হালিমা : পরিবারের সদস্যগণের শোবার ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত?
কুলসুম : স্বামী-স্ত্রী, ঘরের মধ্যে আর কারো থাকা অন্যায়। প্রত্যেক দম্পতির স্বতন্ত্র ঘর থাকা একান্ত কর্তব্য। এক কামরায় কথা বললে অন্য কামরা হতে শোনা যায় এরূপ স্থানে থাকাও অবৈধ। স্বামী-স্ত্রীর জন্যে একই ঘরে স্বতন্ত্র কিন্তু পাশাপাশি বিছানা হওয়া উচিত। ছেলেমেয়ে সেয়ানা হলে তাদের আলাদা প্রকাষ্ঠে শুতে দেবে। তাতে ছেলেমেয়েকে অবজ্ঞা করা হলো, এ মনে করা ভুল।
কুলসুম আবার কহিলেন–তি পরিষ্কার করে বা মাছ ধুয়ে ছাই বা সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতে হয়, নইলে হাতে কাপড়ে গন্ধ থাকে। হাতে, পায়ে বা কাপড়ে ময়লা জড়ালে তা ভালো করে ধুয়ে ফেলা উচিত। একটা ছোট পাত্রে সাবান রাখা নিয়ম, নইলে অসুবিধা হয়।
হালিমা জিজ্ঞাসা করিলেন–বাড়িতে ফুলের গাছ থাকা কেমন?
কুলসুম : একান্ত দরকার। লতা-পাতা ও ছোট ছোট ফুলের গাছ দেখলে মনের রূঢ়তা নষ্ট হয়। সঙ্কীর্ণ মন উদার হয়ে ওঠে। বাড়ির পার্শ্বে ছোট বাগান ছাড়া বারান্দায়; দরজার ধারে এবং উঠানে টবে করে দুই একটা গাছ রেখে দেওয়া খুব ভালো।
গ্রীষ্মকালে ছারপোকার জ্বালায় অনেক সময় অস্থির হয়ে উঠতে হয়। দারুণ–গ্রীষ্ম তার উপর মশা আর ছারপোকার অত্যাচার প্রাণকে অতিষ্ঠ করে তোলে। খাট-পালঙ্কের মাপে একটা কাগজের চাঁদর প্রস্তুত করবে। দুই পরদা বা তিন পরদা কাগজ আটা দিয়ে এঁটে একটা বিছানায় চাঁদরের মতো বড় আবরণ করবে। তার পর খাটের উপর সেইটা পেতে তার উপর তোষক বিছাবে। কাগজের চাঁদরের ধারগুলি আধ হাত বা তারও খানিক বেশি প্রত্যেক দিকে ঝুলে পড়া চাই এতে ছারপোকার উপদ্রব কমে। বিছানাপত্র রৌদ্র দেওয়া উচিত-খাট পালঙ্কও রৌদ্র দেওয়া কিংবা গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা উচিত।
কোনো কোনো পরিবার ঘরে আদৌ জানালা রাখেন না। চট্টগ্রাম অঞ্চলে এরূপ ঘরের সংখ্যা অনেক। ঘরে প্রচুর জানালা থাকা উচিত। যে ঘর অন্ধকার, জানালাহীন সে ঘরে বাস করবে না। পাছে লোকে ঘুমঘোরে সরমের অবস্থা দেখে এই ভয়ে অনেকে সামান্য ছিদ্রটুকু পর্যন্ত কাগজ দিয়ে বন্ধ করে রাখেন। ঘরে প্রচুর জানালা থাকা চাই। ইজ্জত বাঁচানোর অন্য ব্যবস্থা করতে হবে। ঊষাকালে একটু হুঁশিয়ার হয়ে শুলে ভয়ের কোনো কারণ নেই। ভদ্র পরিবারে বাড়ির সকলেই সাবধান ও হিসেবী হয়ে থাকেন। বাড়ির ঘরগুলি এমন ভাবে বিন্যস্ত হওয়া উচিত যাতে কাউকে সরমের মধ্যে না পড়তে হয়।
ছেলেদের প্রত্যেকের জন্য স্বতন্ত্র কাপড় রাখার স্থান করে দেওয়া মন্দ নয়। তাদের জিনিসপত্রের খোঁজে অনেক সময় হয়রান হয়ে যেতে হয়। প্রত্যেক জিনিসপত্রের হিসেব নিজেই রাখবে। একজনকে একটা বাক্স দেওয়া মন্দ নয়। ছেলেদের জন্য স্বতন্ত্র দস্তরখানা থাকাও ভালো। এ সম্বন্ধে বিশেষ সতর্ক হওয়া উচিত।
পরিবারের কেউ যদি ভাত খেতে বসেন, সর্বপ্রথম তার সামনে পানি দেবে, তারপর ভাত দিবে। ছেলেরা অনেক সময় ঘরের মধ্যেই হাত ধোয়–এরূপ করতে তাদের নিষেধ করবে।
কাউকে পান দিলে, সঙ্গে সঙ্গে পানের টুকরায় খানিক চুন পাঠিয়ে দেবে। অতিথি বা স্বামীকে চুনের জন্য যেন দ্বিতীয় বার না বলতে হয়।
সুপারীগুলি বাক্সে বন্ধ করে রেখে দিও নইলে নষ্ট হয়।
বাড়িতে কোনো ভালো জিনিস তৈরি হতে থাকলে, ছেলেদের তা বলতে নেই; প্রস্তুত, হলে তাদের সামনে দেবে। ভালো জিনিস খাব বলে যদি তারা আনন্দ করতে থাকে, তাহলেও বাধা দেওয়া ঠিক নয়।
প্রতিবেশীকে সব সময়ই বাড়ির ভালো জিনিসের অংশ দেবে। তোমার উপহার অল্প হলেও প্রতিবেশী তাতে সন্তুষ্ট হবে।
বেশি করে কোনো জিনিস কোনো অতিথিকে দিতে নেই–তাতে তোমার রান্না করা জিনিসের উপর অতিথির অবজ্ঞা হবে। মানুষের স্বভাবই বোধ হয়–এই সুতরাং অতিথির উপর বিরক্ত হতে নেই।
অসময়ে স্বামীর কোনো বন্ধু বা অতিথি-কুটুম্ব বাড়িতে এলে কোনো কোনো বন্ধু বিরক্ত হন–এটা ভালো কথা নয়। স্বামীর বন্ধুকে ছেলে দিয়ে বা স্বামী দিয়ে নিজের সাদর অভ্যর্থনা জানাবে। স্বামীর বন্ধুর সাধুতার দ্বারাই শ্রেষ্ঠতর হওয়া যায়। এইসব কথা ভুলে বাঙালি জাতি নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। বোয়া কাপড় ও জুতা পরলে, কিংবা কুঁচিয়ে কাপড় পরলে কোনো কোনো শ্বশুর মনে মনে বিরক্ত হন। এদের সম্মুখে আতর মাখা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকাও দোষের বলে মনে হয়। এই সমস্ত লোকের মধ্যে যে সব মাতা পিতা মেয়েকে ফেলে দেন, তারা বড় হৃদয়হীন। কোনো কোনো পরিবার বধূর ভাত খাওয়ার মধ্যে পর্যন্ত দোষ খোঁজেন।
বধূর সুখের প্রতি অনেক শাশুড়ী ঈর্ষা পোষণ করেন। তারা সন্দেহ করেন, পুত্র মায়ের কথা ভুলে বধূতেই আত্মসমর্পণ করেছে। তাই বধূর গৌরব, সাজসজ্জা, ও রূপ দেখে শাশুড়ী বিরক্ত হন। পুত্রবধূ যে তাদের কন্যাসদৃশ, একথা তারা ভাবতে পারে না। অনুন্নত পরিবারে পরস্পরের মনোমালিন্য ও ভুল ধারণার প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। বধূ এবং পুত্র যদি গৃহের মুরুব্বীদের সম্মান ও সুখের প্রতি কিছু চিন্তা ও দৃষ্টিশূন্য অমার্জিত পরিবারে বাস করা বিড়ম্বনা।
কোনো কোনো হীন পরিবারে স্ত্রীলোকদের পায়খানা-প্রস্রাব করার সুবন্দোবস্ত নেই।
