতি জ্ঞান লাভ করা চাই। কার সঙ্গে কেমন ব্যবহার আবশ্যক, এ জানা খুব শক্ত কথা।
লোকের সঙ্গে ব্যবহারে মনের বল যেন কোনো সময় নষ্ট না হয়। স্ত্রীরা যখন চাকরি করতে যায় না, তখন তাদের মনের বল বাড়াবার বিশেষ আশঙ্কা নেই। অলঙ্কারপরা ধনী গৃহিণীদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে অনেক মনে দুর্বলতা অনুভব করেন, অতএব সেরূপ লোকের স্পর্শে না যাওয়াই ভালো। মনের দুর্বলতা বোধ না করলে যাওয়ায় দোষ নেই।
কুলসুম আবার বলিলেন–হালিমা, জিহ্বাই সকল অনিষ্টের মূল। জ্ঞানী ব্যক্তিরা অল্প কথা বলেন। যে বেশি কথা বলে না তার অপরাধও অল্প। বিচক্ষণ ব্যক্তির মতো কথা বলতে না পারলে চুপ থাকাই শ্রেয়। অবশ্য একেবারে কথা বন্ধ করা অনুচিত। স্বামী ও পাড়াপ্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলা ও আলাপ রহস্য করাও নিতান্ত প্রয়োজন।
স্ত্রীলোকে স্ত্রীলোকে দেখা হলে সাধারণত এক দফা পদচুম্বন হয়ে থাকে। একটা সঙ্গত নয়। কোলাকুলি করা, দুই হাত দিয়ে না হোক অন্তত এক হাতে মোসাফা বা সালাম আলেকুম করাই বাঞ্ছনীয়। পায়ের উপর উপুড় হয়ে পড়ে–এসব হিন্দুয়ানী চলন। এরূপ কখনও করবে না।
হালিমা জিজ্ঞাসা করিলেন, মুরুব্বীদের সঙ্গে কি মোসাফা করা বেয়াদবী নয়?
কুলসুম বলিলেন–আমাদের মুরুব্বীরা সাধারণত ছোটদের ব্যক্তিত্বকে চূর্ণ করেই সুখী হন। ছোট যে, সে পশু, তার জন্য জ্ঞান নাই, মুরুব্বীদের মুখের দিকে চেয়ে কথা বললে পাপ হয়, এ সমস্ত কথা মুরুব্বীদের সব সময় বলা উচিত নয়। মাতাপিতা এবং মুরুব্বীরা যদি পুত্র কন্যাদের সঙ্গে করমর্দন করেন বা তাদের হৃদয়ে ধারণ করেন তা হলে তাদের কোনো সম্মান নষ্ট হয় না। কেহ যদি পায়ের উপর উপুড় হয়ে শ্রদ্ধা জানাতে আসে, তবে কদাপি সুখী হবে না–ক্ষিপ্র হস্তে তাকে বাধা দেবে। সে আত্মীয় বেগানা যেই হোক না। মধুর নম্র ভাষায় তাকে এমন কাজ করতে নিষেধ করবে।
কারো সঙ্গে দেখা হলে কোনো না কোনো প্রীতির চিহ্ন দেখাই চাই। নিতান্ত বন্ধু যে, তার সঙ্গে ভদ্রতা না দেখালে ক্ষতি নেই।
হালিমা কহিলেন-বধূ স্বামীর পদচুম্বন করবার জন্য সাধারণত আদিষ্ট হয়ে থাকেন।
কুলসুম : এরূপ শ্রদ্ধার কোনো দরকার নেই। স্বামী যদি বন্ধু রূপে পান তাহলে তিনি বেশি সুখি হবেন। ভক্তির দ্বারা মানুষকে জয় করা যা না, মূল্য ও গুণই মানুষ জয় করবার শ্রেষ্ঠ অস্ত্র।
হালিমা স্বামী দাঁড়িয়ে আছেন, স্ত্রীর কি তখন বসে থাকা বা আসন অধিকার করে থাকা উচিত?
কুলসুম : স্বামী তো আর কোনো রাজকর্মচারী নন্ যে তাকে ভয় করে চলতে হবে। স্বামীর যদি বসবার দরকার হয় তাহলে তিনি স্ত্রীকে সরে যেতে বলবেন। স্বামীর বসার দরকার থাকলে, স্ত্রী নিজেই আসন ছেড়ে দূরে যাবেন।
কুলসুম আবার কহিলেন-বাড়ির দাস-দাসী বা ছোটদের সঙ্গে নিরন্তর ঝগড়া-ঝাটি করা ভালো নয়। প্রত্যেক কাজেই যে মানুষ সর্বাঙ্গ সুন্দর হবে এমন আশাও করতে নেই। কারো চরিত্রে কোনো দুর্বলতা আছে; তাই নিয়ে হৈ-চৈ করা নির্বুদ্ধিতা। সে হয়তো অন্য কোনো কাজে বিশেষ গুণের পরিচয় দেবে।
হালিমা : কোনো কোনো বধূর ভয়ানক ক্রোধ থাকে। তারা যখন বড় গৃহিণী হন তখন তাদের জ্বালায় বাড়িময় অশান্তি হয়।
কুলসুম : মুরুব্বীদের সব সময়ে ছোটদের ভুল ও দুর্বলতার প্রতি সহানুভূতি থাকা চাই–নইলে ফল খারাপ হয়। বধূরা অনেক সময় গাল ফুলিয়ে বসে থাকেন। স্বামী সেই চেহারার মধ্যে মাধুরী দেখলেও অন্য লোক সে চেহারাকে ঘৃণা করে। মানুষের ঘৃণা এবং অভিশাপকে ভয় করা উচিত।
কোনো কোনো বন্ধু শব্দের সহিত গলা ঝেড়ে থাকেন। এই অভ্যাসটি বর্জন করতে হবে। এতে লোক সন্দেহ করে, বধূ হয়তো দাম্ভিক প্রকৃতির।
হালিমা জিজ্ঞাসা করিলেন-শ্বশুর-শাশুড়ীকে সাধারণত কীরূপভাবে সম্মান করতে হবে? তাদের কেমনভাবে অভ্যর্থনা করতে হবে।
কুলসুম : পদচুম্বন যখন দেশের রেওয়াজ হয়ে পড়েছে, তখন বর্তমান যুগের বৃদ্ধ শ্বশুর-শ্বাশুড়ীর সঙ্গে অনেক দিন পর দেখা হলে পদচুম্বন করবে। নিজে যদি কোনো কালে শাশুড়ী হও, তাহলে বধূকে হৃদয় ধারণ করো বা তার হাতখানি নিজের হাতে নিয়ে প্রীতির চিহ্নরূপে চাপ দিও, পদচুম্বন গ্রহণ করো না।
দুই ঈদের নামাজের সময় বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে স্নেহ, প্রীতি ও মমতার আদান-প্রদান হয়ে থাকে। এই সময় শ্বশুর-শাশুড়ীকে শ্রদ্ধা জানাবে। পদচুম্বন করা যদি একান্তই আবশ্যক হয় তাহলে বাপ-মা ও শ্বশুর শাশুড়ীকে করবে, অন্য কাউকে না। পীর-দাস-দাসী, নানা-নানী সকলকেই বাদ দেবে। তারা যদি জ্ঞানী হন, তাহলে এই অপমানে ক্ষুণ্ণ হবেন না।
হালিমা : স্বামীকেও কি মাঝে মাঝে সম্মান জানানো দরকার?
কুলসুম : কিছু না। স্ত্রী তো আর স্বামীকে কোনো দাসী নয়। স্বামীর সঙ্গে আলিঙ্গন করে মাঝে মাঝে প্রীতি-মমতার চিহ্ন দেখাতে পার। দুই ঈদ ছাড়া বৎসরের অন্য সময় ঊষাকালে হাসিমুখে স্বামীর সঙ্গে হাত মিলান ভালো। সুপ্রভাত বলা, সালাম আলেকুম করাও উত্তম।
